Ticker

6/recent/ticker-posts

শান্তনু কায়সার


গতকাল ছিল লেখক-গবেষক, অধ্যাপক শান্তনু কায়সার-এর নবম মৃত্যু বার্ষিকী। বাংলাদেশে অদ্বৈত গবেষণার প্রতিকৃত শান্তনু কায়সার, যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর কাছে আব্দুর রাজ্জাক স্যার নামেও সম্মক পরিচিত ছিলেন। কর্মসূত্রে তিনি ১৯৭৪ সালে সালের জুন মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন জ্ঞানী-গুণী শিক্ষক, সাহিত্যিক ও সংগঠক হিসেবে তিনি সকলের মাঝে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।



শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক নানা সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ন। তাঁর সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা নতুনভাবে গতিপ্রাপ্ত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, ঋত্বিক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাট্য সংস্থা (ব্রানাস), সঙ্গীত সংসদ, সাহিত্য একাডেমিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সৃষ্টি কিংবা ‍পূর্বে থাকা সংগঠনগুলোর সাথে নিজের যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি স্থানীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করেন তিনি। 



কবি আসাদ চৌধুরী, গবেষক মুহম্মদ মুসা, কথাসাহিত্যিক মিন্নাত আলী, কবি-গীতিকার, সংগঠক, নাট্যব্যক্তিত্ব অধ্যাপক একেএম হারুন-অর-রশিদ, কবি মতিউল ইসলাম, অধ্যাপক হরলাল রায়, প্রফেসর মোহাম্মদ আবুল হাসান, প্রফেসর আবদুন নূর, গল্পকার মোহাম্মদ সিরাজ, রেকটোর স্বত্বাধিকারী মহিউল ইসলাম, কবি আবদুল মান্নান সরকার, নাট্য ব্যক্তিত্ব মনজুরুল আলম, প্রফেসর মোহাম্মদ আশরাফ, কবি খুরশিদুল ইসলাম, কবি জয়দুল হোসেন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংস্কৃতি চর্চার সুনাম বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে আজীবন কাজ করে গেছেন।



অধ্যাপক শান্তনু কায়সারের উল্লেখযোগ্য কীর্তি হচ্ছে অদ্বৈত গবেষণা। বলা হয়ে থাকে শান্তনু কায়সার অদ্বৈত গবেষণা না করলে এবং তা জনসম্মুখে প্রকাশ না করলে অদ্বৈত মল্লবর্মণ দুই বাংলায় অনেকটা অপরিচিতই থেকে যেত। এমনকি অদ্বৈত মল্লবর্মণের বিখ্যাত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ পাঠক সমাজের কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয়তা করেছে তুলেছেন তিনিই। সত্তরের দশকের শেষের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে অদ্বৈত চর্চা শুরু এবং ঢেউ তুলেছেন অধ্যাপক শান্তনু কায়সার যা আজও সমস্বরে চলমান। কবি ও গবেষক জয়দুল হোসেন এক বক্তব্যে বলেন- ‘শান্তনু স্যার ব্রাহ্মণবাড়িয়া না আসলে আমরা হয়তো অদ্বৈতকে কোনোদিন চিনতে বা জানাতে পারতাম না।’



অধ্যপক শান্তনু কায়সার আশির দশকে ব্রানাসের মাধ্যমে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নাটকের মঞ্চায়ন করেছেন, এই নাটকের অসংখ্যবার মঞ্চস্থ হয়েছে স্থানীয় অভিনয়শিল্পীদের মাধ্যমে। ৯০ এর দশকে সাহিত্য একাডেমির মাধ্যমে অদ্বৈতের জন্মস্থান গোর্কণঘাটে অদ্বৈত মেলার প্রচলন করেছেন। যা এখনো চলমান রয়েছে। ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর অদ্বৈত মল্লবর্মণ বিষয়ক এর জীবনীগ্রন্থ ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ’। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমে উচ্চ মাধ্যমিকে সহপাঠ্য হিসেবে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ গ্রন্থটির পরিমার্জিত রূপে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অন্যতম কৃতিত্ব অধ্যাপক শান্তনু কায়সারের।



দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার জীবনে তাঁর কবিতা, নাটক, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ, প্রবন্ধ-গবেষণা এবং সম্পাদনা মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ সময় তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন থেকে সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- প্রত্যাশা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯০), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫), অদ্বৈত মল্লবর্মণ স্মৃতি পুরস্কার, ভারত (১৯৯৯), কুমিল্লার কাগজ পুরস্কার (২০০৫), অদ্বৈত মল্লবর্মণ পুরস্কার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া (২০১৩), জীবনানন্দ পুরস্কার (২০১৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০১৪) ,‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ সাহিত্য পুরস্কার’-২০২৪’।



অধ্যাপক শান্তনু কায়সারের জন্ম ১৯৫০ সালের ৩০ ডিসেম্বর। তাঁর জন্মস্থান চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার সাজনমেঘ গ্রামের মুন্সী বাড়ি। বাবা সিরাজুল হক ও মা মাকসুদা খাতুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষে অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি। পাশাপাশি চলতে থাকে তাঁর সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা। কর্মে জীবনের বিভিন্ন সময় তিনি কুমিল্লা সরকারি কলেজ, জামালপুর জাহেদা সাফির মহিলা কলেজ, লক্ষ্মীপুর চর আলেকজান্ডার কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া অধ্যাপনা করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শেষে অবসরের পর তিনি কুমিল্লা নগরীতে থাকতেন।



ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে অধ্যাপনার সময় তিনি এখানকার সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। কর্ম ও ভালোলাগার সূত্রে দীর্ঘদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বসবাস করেছেন। একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে গেলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই জেলার সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে এত বেশি থেকেছেন, আসা-যাওয়া করেছেন এবং কাজ করেছেন যে দেশের অনেকেই ভাবেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বুঝি তাঁর আসল বাড়ি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে থাকার সময়ই তিনি অদ্বৈত গবেষণা ও চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। গুণী এই সাহিত্যিক ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।



২০২৪ সালে বহুমাত্রিক লেখক ও অধ্যাপক শান্তনু কায়সারের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য এবং শান্তনু কায়সার স্মৃতি পাঠাগার ও চর্চা কেন্দ্র, সাজনমেঘ যৌথভাবে 'ঐতিহ্য-শান্তনু কায়সার সাহিত্য পুরস্কার' প্রবর্তন করেছে। এই পুরস্কারটি প্রতিবছর শান্তনু কায়সারের জন্মদিনে (৩০ ডিসেম্বর) ঘোষণা করা হয় এবং ১১ এপ্রিল লেখকের প্রয়াণ দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।



(উল্লেখ্য এই লেখাটি তৈরি করতে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি ছাড়াও বিভিন্ন জনের বক্তব্য, বেশ কয়েকটি গ্রন্থ, উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন অনলাইন নিউজ-এর সহায়তা নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের তথ্য বিভ্রাট বা তথ্য সংযোজন থাকলে আমাকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ রইল। সংযুক্ত ছবিগুলো কবি জয়দুল হোসেন স্যার ও অধ্যাপক শান্তনু কায়সার স্যারের ছেলে, বড় ছেলে রাসেল রায়হান ভাইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত। এই লেখাসহ আমার অন্যান্য লেখা আমার ব্লগেও পড়া যাবে। লিংক কমেন্টে দেওয়া হলো)


ধন্যবাদসহ

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

১২ এপ্রিল ২৬






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ