একাত্তরের মার্চে দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হতে শুরু করলে তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে অনুরোধ করেন কুমিল্লার বাসা ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জন্য। তিনি ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন- ‘আমি দেশ ত্যাগ করবো না, মরতে হয় জন্মভূমিতেই মরবো।’
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ। কুমিল্লার বাসা থেকে পাকিস্তান বাহিনী ধরে নিয়ে গেল ৮৫ বছরের বৃদ্ধ ভাষাসংগ্রামী, দেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তার ছোট ছেলে দিলীপ দত্তকে। এই যে গেল আর ফিরে এলেন না তিনি।
সেই দিনের স্মৃতিচারণ করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি আরমা দত্ত। তিনি বলেন, ২৫শে মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরু হয়। রাত ১টার মধ্যে আমরা খবর পেলাম। দাদু চুপ করে অনেকক্ষণ বসে রইলেন। ২৬শে মার্চ কুমিল্লা শহর যেন একটা শ্মশান— শুধু একটু পর পর বিকট আওয়াজ করে মিলিটারি লরী ও জিপ ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে, কাকগুলি পর্যন্ত যেন ভয়ে ডাকতে ভুলে গেছে— সব যেন কীসের প্রহর গুণছে। দাদু বলতে থাকলেন, রেডিওতে পৃথিবীর যা খবর পাও, সংগ্রহ করো। আমরা পাগলের মতো বিবিসি, এবিসি, ভোয়া, আকাশবাণী ও ঢাকার খবর শুনতে চেষ্টা করছি। ঢাকা খুলতেই বীভৎস গলায় সব কথা বলছে এবং শুধুই হুঁশিয়ার বাণী শোনাচ্ছে। বিদেশি রেডিওর মাধ্যমে জানলাম শেখ সাহেবকে ধরে নিয়ে গেছে এবং ঢাকাতেও গণহত্যা শুরু হয়েছে ও হচ্ছে। একটা অসহ্য যন্ত্রণা। [......] এমনি করে ২৬ তারিখ কেটে গেল। ২৭ তারিখে একই অবস্থা।
দাদুর প্রচণ্ড রক্তচাপ ছিলো— তা ভীষণভাবে বেড়ে গেল, বারবার মাথা ধুয়ে বসছিলেন দাদু। এক সময় তিনি আমার মা, আমার কাকা ও আমাকে ডেকে বললেন, সময় খুবই কম, তোমাদের কিছু কথা বলা দরকার। আমার বাঁচার খুবই প্রয়োজন ছিলো বাংলাদেশের জন্য, কিন্তু মনে হচ্ছে তার সম্ভাবনা নেই। .....এখন যদি আমি পালাই, তাহলে মিলিটারিরা আমাকে খুঁজে না পেলে আশেপাশের সব লোককে মেরে আগুন লাগিয়ে সব শেষ করে যাবে। আমাকে না পেলে নিরপরাধ লোকগুলির প্রাণ যাবে, সেটা তো হতে পারে না। ‘আই অ্যাম ট্রপ্ড ।” আমাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিতে এসে দুটো জিনিস করতে পারে। প্রথম হতে পারে— তারা আমাকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে গিয়ে আমাকে দিয়ে বিবৃতি দেওয়ানোর চেষ্টা করবে। তাই যদি করে, তাহলে আমি তাদেরকে একটা কথাই বলবো— To stop kill these unarmed people, তখন তারা আমার ওপর অনেক অত্যাচার করবে এবং মেরে ফেলবে ওখানেই।
আর একটা হতে পারে— মিলিটারিরা আমাকে এখানেই গুলি করে মারবে। আমার বিশেষ অনুরোধ, তোমরা আমার লাশটা বারান্দায় ফেলে রেখো, যাতে সকলে আমার মৃতদেহ দেখে মনে সাহস পায় বিদ্রোহ করবার জন্য। দাদু এটাও বললেন, দেখো, ওরা আমাকে এই দুদিনের মধ্যেই এসে নিয়ে যাবে। ...দাদু চোখের সামনে যেন পরিণতি দেখতে পাচ্ছিলেন। আমরা শুধু ছটফট করছি যন্ত্রণায়। ২৮শে মার্চ, দুপুর দুটোর সময় কারফিউ কিছুক্ষণের জন্যে তুলে নিলে কুমিল্লার অনেকেই দৌড়ে আমাদের বাড়িতে এসে দাদুর পায়ের ধুলো নিয়ে গেল। সবাই যেন বুঝতে পারছিলেন, এরপরে কারফিউ তুললে এই বাড়িতে আর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত থাকবেন না। সবাইকে দাদু বলতে থাকলেন, বাঁচাটাও যেমন সত্যি, মৃত্যুও ঠিক তেমনি সত্যি— তোমরা ভয় পাবে না, শুধু মনে সাহস নিয়ে এগিয়ে যাও— বাংলাদেশ দেখবে।
বিকেল ৪-টায় আবার কারফিউ শুরু হোল। সেই অসহ্য নীরবতা চারদিকে আবার। দাদু সন্ধ্যায় মাথা ধুলেন খুব নিশ্চিতভাবে, তারপর ‘কোয়েকার ওটস্’ খেলেন। আমাকে এরপর ডেকে বললেন, দাদু, ‘গীতটা আনো। আমি এনে দিলাম। দাদু বললেন- এবার শোনো। তারপর গীতার একটা অংশ খুলে লাল পেন্সিল দিয়ে দাগ দিয়ে পড়ে শোনালেন, যার অর্থ—“দেশের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিলে সে মরে না, সে শহিদ হয় এবং সে অবিনশ্বর, তার আত্মা কখনো মরে না। “ আমি তখন দিশাহারা, আমার মা, কাকা সকলে অসহায় হয়ে হতভম্ব হয়ে গেছে। দাদু আবারও বললেন, ওরা আজ রাতে আমাকে নিতে আসবে, যা বলছি তাই করবার চেষ্টা করবে এবং কাঁদবে না। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি শুয়ে পড়লেন।
আমি দাদুর মশারি গুঁজে দিয়ে এলাম। ওই ঘরে শুধু আমার কাকু ও দাদু থাকতেন। আমরা যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ রাত দেড়টার দিকে বিকট আওয়াজ হতে থাকল আমাদের সদর দরজায়। আমার কাকু ছুটে এসে মাকে বলল, মিলিটারি এসেছে, কী করব? মা বলল, দরজা খুলে দাও। আমরা ধড়মড় করে উঠে কাঠের গুতুলের মতন দাঁড়িয়ে থাকলাম। অনেক ভাঙচুরের আওয়াজ শুনতে পেলাম। একটু পরে দেখলাম, ৪/৫ জন মিলিটারি আমার মার ঘর থেকে আমাদের ঘর হয়ে ঢুকছে এবং আমাকে বলছে দরজা খুলতে। আমি একে একে দরজা খুলতে থাকলাম। তারা আমার পেছনে বেয়নেট উঁচিয়ে চলতে থাকল। আমি আবার ঘুরে এসে মার ঘরে থামলাম, তারা সেখান থেকে মার্চ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি তাদের পেছনে পেছনে দৌড় দিলাম, ততক্ষণে দেখি, সামনের ঘরে আমার ছোট ভাই রাহুল মরার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি গেট পার হয়ে রাস্তায় এসে থামলাম। দেখি অন্ধকারে অনেকগুলি মিলিটারি লরী লাল আলো 'রিংক' করতে করতে মিলিয়ে যাচ্ছে।
সে কী অন্ধকার। ওখানে অন্ধকার আকাশের নীচে দাঁড়িয়েই বুঝতে পারলাম আমার দাদু ওই অন্ধকার চিরতরে মিলিয়ে গেছেন। আমার মা টেনে আনলো ঘরে, ঘরে ঢুকেই পা’টা কীসে যেন পিছলে গেল, দেখি রক্ত— অনেক ছোপ ছোপ রক্ত। ভাবলাম দাদু চলে গেছে, কাকু নিশ্চয়ই আছে— কোথাও ভয় পেয়ে লুকিয়েছে; জোরে জোরে কাকুকে ডাকতে থাকলাম। কেউ সাড়া দিল না— ছুটে দাদুর ঘরে এলাম, দেখি ফ্যান ঘুরছে— তার সাথে ঘাটে সাদা মশারি হাওয়াতে উড়ছে। খাট দুটো খালি। আমি মাটিতে বসে পড়লাম, বুঝলাম দাদু চলে গেছে, কাকুও গেছে। আমাদের আর একসাথে যাওয়া হলো না। পরদিন সকালে আমাদের গেটে দাদুর একপাটি জুতো পড়ে থাকতে দেখেছি। আমরা ২৯শে মার্চ দুপুর দুটোতে বেরোই অনিশ্চয়তার পথে। পরে শুনেছি ১৪ই এপ্রিলের দিকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে অকথ্য নির্যাতন করে মেরেছে আমার দাদুকে।
তথ্য সূত্র : সঞ্জীব দত্ত : অনুপম হায়াত, প্রকাশ জানুয়ারি ২০০০। প্রকাশক, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা- ১৫-১৬। মূল লেখা : ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত : মিনার মনসুর, প্রকাশ ১৯৯৬ পৃষ্ঠা- ৪।

0 মন্তব্যসমূহ