বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসের সাথে জড়িত একটি বাড়ির নাম বিউটি বোর্ডং। এটিকে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির গুণী মানুষদের আড্ডার একটি কেন্দ্র বা ইতিহাসের ভিত্তিভূমি বলে মনে করা হয়। বিউটি বোর্ডিং-এর জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, অভিনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
পুরান ঢাকার বাংলা বাজারে ১নং শ্রীশদাস লেনে অবস্থিত দোতলা এই বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। বাড়িটি ১১ কাঠা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটি একটি দ্বিতল ভবন। এর সাথে একটি উন্মুক্ত আঙ্গিনা রয়েছে। বোর্ডিং-এর কক্ষগুলির সামনে দীর্ঘ বারান্দা রয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বে সেখানে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল এই পত্রিকায়। দেশভাগের সময় পত্রিকা অফিসটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়।
১৯৪৯ সালে দুই ভাই প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা এই বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে বিউটির নামেই এর নামকরণ করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বিউটি বোর্ডিংয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, মাড়োয়ারি ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের বাঙালি। এঁদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা শামস্ ইরানী, জোসেফ কেরায়া, প্রকাশক হেমন্ত সাহা, চিত্রশিল্পী হারাধন বর্মণ, শিক্ষক প্রভাত সাহা, খেলোয়াড় অহীন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ।
পরবর্তীতে প্রহ্লাদ চন্দ্রের পরিবার ভারত গমন করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্রের স্ত্রী শ্রীমতী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে বিউটি বোর্ডিং আবার চালু করেন। বিউটি বোর্ডিংয়ের মুখর আড্ডা আগের মতো না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো খদ্দেরের ভিড় লেগেই থাকে। নগরের ভোজনরসিকরা এখানে ছুটে আসেন। আর নিয়মিত খান পুরোনো ঢাকার বইয়ের মার্কেটের নানা শ্রেণির মানুষ।
২২ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক আমির হোসেন স্যার নিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম বাংলা সাহিত্যের অনেক প্রথিতযশা লেখকের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী বিউটিং-এ।-----মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ



0 মন্তব্যসমূহ