Ticker

6/recent/ticker-posts

তিতাসের কবিদের ঈদ পুনর্মিলনী ও কবিতা আড্ডা।


প্রতি ঈদেই মায়ের টানে বাড়ি ফেরে লাখো লাখো মানুষ। মানুষের মতো নদীরও মা থাকে। এই যেমন আমাদের তিতাস নদী। তারও এক মা আছে। আমাদের পেছনেই সে বহতা তিতাস। শহর ছেড়ে সে ছুটে চলছে গ্রামের দিকে। মা মেঘনা নদীর কোলে তার জন্ম। সরাইল থেকে উৎপত্তি হয়ে এই গ্রাম, সেই গ্রাম ছুঁয়ে, সরাইল-নাছিরনগর হয়ে বিজয়নগরের প্রান্ত ছুঁয়ে একসময় তিতাস এসে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কোলে। কিন্তু শহরের জীবন কী মায়ের মতো প্রশান্তি দিতে পারে? দখলে-দূষণে বিরক্ত হয়ে তাইতো তিতাস শহর ছেড়ে আবার ছুটে চলে গ্রামের দিকে- তার মায়ের কোলে।


তিতাস আখাউড়া-কসবা হয়ে বাঞ্ছারামপুরের প্রান্ত ছুঁয়ে আবার ফিরে আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের দিকে। শহরের অদূরে গোকর্ণঘাট। অদ্বৈতদের গ্রাম। তিতাস এখানে আসে, অদ্বৈতকে দোলা দিয়ে একটু বাঁক নিয়ে আবার ছুটে চলে নবীনগরের দিকে, ওই দিক দিয়েই যে তার মায়ের বাড়ি। প্রায় ৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রা তার। যাত্রা পথে কত জনপদ, ফসলের জমি, খাল-বিল পার হয়ে আসে সে। শেষে পাগলা নদী হয়ে মা মেঘনার বুকে আশ্রয় নেয় কন্যা তিতাস। মাও যেন তাকে বুকে জড়িয়ে নেয় ‘পাগলি মেয়ে’ বলে।


প্রতি ঈদেই মায়ের টানে বাড়ি ফেরে লাখো লাখো মানুষ। বাড়ি ফিরে পশুপাখিরাও, বাড়ি ফিরে কবিরাও। অন্যান্য মানুষ এবং পশু-পাখিরা বাড়ি ফিরলেও কবিদের সাথে তাদের পার্থক্য হলো : কবিরা মানুষ এবং পশু-পাখিদের মতো এক জায়গায় আস্থানা গেড়ে থিতু হয় না। কবিদের কাছে বাড়ি- খানিক বিশ্রামের, চিঠি আসার ঠিকানা প্রদানের একটা উপলক্ষ মাত্র- কবিরা মূলত আমৃত্যু ছুটে চলে এক অন্তহীন গন্তব্যে, কবিতার সন্ধানে। এক জীবনে কেউ সে কাব্য সূধার সন্ধান পায়, কেউ পায় না।



এই সদ্য সমাপ্ত হয় ঈদে তথাকথিত বাড়িতে ফিরে আসলেও কবিরা ঘরবন্দি থাকেনি। কবিতার সন্ধানে, কবিতার আহ্বানে এক বিকেলে তাদের একদল সম্ভবত হয়েছিলেন শালগাঁও-কালিশিমা স্কুল অ্যান্ড কলেজের পেছনের খোলা মাঠে। যার পাশ দিয়ে মায়ের দিকে ছুটে যাচ্ছিল শান্ত-কোমল স্নিগ্ধ কন্যা- তিতাস। যে তিতাসকে ঘিরে তার কোল বেড়ে ওঠা লেখকদের দুর্দমনীয় আবেগ আর উচ্ছ্বাস নিত্য খেলা করে। সেই তিতাসের তীরে অনুষ্ঠিত হলো, তিতাসের কবিদের ঈদ পুনর্মিলনী ও কবিতা আড্ডা। 


এ আড্ডার কোনো শ্রোতা ছিল না। ছিল হয়তোবা! একদল কচুরিপানা, যারা ভেসে চলছিল নীরবে। একটি উন্মুক্ত খোলা মাঠ, কিছু সবুজ দূর্বা ঘাস, হঠাৎ উড়ে যাওয়া সন্ধ্যার ক্লান্ত পাখি। তিনটি নির্মাণাধীন নৌকা,পাশের স্কুলের দেয়াল- নীরব সাক্ষী হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দু-একটা পানকৌড়ি বারবার ডুব দিচ্ছিল, আবার ভেসে উঠছিল- মনে হয় উঁকি দিয়ে শুনছিল কবি ও কবিতার কথা। ঝুঁকে পড়া পরিষ্কার আকাশ, নদীর ওপারের- দক্ষিণের খোলা প্রান্তর থেকে ছুটে আসা হিমেল বাতাস জানান দিচ্ছিল বসন্ত বিদায়ের আভাস।


ভাবলাম- কবিতার ফাঁকে ফাঁকে কেউ কয়েকটি গানের কলি গেয়ে উঠলে মন্দ হতো না। রহিম স্যার থাকলে নিশ্চয়ই সে অভাব-আবদার পূরণ হতো। কবি-শিল্পী আব্দুর রহিম স্যারের কথা মনে হতেই কিছুটা দুঃখের ছায়াও এসে গ্রাস করল। গতকাল রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্যারের শিশুকন্যার অকাল মৃত্যু হয়েছে। আমি উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকলাম নদীর দিকে। তার বুকে ভেসে চলছে একদল কচুরিপানা- নীরবে, অন্তহীন গন্তব্যে। প্রত্যেকে একগুচ্ছ দুঃখকে জলে ডুবিয়ে উপরে বয়ে চলছে ভীষণ শান্তভাবে, যেন কিছুই হয়নি।


প্রায় এক যুগ আগে রহিম স্যারের আরেকটি সন্তান মৃত্যু বরণ করেছিল। সন্তান হারানোর দুঃখকে বুকের গভীরে প্রথিত করে তিনি কবিতা লেখেন, গান শোনান, শিক্ষকতা করেন-সাহিত্য আড্ডায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই ভিতরে তিনি কতটা দুঃখ লালন করে চলেন। এমনিতে আমি নিজেও আবেগি মানুষ। যে কোনো মানুষের মৃত্যুতে ব্যথিত হই। তাঁর ওপরে দুটি কন্যা সন্তানের পিতা। কোথাও কোনো শিশু মারা গেলে তার চেহারায় নিজের সন্তানকে দেখি। এক অজানা ভয়ে আমার হৃদয়েও ভয়ের ঢেউ খেলে যায়। কচুরিপানাগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো এর কোনো একটা আমাদের রহিম স্যার, কোনো একটা হয়তোবা আমি এবং অন্যরাও। 


আমার একবার মনে হলো এই কচুরিপানাগুলো যদি কথা বলতে পারতো, তাহলে তারাও হয়ত ভাটিয়ালি গাইতে গাইতে ভেসে চলত। লিখতে পারলে ওরাও লিখত- একগাদা দুঃখের কবিতা। যেতে যেতে দুপাড়ের মানুষ, পশুপাখি আরো প্রকৃতিকে শোনাতো তাদের দুঃখের আখ্যান। মাঝে মাঝে বসে পড়তো কোনো এক নদীর বাকের পাশে, থেমে যেত, বসে যেত আমাদের মতো- কবিতার আড্ডায়।




 


আমাদের আজকের আড্ডা-প্রধান তিতাস পারের খ্যাতিমান কবি-গবেষক জয়দুল হোসেন স্যার। ৭০ বছর ধরে যিনি দেখছেন তিতাসকে। যিনি কবিতা লেখেন, লেখেন তিতাসের রূপ-সুধার কথা। লেখেন, তিতাসের দুঃখ-বেদনার কথা। কবিতায় কবিতায় বলেন- ‘তিতাসের বেদনার কথা শুনে যাও/ হারিয়ে গিয়েছে সেই পাল তোলা নাও/ পালতোলা নাও নাই হাল ধরা মাঝি/ বিলীন হয়েছে কোথা খুঁজে ফিরি আজি? খুঁজে ফিরি তিতাসের ভাটিয়ালি গান/ গানে গানে প্রাণে প্রাণে মনে আনচান।” 


আজ তিতাসের কবি জয়দুল হোসেনকে পেয়েছি তিতাসের পাশে। তার ডান-বামে ছোট ছোট শাখা নদীর মতো বসেছি আমরা। এবারে আড্ডার আয়োজক কবি সৈ. ম আকবার ভাই ও তাদের কাব্য চক্র। বছর বিশেক আগে তাদের একটি সাহিত্য গ্রুপ ছিল। যারা নিয়মিত এরকম আড্ডা আয়োজন করতেন। যাদের অনেকেই কর্মসূত্রে এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন। তাদেরকে নিয়েই মূলত এবারের আড্ডার আয়োজন। 


এই গ্রুপের কবিদের মধ্যে সৌমিক ছাত্তার ভাই, রুদ্র মুহাম্মদ ইদ্রিস ভাই, হেলাল উদ্দিন হৃদয় ভাই, এহসানুল ইয়াসিন ভাই, রবিউল আলম নবী ভাই উপস্থিত ছিলেন। শেষোক্ত দুইজন দীর্ঘদিন পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনো আড্ডায় যুক্ত হলেন। মাশরেকি শিপার ভাই, ইউনুছ সরকার ভাই ও নূরে আলম চৌধুরী ভাই এবং আমি ছিলাম নতুন। আমির হোসেন স্যার এবং হানিফ স্যার অন্য আরেকটি অনুষ্ঠানে শেষ করে একেবারে শেষ সময়ে উপস্থিত হয়েছেন। কথায় কথায় প্রয়াত কবি মুহিবুর রহিম স্যার এবং সুনামগঞ্জে অবস্থান করা কাজী বর্ণাঢ্য ভাইকেও স্মরণ করা হয় আড্ডায়।


এক ফাঁকে বলে রাখি, আমাদের উন্মুক্ত সাহিত্য আড্ডা বা কবিতা পাঠের আসরে কোনো নির্ধারিত বিষয় থাকে না। দেশ-বিদেশের চলমান ঘটনা, রাজনীতি, যুদ্ধ কিংবা ব্যাবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে অপরাধ, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি কিংবা প্রেম-ভালোবাসা-পরকীয়া সব কিছু থাকে আলোচনার তালিকায়।  

মানুষের মৌলিক অধিকার, সাহিত্য-সংস্কৃতির সবকিছুই কারো না কারো কবিতায় পাঠ্য হয়ে ওঠে। গল্প-কবিতার গঠন কিংবা বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে কখনো চুলচেরা বিশ্লেষণ, কখনো গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনায় বসে আমাদের সংসদ অধিবেশন। ফলে বৈশ্বিক ঘটনাবলিকে পেছনে ফেলে, লোকালয় ছেড়ে আমরা বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই- এমন কথা যারা বলেন, ভাবেন- তাদেরকে বলতে চাই, আমরা পৃথিবীকে আড়াল করে বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই না বরং আমরা যেখানে বসি, দাঁড়াই- সেটিই পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।


চমৎকার একটি আড্ডা আয়োজন করায় কবি সৈ. ম আকবার ভাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আমাদের পরবর্তী আড্ডায় আপনাদের স্বাগত।


----

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

২৩ মার্চ ২৬

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ