২০ শে নভেম্বর ১৯৭১। ঈদ-উল-ফিতর। ঈদগাহে মেলা লোক। আশাতীত। মেজর আব্দুল্লাহ উর্দুতে বক্তৃতা করলেন, মোনাজাত করলেন পাকিস্তানের জন্য। বারে বারে মনে পড়ে, জেলে বন্দী মুক্তিফৌজের ছাত্রদের কথা। বাসা থেকে পিঠা পায়েস দিলে কেমন হয়?
বাসায় ফিরে স্ত্রী-কন্যার সাথে পরামর্শ করলাম। ওরা দু'জনেই সোৎসাহে সায় দিলো এবং টিফিন ক্যারিয়ার তৈয়ার করতে গেল। কিন্তু হঠাৎ একটা ভয় আমায় পেয়ে বসে। আমার এ টিফিন ক্যারিয়ারের ঘটনাটি যদি বাইরে জানাজানি হয়ে যায়, মিলিটারি টের পায় তাহলে তো সমূহ বিপদ!
তাহলে? হ্যাঁ ঠিক আছে, বিকালে জেলখানায় গিয়ে জেলার সাবের সাথে পরামর্শ করে নিই। দুপুর গড়িয়েছে। “রেকটো' থেকে ঈদ সংখ্যা দৈনিক পাকিস্তান' একখান কিনলাম। কাগজখানা বগলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম জেলখানায়। জেলার সাবের রুমে বসে সব খবরাখবর নিই। ঈদ উপলক্ষে কয়েদিদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে–সেমাই, মাংস ইত্যাদি। কথায় কথায় নজরুলকে পিঠা পায়েস পাঠানোর কথাটা বললাম।
জেলার সাব একেবারে লাফিয়ে উঠলেন, না-না সর্বনাশ, ও কাজটি করতে যাবেন না। এমনিতে পাঞ্জাবিরা আমাদের সন্দেহের চোখে দেখছে, তারপর যদি অমন ঘটনা ঘটে তা হলে আপনারও বিপদ, আমারও বিপদ, স্যার। আমার উৎসাহ একেবারে চুপসে গেল।
জেলের ভিতরে যাবেন? তালা খুলতে বলবো, স্যার?
: না, এখন আর ভিতরে যেতে চাই না। আপনি বরং নজরুল ইসলামকে ডাকান, একটু দেখে যাই।
সেপাই গিয়ে খবর দিতেই নজরুল ওপাশে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো। বেশ হাসি খুশি মুখ।
: কী, কেমন ঈদ করলে? তোমরা কি খেলে আজ?
নজরুল হাসতে হাসতেই জবাব দেয়, জেলের ভিতর থাকলেও আজ আমরা ঈদের খানা খেয়েছি। চাচা আমাদের আজ সেমাই, গোশত সব দিয়েছেন। নজরুল তেমনি হাসতে থাকে।
: আপনার হাতে ওটা কি স্যার? দেখি?
আমি ঈদসংখ্যা দৈনিক পাকিস্তানখানা ওর হাতে তুলে দিলাম। নজরুল জানালা গলিয়ে দু'হাতে কাগজখানা চোখের সামনে মেলে ধরলো। আমার মনে পড়লো, কতোদিন ওরা কাগজ পড়ছে না— বাইরের জগতের কোনো খবরই ওরা পাচ্ছে না, নিয়ে নিক কাগজখানা।
: কাগজটা রেখে দেই, স্যার?
আমি কোনো জবাব দেবার আগেই জেলার সাব হা-হা করে উঠলেন, না না না, এ হয় না। বাইরের কোনো কিছু দেওয়ার নিয়ম নেই। : না, চাচা, কেউ দেখবে না। কেউ জানবে না। এই বলতে বলতে নজরুল কাগজটাকে ভাঁজ করে ওর গেঞ্জির ভিতরে লুকিয়ে ফেললো। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রাতের বেলায় আমি একা একা পড়বো। এ কথা বলেই সে হাসতে হাসতে জানালা থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। কিন্তু তখন কি আমি জানতাম, জানালা থেকে মুখ সরিয়ে নেওয়া মানেই দুনিয়া থেকে সরে পড়া?
ঈদের পরদিন ২১শে নভেম্বর সকালে চলে গেলাম শহর থেকে দূরে। সরাইল কালিকচ্ছের এক গ্রামে। সেখান থেকে ফিরি ২২শে নভেম্বর সকাল ন'টা দশটার দিকে। এসেই একজনের মুখে শুনলাম, গেল রাতে জেলখানা থেকে গোটা পঞ্চাশেক বন্দিকে কুড়ুলিয়া খালের কাছে নিয়ে গুলি করে নৃশংসভাবে মেরে ফেলেছে। বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো ঃ মুক্তিফৌজের ছেলেগুলিকে মেরে ফেলেনি তো! ছুটলাম জেলখানায়।
জেলখানায় মিলিটারিদের আনাগোনা। সাহস হলো না কাছে যেতে। ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পরে আবার গেলাম। মিলিটারি নেই বটে তবে জেলার সাবও অফিসে নেই। বাসায় চলে গেছেন। ছুটলাম জেলার সাবের বাসায়। হ্যাঁ, যা রটেছে তা' সত্যি বটে। তবে ঠিক কতজনকে কাল মারা হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা কিছুতেই প্রকাশ করলেন না—আইনের নিষেধ আছে বলে। শুধু বললেন, আপনার ছাত্ররা কেউ বেঁচে নেই ।
আকাশটা সত্যি যেন মাথায় ভেঙে পড়লো। আকাশের ভারে মাথা ঝিম্ ঝিম্ করতে লাগলো আর মনের আকাশে বিদ্যুৎ ঝিলিকের মতো ভাসতে লাগলো নানা ছবি, নানা মুখ। হাসি মুখের সেই তরুণ সাহসী বীর বাংলা অনার্সের ছাত্র নজরুল ইসলাম আর বেঁচে নেই। বেঁচে নেই ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের কচি সবুজ ছেলেটিও। দেশের মুক্তির জন্যে অকাতরে প্রাণ দিলো তোলারাম কলেজের সেই নাম না জানা ছাত্রটি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের সামসুল হক, বাজিতপুর কলেজের নিরীহ, খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা ছাত্রটি গুলি করে মারলো ঢাকা মোহাম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ, টুপি মাথায় মুন্সী কিসিমের মুক্তিপাগল মানুষটিকেও?
প্রথমে বিশ্বাসী হয় না, এ কেমন করে হয়, একদিন আগেও ওদের খোঁজ খবর নিয়েছি, কথা বলেছি। একটা রাজনৈতিক মীমাংসা হবে বলে আশ্বাস দিয়ে এসেছি- সেই সংগ্রামীর ছাত্র গুলি আর বেঁচে নেই? অসম্ভব।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, জল্লাদ সরকার বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, শহরে বন্দরে যেভাবে বাঙালি হত্যা করে চলেছে, তাদের পক্ষে এ হত্যা মোটেই অসম্ভব নয়। আমি মাটির দিকে তাকিয়ে মাটির মতোই নীরব হয়ে রইল।
তথ্যসূত্র : সব ছহী বাত্ : (অংশ বিশেষ) মিন্নাত আলী, প্রকাশ : গণবাংলা, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৩।
পুনশ্চ : কথাসাহিত্যিক মিন্নাত আলী স্যারের লেখায় যে নজরুল ইসলামের কথা বলা হয়েছে সংযুক্ত ছবিটি সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে ২০২১ সালে দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায়। লিংকটি কমেন্টে দেওয়া হল।
যাঁদের আত্মত্যাগে আমরা আজ স্বাধীন দেশে ঈদ উদযাপন করি, আসুন এই এদের খুশিতে স্মরণ রাখি তাদেরও।–মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

0 মন্তব্যসমূহ