Ticker

6/recent/ticker-posts

স্মৃতির সভা-প্রীতির সভা, বার্ষিক সাধারণ সভা

 

৪৩ শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি ইতিহাস, এটি একটি ঐতিহ্যর প্রতীক। এটি একটি বেদি বা ভিত্তি, যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অর্ধশত বছরের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। শুধু অর্ধশত বছর বলাটাও এক ধরনের ভুল, বলা যায়- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শত শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের যে ধারা প্রবাহিত রয়েছে, সে প্রবাহকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বয়ে নেয়ার জন্য যে দরকার ছিল- সেই ভিত্তিটাই গড়েছিল আজ থেকে ৪৩ বছর আগে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রধানতম সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন সাহিত্য একাডেমি। ৪৩ বছর আগে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটির জন্মই ছিল সেই ভিত্তি। গত শতাব্দীর শেষ শেষার্ধে জন্ম নেওয়া এই সংগঠন ছিল দুই শতাব্দীর ভিন্নরকম দুই প্রজন্মের সাঁকো। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই এই সংগঠন সেতুবন্ধন রচনা করে চলছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

৪৩ বছরের যাত্রা পথে; ঠিক যাত্রা নয়, অভিযাত্রার পথে সাহিত্য একাডেমি তার ঝুলিতে সংযুক্ত করেছে অসংখ্য কর্মকাণ্ড। অর্জন করছে অজস্র মানুষের আস্থা ও ভালবাসা। সাহিত্য-সংস্কৃতি যতগুলো কার্যক্রম আছে, ঠিক ততগুলো কার্যক্রমের সঙ্গেই এই দীর্ঘ যাত্রাপথে যুক্ত থেকেছে এই সংগঠনটি। এই সংগঠনের ঝুলিতে যেমন আছে অসংখ্য ছোট বড় বড় অনুষ্ঠান, তেমনি আছে ছোট বড় নানা প্রকাশনা। নাট্যচর্চা, আবৃত্তি চর্চা, সংগীত চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতায় অনন্য সংগঠন সাহিত্য একাডেমি। এ সব কর্ম ও মহাকর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের শত শত খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ।


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষের কাছে সাহিত্য একাডেমি শুধু আস্থা বা ভালোবাসার ঠিকানা নয়, এটি প্রশান্তি ও আশ্রয়ের ঠিকানা। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, মাঠের খেটে খাওয়া শিল্পীমনা মানুষগুলো থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, প্রচণ্ড রকম মেধাবী, সংস্কৃতিমান মানুষগণও যুক্ত থেকেছেন এই সংগঠনের সাথে। এই সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা করে বাংলাদেশের গুরুত্বতম সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নেতৃত্ব দিয়েছেন অনেকে। কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি আর ব্যক্তিদের নামের তালিকা এত লম্বা যে; তা তৈরি করতেও একেকজনের কয়েক বছরের লেগে যাবে।

গতকাল অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠন সাহিত্য একাডেমির ৪৩তম বার্ষিক সাধারণ সভা। সাধারণত প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও সাধারণ সভা। এ বছর জাতীয় নির্বাচন, পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে তা বিলম্বিত হয়ে মার্চের শেষ অনুষ্ঠিত হলো।

প্রত্যেক বার্ষিক সাধারণ সভা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রয়াত বিশেষ ব্যক্তিদের স্মরণে অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় জেলার বরেণ্য সন্তান, দেশের বিশিষ্ট লেখক-গবেষক, ইতিহাসবিদ, কবি ও ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক স্মরণে। যিনি ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলার শাহবাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর মৃত্যুবরণে করেন। সভায় তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনী পাঠ করে শোনানো হয়। এছাড়াও সভায় বিগত বছরে মৃত্যুবরণ করা গুণিজনদের স্মরণ, শোক প্রকাশসহ তাদের সম্মানে দাঁড়িয়ে করে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

৪৩ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় সংগঠনে বিশেষ অবদানের জন্য এই বছর সাহিত্য একাডেমির দীর্ঘদিনের অভিভাবক তথা অন্যতম চালিকাশক্তি, বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব ডা. আহমদ আল-মামুন এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীরকে সাহিত্য একাডেমি পদক ও সম্মাননা প্রদান করা হয়। এবছর থেকেই এই পদক ও সম্মাননা প্রদান কার্যক্রম চালু করা হলো- যা প্রতি বছরই যোগ্যতম ব্যক্তিদের প্রদান করার হবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এই সংগঠনসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতির হাল ধরে রয়েছেন তিনি।

প্রতিবছরের মতো এবারও বার্ষিক সাধারণ সভাও জেলার সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যক্তিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের লেকচার থিয়েটার হলে অনুষ্ঠিত হয় এই সভা। দিনব্যাপি অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি, জেলার খ্যাতিমান ও বয়োজ্যেষ্ঠ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অভিভাবক কবি-গবেষক জয়দুল হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনাসহ সভায় বার্ষিক প্রতিবেদন পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নূরুল আমিন । বয়সে তরুণ নুরুল আমিন সংগঠনের একাধিকবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। প্রবীণ-তরুণের এই সমন্বয় দেখা যায় সংগঠনের অন্যান্য পদ-পদবীতেও।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবদুল হান্নান খন্দকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন একাডেমির সাবেক সাধারণ ও বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব, সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মিজানুর রহমান শিশির, প্রখ্যাত লেখক জিয়াউদ্দিন ঠাকুর। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংগঠনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আছরারুন নবী মোবারক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াছেল সিদ্দিকী, বীর মুক্তিযোদ্ধা সামসুদ্দিন আহম্মেদ, বজলুর রহমান, ডা. শ্যামল দাশ গুপ্ত। সভায় অন্যান্যর মধ্যে বক্তব্য রাখেন ফজিলাতুন নাহার, ফারুক আহামদ ভুঁইয়া, শেখ জাহাঙ্গীর, মোসলেম উদ্দিন সাগর, এস. এম শাহীন। কথা বলার সুযোগ পেয়ে একটি বিষয়ে মতামত উপস্থাপন করি আমিও। যা অনুষ্ঠানের সভাপতিসহ অন্যান্যের বেশ পছন্দ হয় বলে বোঝা গেলো।


সভায় নানার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতি কবি জয়দুল হোসেন সাহিত্য একাডেমির অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখার মানসে সাহিত্য আড্ডা, প্রকাশনা, নাটক ও আবৃত্তির কর্মকাণ্ডগুলো নিয়মিত আয়োজন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সকলের সব কাজের জবাবদিহিতা আগামীদিনে নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি। এছাড়াও তিনি সাহিত্য একাডেমির দীর্ঘদিনের যাত্রা পথের কর্মকাণ্ডগুলো একত্রিত করা ও সেগুলো একটি প্রকাশনায় আনার জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগী হন। তিনি এসব কাজে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। সাহিত্য একাডেমির সম্পর্কে যার কাছে যে ধরনের ডকুমেন্ট, ছবি, পেপার কাটিং, আমন্ত্রণপত্র, পত্রিকা বা অন্য যে ধরনের ডকুমেন্ট রয়েছে, তা তার কাছে প্রদান করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।


বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশগ্রহণ করেছিলেন জেলার বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও সাংবাদিক সংগঠনের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ। আয়োজনকে ঘিরে নবীন-প্রবীণ সকলের মাঝে ছিল প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। সরকারি মহিলা কলেজের বিশাল ক্যাম্পাস, ছায়াঢাকা মনোরম পরিবেশ, আর বসন্তের নতুন সেজে ওঠা পত্রপল্লব থেকে ছুটে আসা শীতল বাতাস সবার মনকে আরো প্রফুল্লতায় ভরে দিয়েছিল। ছবি তোলা, দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে খোশগল্প, পুরোনো স্মৃতি ঝালাই করে নিচ্ছিলেন সবাই। কেউ কেউ বলছিলেন আগামী দিনের করণীয় সম্পর্কে। একটি সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় শেষ হলো এবারের মাসিক সাধারণ সভা।



স্মৃতির সভা-প্রীতির সভা, বার্ষিক সাধারণ সভা মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ ২৮ মার্চ ২৬


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ