Ticker

6/recent/ticker-posts

লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. মাহবুব পিয়াল


লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. মাহবুব পিয়ালের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী

প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখের, কষ্টের, স্বজন হারানোর বেদনার। প্রতিটি মৃত্যুই শূন্যতার। তবে, কিছু মৃত্যু শুধু দুঃখ, কষ্ট বা শূন্যতার নয়; ব্যক্তির পরিবার তো বটেই জাতীয় অঙ্গনেও অপূরণীয় এক ক্ষতি। ড. মাহবুব পিয়ালের মৃত্যুটা ঠিক তেমনই।

ড. মাহবুব পিয়াল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান। তিতাসের মাটি-হাওয়ায় যার বেড়ে ওঠা। যার কীর্তির খ্যাতি ছড়িয়েছিল দেশ থেকে দেশান্তরে। মাহবুব পিয়াল ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। তিনি একাধারে একজন কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, গীতিকার, শিল্পী, লোকসংস্কৃতি, লোকগান সংগ্রাহক।তিনি ছিলেন স্বনামধন্য শিক্ষক, একজন ভালো বক্তা, বিভিন্ন দেশীয় বাদ্যযন্ত্র বাদক এবং দক্ষ সংগঠক। 

মহান সৃষ্টিকর্তা থেকে এত সব কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তিনি বরাদ্দকৃত সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৫০ বছর। সময়টি যথেষ্ট নয়, কিন্তু তিনি তা সফলভাবেই কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ভালো মানুষ। আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব, ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, ছোট-বড় এরকম সব মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল হৃদ্যতা পূর্ণ সম্পর্ক।


লোকসংস্কৃতির সংগ্রহ এবং সেসব নিয়ে গবেষণা করা, হারিয়ে যাওয়া লোক গান সংগ্রহ করে সেগুলো সুরারোপ করা এবং অরজিনাল গায়েকী ঢঙে দর্শক-শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করা ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও পারঙ্গমতা ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের হারিয়ে যাওয়া হাইয়র গান (সারিগান) সংগ্রহ তার ঐতিহাসিক কাজগুলোর একটি। সারিগান ছাড়াও তিনি অসংখ্য লোকগীতি  সংগ্রহ করেছিলেন।

শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে সেসব এলাকার মাটি ও হাওয়ার সাথে মিশে থাকা মানুষদের কাছ থেকে তুলে এনেছিলেন বাংলার লোকগানের অজানা কথা ও সুর সম্ভার। এবং তা মিডিয়ার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছিলেন দেশবাসীর কাছে।

কিন্তু তিনি তাঁর সব কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। অসম্পূর্ণ রেখেই হঠাৎ করেই মৃত্যুর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। এরকম একটা অসমাপ্ত কাজ ছিল তার লেখা কবিতার বই প্রকাশ করা। বইটি অবশ্য বের হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর ২০২০ সালে তাঁর ভাইবোনেরা “স্মৃতির ভ্রমণ” শিরোনামে বইটি প্রকাশ করেন। 

সেই বইয়ের ফ্ল্যাপে তাঁরা লিখেছেন- “ছোটবেলা থেকেই পিয়াল ছিলো অন্যরকম, সবার থেকে আলাদা। অসম্ভব সাহিত্যপ্রেমী, সংগীতপ্রেমী, বিশেষ করে রবীন্দ্র সংগীত। পরবর্তীতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরেছে, হাওরে বাওড়ে ঘুরে বেরিয়েছে লোকগান সংগ্রহে। লোকগান সংগ্রহই নয়, গানকে আত্মায় ধারণ করেছে, সবাইকে গেয়ে শুনিয়েছে।

 এই ঘুরে ঘুরে গান সংগ্রহের সাথে সাথে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রা, তাদের আনন্দ উৎসব, তাদের বিনোদনের উপাদানগুলো পিয়ালের কবিতায় ফুঁটে উঠেছে। পিয়ালের বইটাতে যে কবিতাগুলো স্থান পেয়েছে ও বেঁচে থাকলে হয়তো আজ নিজেই বই প্রকাশ করতো। 

এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো ২০১৮ থেকে উনিশের এপ্রিল সময়ে লেখা। তার ইচ্ছা ছিলো একুশের বই মেলাতে প্রকাশের। এখন আমরা পিয়ালের ভাইবোনেরা যারা এখনো পিয়ালের প্রস্থান মেনে নিতে পারিনি, অপ্রকাশিত কবিতাগুলো সংগ্রহ করে বইটি এবারের বই মেলায় প্রকাশ করার প্রয়াস করেছি। স্মৃতির ভ্রমণ হয়ে ওঠুক এক অনাবিল সুন্দর ভ্রমণ, পিয়ালের স্মৃতির ঝাঁপির।”

বইয়ের দ্বিতীয় ফ্লাপে তাঁরা আরো লেখেন,  “১৯৬৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্ম মাহবুব পিয়ালের। স্কুলে থাকতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য একাডেমি ও বাংলাদেশ মুক্ত নাটক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। নাটকে কাজ করতে করতেই লোকগানের প্রতি টান তৈরি হয়। সেই থেকেই লোকগান সংগ্রহ শুরু করেন। 

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে সারিগানের সংগ্রহ বাড়াতে থাকেন। এরপর চাকরি করতে গিয়ে ছিলেন ময়মনসিংহে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকার গান নিয়েও তখন অনেক কাজ করেছেন। কবিতা লেখার শুরুও সেই শৈশবে। স্থানীয়, জাতীয় ও দেশের বাইরের বিভিন্ন সাময়িকীতে ও দৈনিকে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থিকাও বই-কবিতা, নদীশ্রুতি, হাওরের হাওয়া, জলযাত্রা।”

ড. মাহবুব পিয়ালের মৃত্যুর পর দৈনিক দেশ রূপান্তরের একটি সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদে লিখা হয়- মাহবুব পিয়াল লোকগান সংগ্রহ করছেন ৩০ বছর ধরে। দেশের নানা এলাকা ঘুরেছেন গান সংগ্রহের জন্য। গড়ে তুলেছেন একটি অনলাইন আর্কাইভ। দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় তিন হাজার গান সংরক্ষিত আছে সেখানে। এ ছাড়া আর্কাইভে যুক্ত করা হয়েছে গায়কের সাক্ষাৎকার ও জীবনী। আর প্রতিটি গানের বিস্তারিত ইতিহাসও জানার সুযোগ আছে।

মাহবুব পিয়াল নিজেও গান করতেন। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম অ্যালবাম। নাম ‘কোন রঙে ডাকো রে’। এরপর ২০০৯ সালে ‘মেঘরাজা’। ২০১০ সালে সারিগান নিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘গাঙ্গে নয়া পানি’। তার শেষ অ্যালবামটির নাম ‘মন মন উড়াপাখি’। এটি মারেফতি গানের অ্যালবাম। এ ছাড়া তিনি লোকগান নিয়ে বইও লিখেছেন।"

                   

ড. মাহবুব পিয়ালের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সংস্কৃতির শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। তাঁর পিতা সামসুদ্দিন আহমেদও ছিলেন একজন জনপ্রিয় ও গুণী মানুষ। জনাব সামসুদ্দিন আহমেদ ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলের দ্বিতীয় সুপারিনটেনডেন্ট। ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার  ঐতিহ্যবাহী ‘পপুলার প্রেসের মালিক। যে প্রেস থেকে এক সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাসহ, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন পত্রিকা-ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হতো। 

জনাব সামসুদ্দিন আহমেদ নিজেও একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য লালন, পালন ও সংরক্ষণ করতেন। তিনি নিজেও লেখালেখি করতেন, পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এছাড়াও তার পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল মাঠে জেলার নানা ধরনের সাহিত্য-সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। যা স্থানটিকে সাহিত্য সংস্কৃতির পাদপীঠ বা তীর্থস্থান হিসেবে সারাদেশের কাছে পরিচিতি করে তুলেছেন। এবং এখনো জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান এই স্থানেই আয়োজন করা হয়ে থাকে।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ফিল্ডে লেখক-গীতিকার ও সংগঠক, অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।  যা প্রতিষ্ঠার তিনদিন পর পাকিস্তান বাহিনীর বিমান হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। ঐতিহাসিক সেই বেতার কেন্দ্রটি স্থাপন করতে নির্দেশনা ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছিলেন জনাব সামসুদ্দিন আহমেদ।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তান বাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুড়ে যে তান্ডব চালিয়েছিল সে সবের ছবি তোলা ও সংরক্ষণ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক ডকুমেন্টের অন্যতম সংগ্রাহক।

সামসুদ্দিন আহমেদের নয় ছেলেমেয়ে। পাঁচ ভাই চার বোনের মধ্যে মাহবুব পিয়াল ছিলেন তৃতীয় সন্তান। সংস্কৃতিমনা পিতার তত্ত্বাবধানে তাঁর সকল ভাই-বোনেরাই বেড়ে উঠেছেন সাংস্কৃতিক আবহে। গুণী পিতার আপত্য স্নেহ, পৃষ্ঠপোষকতায় মাহবুব পিয়ালের সকল ভাইবোনই উদার ও সংস্কৃতি মনা মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠেছেন। ফলে আমরা দেখি ড. মাহবুব পিয়ালের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই লেখালেখি ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার সঙ্গে জড়িত। (ড. পিয়ালের সাইফুল ইসলাম চপল নামে আরেক ভাই ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন)


ড. মাহবুব পিয়াল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃ-বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ইংল্যান্ডের ডারহাম ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জন করেন পিএইচডি ডিগ্রি। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশের ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের লিবারেল আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস বিভাগের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এখানে কর্মরত থাকা কালে ২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল, বুধবার ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে যোগ দিতে গিয়ে বার্মিংহামের হোটেল কক্ষে স্থানীয় সময় রাত ৮টায় মাত্র ৫০ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

ড. মাহবুব  পিয়ালের এই আকস্মিক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে শোকাহত হন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর ভক্ত অনুরাগীগণ। তিনি জীবিত থাকলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির অতীত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও বিকাশ আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারতেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যুর মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাটি বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি সংগ্রহ ও চর্চায় একটি শূন্যস্থান তৈরি হয়। ড. মাহবুব পিয়াল যে কাজগুলো করেছেন- তাঁর লেখা বই, পাণ্ডুলিপি, সংগ্রহ করা গান, গানের ক্যাসেট, এগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। 
ড. মাহবুব পিয়াল  ও তাঁর কাজগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের সদস্যগণ “জবসবসনবৎরহম গধযনঁন চরধষ” নামে একটি ফেসবুক ফেসবুক পেজ পরিচালনা করেন। সেখানে মাহবুব পিয়ালের বিভিন্ন লেখা, ছবি ও ভিডিও পোস্ট করা হয়। তাছাড়া ইউটিউবেও তাঁর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভিডিও পাওয়া যায়।কিন্তু পরিবারের এই চেষ্টায়ই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ড. মাহবুব পিয়ালের স্মরণে একটি গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন মাহবুব পিয়াল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, অন্যদিকে দেশের লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি, লোকগান, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা ও গবেষণার জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরি হবে।

ড. মাহবুব পিয়ালের এই কাজগুলো যথাযথ সংরক্ষিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশের অতীত ঐতিহ্য, সম্পর্ক যেমন জ্ঞাত হবে, তেমনি ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য সহায়ক হবে। ফলে এই প্লাটফর্ম সবার আস্থা অর্জন করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।


------
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২৪ এপ্রিল ২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
তথ্যসূত্র : 
গ্রন্থ : স্মৃতির ভ্রমণ-মাহবুব পিয়াল, প্রকাশ ২০২০।
গ্রন্থ : অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ স্মারক গ্রন্থ।
সংবাদ : দৈনিক দেশ রূপান্তর : প্রকাশ ২৪ এপ্রিল ২০১৯

কথোপকথন : চমন সিকান্দার জুলকারনাইন (ড. মাহবুব পিয়াল-এর বড় ভাই ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলের বর্তমান সুপারিনটেনডেন্ট)

(বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই লেখায় তথ্যগত বা ব্যাকারণগত কোনো ভুল থাকলে তা মন্তব্যের ঘরে অথবা ইনবক্সে জানানোর জন্য অনুরোধ রইল। ড্রাফটিং লেখা, তাই কপি না করে শেয়ার করার অনুরোধ রইলো।)

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ