ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মানিকগঞ্জে দেশের আলোচিত দুই শিশু হত্যাকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে হত্যার রহস্য উন্মোচনসহ আসামি গ্রেফতার করায় পুলিশকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ধন্যবাদ দিতে গিয়ে কলম আটকে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরের শিশু ময়নার চেহারা চোখে ভাসলে। এই রাষ্ট্রে ময়নার কি বিচার পাওয়ার অধিকার নাই।
নয় মাস পেরিয়ে গেলেও আসামি গ্রেফতার তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত হত্যার রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। ডিএনএ টেস্টের রেজাল্ট এরও কোনো খবর নেই। এখানে কি পুলিশের দায়িত্ব অবহেলা, নাকি ব্যর্থতা, নাকি ময়না হত্যাকারীরা এতটা শক্তিশালী যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল হাত- ততদূর পর্যন্ত যেতে পারে না ?
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা গেছে দুই শিশু। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সদরের মোহনপুরের ৬ বছরের শিশু নিশাত ও মানিকগঞ্জের বনপারিল গ্রামের ৭ বছরের শিশু আতিকাকে আতিকার হত্যাকারীরা ছিল তাদেরই প্রতিবেশী। হত্যার শিকার শিশুরদের লাশ পাওয়া গেছে বাড়ির অদূরেই।
আমরা ছোটবেলায় দেখতাম, হঠাৎ কোনো শিশু হারিয়ে গেলে একদল লোক আশেপাশের সবার বাড়িঘরে খোঁজ করতো। খাটের নিচে, খড়ের গাঁদাসহ লুকানো যায়- এমন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করতো। আরেকদল লোক সাথে সাথে বাড়ির আশেপাশে পুকুর-ডোবায় বা খালে জাল ফেলতো। কারণ তারা জানতো ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খুব বেশিদূর হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। জীবিত বা মৃত এসব জায়গাতেই পাওয়া যাবে। শিশুর বয়স আরেকটু বড় হলে এক দুই গ্রাম পরের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও খোঁজ করা হয়। কারণ অনেক সময় তারা রাগ-অভিমান করে কিংবা মনের খেয়ালে আত্মীয়র বাড়িতে চলে যায়।
এখন কোনো শিশু হারিয়ে গেলে মসজিদে মাইকিং হয়, রিকশা নিয়ে সারা এলাকায় মাইকিং করা হয়, ফেসবুকে ছবি-ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ে। সারা দেশের মানুষ জেনে যায় অমুক জায়গায় অমুক শিশু নিখোঁজ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরবর্তীতে সেই শিশুটিকে জীবিত বা মৃত পাওয়া যায় বাড়ির আশেপাশেই। অথচ শিশুটিকে খোঁজ করা হয় সারা দেশে। কোনো শিশু হারিয়ে গেলে বা নিখোঁজ হলে বাড়ির আশেপাশে কেন গুরুত্ব দিয়ে খোঁজা হয় না? বাড়ির আশে পাশের খোঁজাখুঁজিটা দ্রুত হলে আসামি ধরাসহ অনেক সময় শিশুটিকে জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এছাড়াও এটা আমার ভাবতে অবাক লাগে যে, একটি শিশু কিংবা একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের অস্বাভাবিক আচরণ আশেপাশের কোনো মানুষেরই নজরে কেন পড়ে না? এতটা স্বার্থপর বা আত্মকেন্দ্রিক হলাম কীভাবে? দেশে আরো বেশ কিছু শিশু হত্যার ঘটনায় দেখা যায় হত্যাকারী তাদের পরিচিত কেউ। লাশ পাওয়া যায় বাড়ির আশেপাশেই। আমাদের বাবা-মা এতটা অসচেতন কেন হয় যে নিজের শিশু কোথায় থাকে, কোথায় যায়, কাদের সাথে যায়, কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত এই তথ্যটা তাদের কাছে থাকে না। দেশে এত এত শিশু ধর্ষণ ও হত্যার পিছে শুধু কি অপরাধীদের দায়, আমাদের বাবা-মা ও অভিভাবকদের কি কোনো দায় নেই।
দুইটা হত্যাকারী ছবি সংযুক্ত করেছি, দেখুন। হত্যাকারীরা বিশেষ চেহারার কেউ হয় না। তারা দেখতে অন্য সব স্বাভাবিক মানুষের মতই। স্বাভাবিক মানুষের মতোই ঘুরে বেড়ায় আপনার আমার শিশুদের পাশে। একটু অসচেতন হলেই হারাবেন প্রিয় সন্তানকে। রাষ্ট্র হয়তো একদিন অপরাধীকে ধরবে, বিচার করবে, শাস্তি দিবে, কিন্তু আপনার প্রিয় সন্তানকে আর কখনো ফিরে পাবেন না। কাজেই ক্ষতি হওয়ার আগে অভিভাবকদেরকে আগেই সচেতন হতে হবে ।
মানিকগঞ্জের আতিকা হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রামবাসী হত্যাকারী নাঈমের বাবা ও চাচাকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলেছে। গণপিটুনিতে মারাত্মকভাবে আহত নাঈমের ভাই নাজমুল হাসপাতালে মৃত্যু সজ্জায়। ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিল নাঈম। আজ সে গ্রেফতার হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিশাত হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার প্রতিবেশী ইসহাক মিয়ার বাড়িঘর জ্বালয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এর আগে দেশের আরেক আলোচিত ঘটনা শিশু আছিয়ার হত্যাকারীর ঘরবাড়ি লুট করে ও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল বিক্ষুব্ধ জনতা।
জনতা কেন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, জনতা কেনো বিচারের দায়িত্বটা নিজের কাঁদে নিয়ে নেয়, জনতা কখন থানা-পুলিশ উকিল বিচারকের প্রতি আস্থা হারায়? এটা যদি তারা নিজেরা না জানে- তাহলে তারা যেন মার্টিন লুথার কিং বিখ্যাত উক্তিটি মনে রাখে "Injustice anywhere is a threat to justice everywhere" । কেননা জনতা ভালোভাবেই মনে রাখে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বিখ্যাত লাইন- ‘শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা’।
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
১৮ এপ্রিল ২৬
নিশাতকে হত্যাকারী খুনি ইসহাক

আতিকাকে হত্যাকারী খুনি নাঈম


.jpeg)

0 মন্তব্যসমূহ