Ticker

6/recent/ticker-posts

অধ্যাপক হরলাল রায়: মৃত্যু নেই যার : আবদুর রশীদ


(সাহিত্য একাডেমির সাধারণ সভায় বক্তব্য রাখছেন তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত অধ্যাপক হরলাল রায়।)


ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতির পীঠস্থান বলে পরিচিত যার নাম। স্কুল জীবন থেকে শুনে এসেছি, বিভিন্ন বই, পত্র পত্রিকায় পড়েছি এর কথা। কৌতূহল বোধ করতাম এ জায়গাকে দেখার জন্যে; পরিচিত হতে এর পরিবেশ ও জনগণের সঙ্গে। সেই সুযোগ এলো। 


৬ই জানুয়ারি, ১৯৮৭। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করতে এলাম। অধ্যক্ষের কক্ষে গিয়ে বসলাম। চেয়ারে নয়, সোফায়। সময় ৯-৩০ মি.। প্রতীক্ষা করছিলাম একজনের। তিনি বাংলা সাহিত্যে শুধু একজন পণ্ডিতই নন- কলেজের উপাধ্যক্ষ এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। বাংলা ব্যাকরণ ও রচনা বই পড়তে গিয়ে পরিচয় হয় তার নামের সঙ্গে। বসে বসে পত্রিকা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম তার চেহারা কেমন হবে। একজন লেখক, জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হবে এ চিন্তা মনে কিছুটা কল্পনার পরশ বয়ে আনবে স্বাভাবিক ব্যাপার। 



(মতিউল ইসলাম স্মারক বক্তৃতা ১৯৮৬তে বক্তব্য রাখছেন অধ্যাপক হরলাল রায়।)

                       

ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দশটা বাজলো। তিনি এলেন। নমস্কার জানিয়ে পরিচয় দিলেন “আমি হরলাল রায়।” ঠোঁটে হাসি, মুখে পান, চোখ দুটো উজ্জ্বল, সারা মুখে দীপ্তির আভা। পরিচয় পর্ব শেষ। মিষ্টির ফরমায়েশ দিলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘স্যার, আমার চেহারাটা কেমন হবে বলে মনে করেছিলেন? নিশ্চয়ই কালো, মোটাসোটা ধরনের, তাই নয়?” আমি হাসলাম। বুঝলাম উনি শুধু পণ্ডিতই নন, রসিকও বটে।


এরপর থেকে একসাথে চাকরি করলাম। আমি অধ্যক্ষ, হরলাল রায় উপাধ্যক্ষ। সময়ের পরিমাপে ওনাকে যদিও কম সময়ের জন্যে সহকর্মী হিসাবে পেয়েছি, লাভ করেছি অনেক কিছু। এক সঙ্গে আমরা চলেছি একই পরিবারের সদস্যরূপে। জীবন ও সমাজের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো সম্পর্কে আলাপ আলোচনা করেছি। করেছি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বিচার-বিশ্লেষণ। কখনো আমরা একমত হতে পেরেছি, কখনো নয়। দেখতাম, তিনি আলোচনা শুনছেন তন্ময় হয়ে। মাঝে মাঝে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে। 


বক্তা হিসেবে তিনি ছিলেন যেমন : অসাধারণ, শ্রোতা হিসাবেও ছিলেন তেমনি মননশীল। উদার মনোভাব ও সচ্ছল দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন তিনি। তার দূরদর্শিতার পরিচয় পেয়েছি বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বর্তমান সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে তাঁকে দেখেছি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে। কী আলোচনার টেবিলে, কী সভা সমিতিতে সর্বত্রই ছিলো তাঁর অবাধ বিচরণ, ছিলেন তিনি প্রাণবন্ত বক্তা।

          

(সংশ্লিষ্ট ছবির মাঝখানে রয়েছেন অধ্যাপক হরলাল রায়। ছবির বিস্তারিত তথ্য অজানা। )


প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ছিলেন বাবু হরলাল রায়। একদিনের কথা মনে পড়ে। কলেজে একটি বিচার সভা বসেছিলো। হরলাল বাবু বক্তব্য রাখার জন্যে উঠে দাঁড়ালেন। সকলের দৃষ্টি তাঁর দিকে। সারা হলে পিন পতনের শব্দ। তিনি এক পর্যায়ে বললেন “আমরা শিক্ষক, ব্যক্তিত্ব আমাদের অমূল্য সম্পদ। লক্ষ কোটি টাকার বিনিময়েও আমাদের সেই সত্তাকে কেউ কিনে নিতে পারবেনা।” আমি কিছুক্ষণের জন্যে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। তাঁর সেইদিনের বক্তৃতায় সবার চোখে পানি এসেছিল। সভায় উপস্থিত সকলে যেন পাথরের মত স্থবির হয়ে পড়েছিলো। এত আত্মবিশ্বাস ও পেশার অহমিকা আর কারো বেলায় আমি দেখেছি বলে মনে পড়ে না।


তাঁর জন্যে আমরা শিক্ষকমণ্ডলী সত্যিই গর্ববোধ করতাম। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের অলংকার। শিক্ষক হিসাবে কেমন ছিলেন বাবু হরলাল রায়? কতটুকু প্রিয় ছিলেন তিনি ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবক মহলে? এর উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে দেখতাম— ছাত্র-ছাত্রীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো উনি কখন ক্লাসে যাবেন। আর উনি যখন পড়াতেন, মনে হতো হৃদয় নিঙড়ে সব উজাড় করে বিতরণ করছেন আর শিক্ষার্থীরা তা গলাধঃকরণ করছে। 


সার্থক শিক্ষক বলতে যা বোঝায়, হরলাল বাবু তা-ই ছিলেন। জীবনের পথে মানুষ যাত্রা করে নিজেকে খুঁজে পাবার জন্যে। একদিন তার সে যাত্রা শেষ হয়। এমনিভাবেই শেষ হয়ে গেলো হরলাল রায় এর যাত্রা। বিএসসি ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাবহারিক পরীক্ষার প্রয়োজনে শিক্ষা সফরে-যাওয়ার জন্যে তার কী উৎকণ্ঠা! আমাকে শুধু বলতেন “স্যার, আপনি গেলে আমার যাওয়া হয়।” ইচ্ছা ন৷ থাকা সত্ত্বেও সম্মান প্রদর্শনের খাতিরে যেতে রাজি হলাম।



(একাডেমি প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, প্রয়াত অধ্যাপক হরলাল রায় স্মরণে সাহিত্য একাডেমি প্রতিবছর হরলাল রায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। ১৯১১ সালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন অধ্যাপক হরলাল রায়ের পত্নী রমা রায়।)
                                      

৮ই মার্চ, ১৯৮৮। দিনটি ছিলো মঙ্গলবার। শ্রীমঙ্গল চা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বাসে চড়ে গেলাম আমরা। ফেরার পথে দুর্ঘটনা। অন্যান্যদের সাথে আমি হলাম আহত। ঢাকাস্থ পঙ্গু হাসপাতালে থাকাকালীন জানতে পারলাম সেই দুর্ঘটনায় হরলাল বাবু মৃত্যুবরণ করেছেন। আবেগ প্রকাশ করতে পারলাম না। ফেললাম একটি দীর্ঘশ্বাস। ভাবলাম সেই কথা, “স্যার, আপনি গেলে আমার যাওয়া হয়” এ কথার মধ্যে কী তার পরপারে যাওয়ার সুর অনুরণিত হয়েছিল? বুঝতে পেরেছিলেন কী এ ধরাধাম থেকে তাঁর বিদায়ের সময় হয়ে এসেছে? 


বাবু হরলাল রায় আর নেই। তাঁর অকাল মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান হলো। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব, নিষ্ঠা, সাধুতা ভাবীকালের আদর্শ হয়ে থাকবে। আজও ধ্বনিত হচ্ছে এ দেশের মাটিতে, আকাশে, বাতাসে তাঁর নাম। তাই তো মনে হয় "মৃত হরলাল রায় জীবিত হরলাল রায় এর চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।” 


(অধ্যাপক হরলাল রায় স্মরণে শোক মিছিল। এটি মৃত্যু পরবর্তী শোক মিছিল নাকি আরো কয়েক বছর পরের তা এখনো জানতে পারিনি।  হরলাল রায় স্যারের মৃত্যুর পর বেশকিছু শোক সভা এবং মিছিল হয়েছিল। এবং এগুলোর ভিডিও চিত্র ধারণ করা হয়েছিল। কারো কাছে ভিডিওগুলো থাকলে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছি।)




মৃত্যু নেই যার : অধ্যাপক আবদুর রশীদ, সাবেক অধ্যক্ষ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ।

তথ্যসূত্র : অধ্যাপক হরলাল রায় স্মারকগ্রন্থ-১৯৯২, সম্পাদনা, জয়দুল হোসেন। পৃষ্ঠা : ৪৫-৪৭

সংযুক্ত ছবিগুলো কবি জয়দুল হোসেন স্যারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা। প্রতিটি ছরির সাথে ক্যাপশন যুক্ত করা হলো।



(একাডেমি প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, প্রয়াত অধ্যাপক হরলাল রায় স্মরণে সাহিত্য একাডেমি প্রতিবছর হরলাল রায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। ১৯৯১ সালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন অধ্যাপক হরলাল রায়ের পত্নী রমা রায়।)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ