এ কথা সত্য যে, যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা সভ্যতা এবং সংস্কৃতি একদিকে যুদ্ধের কারণে ধ্বংস হয়েছে, অন্যদিকে গড়ে উঠেছে নতুন দেশ, নতুন জাতি, নতুন সভ্যতা এবং সংস্কৃতি। প্রতিটি যুদ্ধে বা সংগ্রামেই একটি পক্ষ যেমন ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করেছে, অন্য পক্ষ লড়াই করছে অন্যায়ের পক্ষে। কিন্তু শুনতে তিক্ত হলেও একথাও বাস্তব যে, এমন অনেক লড়াই-সংগ্রাম রয়েছে, যেখানে দুই দলই নিজেদের ন্যায্যতার পক্ষে লড়াই করেছে এবং লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে যুদ্ধের দামামা শুনে, চারিদিকে এই মৃত্যু, এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আপনি-আমি মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে উঠি। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর চোখে মুখে অন্ধকার দেখি। ভাবি এখানেই শেষ! সামনে বুঝি আর এগোনো যাবে না। কিন্তু না, মানব জীবন, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প, ধর্ম কিংবা রাজনীতি- নানা লড়াই, যুদ্ধ, অন্যায়-অত্যাচারকে মোকাবিলা করে কিংবা পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়েছে, এগিয়ে যাচ্ছে। সভ্যতা বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা, শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ অথবা মত প্রকাশ বা ধর্ম-চারণের স্বাধীনতা শত শত সমস্যার মধ্যেও বিকশিত হয়েছে। আর এসবের দ্বারা একদল মানুষ যেমন নিজে হয়েছে আলোকিত, তেমনি আলোকিত করেছে অন্য মানুষ, সমাজ এবং দেশকে।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন প্রচুর বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি হয়ত আপনাকে মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে, কিন্তু ঘরে বসে নামাজ আদায় করা থেকে বিরত রাখতে পারে না। বৃষ্টির কারণে সকালে পূজার ফুল আনতে পারেননি বলে ঘরে বসে ভগবানের নাম জপ করতে বাধা নেই। রোদ বা বৃষ্টি কৃষকের ফসল ফলানোয় বাধা হতে পারে নাই কখনো। বই ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না, কিংবা লেখার জন্য ছিল না কালি-কলম; তাই বলে জ্ঞানচর্চায় বাধাগ্রস্ত হয়নি কারোই।
যে ব্যক্তি গান শোনেন- তার জন্য শরৎ-হেমন্ত-বসন্ত কিংবা বর্ষা লাগে না। তাইতো ডুবতে যাওয়ার টাইটানিকের ছাদে দাঁড়িয়ে ভায়োলিন বাজাতে দেখি অচেনা কোনো শিল্পীকে। প্রিয় শহর রোমকে পুড়তে দেখেও বাঁশি বাজাচ্ছিল বংশীবাদক নিরো। গান শুনতে শুনতে পাক-হানাদার আর রাজাকার বধের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ।
রাষ্ট্র, সমাজ বা ধর্ম কিংবা কুসংস্কার বারবার বাধা দিয়েছে বিজ্ঞান চর্চাকে। আর এসব বাঁধাকে উপেক্ষা করে বিজ্ঞানীদের বানানো রকেট এগিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে লাখো লাখো মাইল দূরের গ্রহের দিকে। ইরান-ইসরাইল চলমান যুদ্ধের মধ্যেও ইলেন মাক্স তার মহাশূন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি উত্থাপনের সময় তার মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের একটি রকেট-যান বিস্ফোরিত হয়েছে। কিন্তু জেনে রাখুন, ভবিষ্যতেও সে থেমে থাকবে না।
বিদ্যুৎ আসলে আপনি পড়তে বসবেন- এমনটা যদি ভেবে থাকেন, তাহলে আপনার কখনো বই পড়া হবে না। দেশের পরিস্থিতি ভালো হলে শিল্প, সাহিত্য চর্চা করবেন- আপনি যদি এমনটা ভেবে থাকেন, তাহলে আপনার কখনো শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা করা হবে না। সরকার বাজেট দিলেই আপনি বিজ্ঞানের গবেষণা করতে পারবেন, আর না দিলে পারবেন না- এমন ভাবনা থাকলে আপনি কখনো বিজ্ঞানী হতে পারবেন না। শরীরটা একটু ভালো হলেই কাজে আরো গভীর মনোযোগ দেবেন- এমন ভাবনা আপনার মনে থাকলে, আপনার শরীর কখনোই ভালো হবে না। আপনার কাজও কখনো করা হবে না।
পরিস্থিতি একটু ভালো হলেই আপনি রাজনীতি করে দেশের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করবেন- এমন যদি ভেবে থাকেন, তাহলেও আপনার কখনো রাজনীতি করা হবে না। দেশের জন্য কিছু করতে চাইলে এখনই করতে হবে। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য কিছু করতে চাইলে এখনই করতে হবে। না চাইলে আর কখনোই নয়। জেনে রাখুন- অকর্মণ্য আর ব্যর্থদের অজুহাতের শেষ থাকে না।
এই পৃথিবী বিরাট যুদ্ধ মঞ্চ এবং আপনি আমি সবাই এক একজন যোদ্ধা। শেক্সপিয়র বলেছেন- ‘এই পৃথিবী বিশাল এক রঙ্গমঞ্চ, আমরা সবাই তার অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রী’ - বিষয়টি সেই রকমই। বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য কিংবা এগিয়ে যাওয়ার জন্য নানা রকম প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে আমাদের চলতে হয়। সংকটের মধ্যেই খুঁজতে হয় সম্ভাবনার দ্বার। সমস্যাকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের পথ চলতে হয়। কাজেই দুঃখ নেই, হতাশে নেই, দুশ্চিন্তা নেই, নেই থেমে যাওয়ার ভয়। সংকটে নতুন চিন্তা, চলার জন্য নতুন পথ আবিষ্কার করাই অদম্য মানুষের কাজ। মানবসভ্যতা এভাবেই এগিয়ে গেছে, এগিয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে ‘যে বাড়ির পাশ দিয়ে লাশের মিছিল যায়, সেই বাড়ির ভিতরেই জন্মের আনন্দে কেঁদে ওঠে নবজাতক শিশু।
----
হতাশা, আত্মজিজ্ঞাসা কিংবা প্রত্যয়
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২০ জুন ২৫
বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই লেখাটি ভালো লাগলে আপনার বাড়িতে থাকা একটি পুরোনো বই অথবা ম্যাগাজিন আমাকে উপহার দিতে পারেন।




0 মন্তব্যসমূহ