Ticker

6/recent/ticker-posts

কবি, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক খুরশেদুল ইসলাম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম : কবি, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক খুরশেদুল ইসলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতি যাদের কাছে ঋণী, খুরশেদুল ইসলাম স্যার তাঁদের একজন। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কবি-গবেষক জয়দুল হোসেন স্যারের কাছে বহুবার উনার নাম শুনেছি। গত বছর সাহিত্য একাডেমিতে প্রথম ওনার একটি বই ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হলো। সেদিনই প্রথম তাঁর কবিতা পাঠ করার সুযোগ হলো এবং দেখা হলো ছবিও। তারপর গত এক বছরে খুরশেদুল ইসলাম স্যার সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করেছি। সেসবের সমন্বয়ে আজকের এই ক্ষুদ্র লেখার অবতারণা। এই লেখাটি আজকের তারিখে ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য বেছে নেওয়ার কারণ হলো আজ কবি খুরশেদুল ইসলাম স্যারের ১৯তম মৃত্যু বার্ষিকী। 


(বিশেষ দ্রষ্টব্য : নিম্নোক্ত লেখাটি একটি অসম্পূর্ণ ও অসম্পাদিত লেখা। প্রয়োজনীয় তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা পেলে আগামীতে এই লেখাটি আরো বেশি সমৃদ্ধ করার চেষ্টা থাকবে।)



খ্যাতিমান কবি, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক, অধ্যাপক খুরশেদুল ইসলাম-এর জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৫ জুলাই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী সরাইল উপজেলার ছায়া-সুনিবির গ্রাম পরমানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। তাঁর নাম পিতা মুন্সি শেখ এনায়েত উল্যাহ। তিনি ছিলেন খ্যাতনামা আধ্যাত্মিক তাপস। বহু অনুরাগী ও ভক্ত ছিল মুন্সি শেখ এনায়েত উল্যাহর। সরাইল উপজেলার ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, রাজনৈতিক গুরুত্ব, নিজ গ্রাম পরমানন্দপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পিতার আধ্যাত্মিক-ধর্মীয় নিষ্ঠার গুণাবলি ছোটোবেলা থেকেই তাঁর হৃদয়ে ছায়া ফেলেছিল।


মাতা-পিতার কনিষ্ঠ সন্তান খুরশেদুল ইসলাম শৈশবেই পিতৃহারা হন। ফলে শিশুকাল থেকেই বহু কষ্ট, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর কৈশোর ও শিক্ষা জীবন কাটাতে হয়। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে অবশেষে তিনি দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাসনদ অর্জন করেন। শিক্ষা জীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ও ইংরেজিতে এম. এ এবং সাংবাদিকতায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। 


অধ্যাপক খুরশেদুল ইসলামের পেশাগত জীবন শুরু হয় সাব-ইন্সপেক্টর অব স্কুলস হিসেবে। ১৯৬১ সনের ১ মে এই চাকরিতে যোগ দিলেও পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। দেশের বিভিন্ন কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক ও সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ১৯৯৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন।



অধ্যাপক খুরশেদুল ইসলামের স্মৃতিচারণ করে জয়দুল হোসেন আরো বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর এখানকার সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এসময় জেলার সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ, বক্তব্য প্রদান ছাড়াও নানা সংগঠনের সাংগঠনিক কাজেও তিনি যুক্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে সাহিত্য একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলে সাহিত্য একাডেমি প্রতিষ্ঠায় যারা ভূমিকা রাখেন, কবি করেন খুরশেদুল ইসলাম স্যার তাদের অন্যতম।


১৯৮৫ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বদলি হয়ে চাঁদপুর সরকারি কলেজে যোগদান করেন এবং সেখানে গিয়েও নিজের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত রাখেন। চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমি প্রতিষ্ঠাতেও অবদান রাখেন তিনি। চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকেই তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।


অধ্যাপক খুরশেদুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পাইকপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। নিজ বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘কবি বাস’। শেষ জীবনে তিনি বেশ অসুস্থ অবস্থায় জীবনযাপন করেছেন। অসুস্থতার জন্য চলনশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তিহীন হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সে সময়েও থেমে থাকেনি তাঁর সাহিত্য চর্চা। অন্ধ অবস্থাতেও অন্যের সাহায্য নিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন দুটি কাব্যগ্রন্থ এবং সেগুলো প্রকাশিতও হয়েছিল।


বাংলা ও ইংরেজিতে তাঁর রচিত অসংখ্য কবিতা ও প্রবন্ধ জাতীয় দৈনিক সমূহে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৮টি। তারমধ্যে একটি গবেষণা, ইংরেজিতে রচিত একটি সমালোচনা গ্রন্থ রয়েছে। বাকী দুটি সনেট সংকলন ও চারটি কবিতা সংকলন। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ কবি খুরশেদুল ইসলাম ১৯৬৭ সালে অল পাকিস্তান এমিটি অ্যাসোসিয়েশনের সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৭৯ সালে রূপসি বাংলা ফজল মাহমুদ পুরস্কার লাভ করেন। 


কবি খুরশেদুল ইসলামের প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকা যেটুকু পাওয়া গেছে তা হলো।

১. উত্তর সাধক

২. উঠোনে দুঃখের জল (সনেট) 

৩. আমার প্রিয়ার চন্দন তিলক

৪. তোমার চরণ ছুঁয়ে অন্ধকার জ্বলে (কাব্যগ্রন্থ-১৯৮৭) 

৫. সেতারা হেলাল নামে তোমাকে ডেকেছি (কাব্যগ্রন্থ) 

৬. সায়াহ্নের সুর স্মৃতির সুরুভী (২০০৫)



কবি জয়দুল হোসেন আরো বলেন, কবি খুরশিদুল ইসলামের লেখালেখি শুরু হয় কুমিল্লাতেই। এখানেই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তর সাধক’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে একে একে তার আরও বেশকিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন কবি খুরশিদুল ইসলাম। রোগাক্রান্ত হওয়ায় এক পর্যায়ে তিনি অন্ধ হয়ে যান। অন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন তিনি। দৃষ্টিশক্তি হারানোর কয়েক বছর পরে তার স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রীর শোকে কাতর কবি সে সময়ও ভেঙে পড়েননি। অন্যের সহযোগিতা নিয়ে শ্রুতলিপি মাধ্যমে রচনা করেন একটি কাব্যগ্রন্থ। প্রিয়তমা স্ত্রীকে উৎসর্গিত করে বইটির নাম ‘সেতারা হেলাল নামে তোমাকে ডেকেছি’। পরবর্তীতে অন্ধ অবস্থাতে তাঁর আরো একটি বই প্রকাশিত হয়। ‘সায়াহ্নের সুর স্মৃতির সুরুভী নামক এই গ্রন্তটি তাঁর প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থ। 


২০০৫ সালে শতদল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থের ‘প্রসঙ্গ কথায়’ কবি খুরশেদুল ইসলাম লেখেন, “এই গ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুলো ২০০৩ ও ২০০৪ সালে মাঝে মধ্যে রচিত হয়েছে শ্রুতলিপিকারের সাহায্যে। ' সেতারা হেলাল নামে তোমাকে ডেকেছি' এর কবিতাগুলো লেখার বছর ছ'য়েক আগে থেকেই আমার দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আর এই কবিতাগুলো লেখার সময় চলৎশক্তিও নিঃশেষ হয়ে গেছে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আমি সারাক্ষণ শয্যাশায়ী। কবিতাগুলোর শ্রুতলিপি গ্রহণ করেছেন আমার জ্যেষ্ঠ ছেলে সামিয়ান খুরশেদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাখাওয়াত হোসেন এবং বৃহদাংশে আমার ভায়রা ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদ। গ্রন্থটি প্রকাশে আমার প্রাক্তন ছাত্র কবি জয়দুল হোসেন সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করছেন এবং অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আমি তাঁদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি”।


তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী, অসম্ভব মেধাবী একজন লেখক ছিলেন তিনি। ছিলেন সফল শিক্ষক ও দক্ষ প্রশাসক-সংগঠক। পোশাক-আশাক, আচার ব্যবহারে ছিলেন পরিপাটি, পরিশীলিত একজন মানুষ।


সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার শিক্ষক-লেখক কবি, অধ্যাপক খুরশেদুল ইসলাম দীর্ঘদিন রোগ শয্যায় থেকে ২০০৭ সালের ২৯ মে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে একজন মহৎ আত্মার ইহজাগতিক পরিসমাপ্তি ঘটে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শেরপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।


আমি তাঁর মহান আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।


মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

২৯ মে ২৬


তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা 

১. গ্রন্থ: সায়াহ্নের সুর স্মৃতির সুরুভী

২. কথোপকথন : জয়দুল হোসেন, কবি ও গবেষক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

৩. মরহুম কবির বড় ছেলে হাসনাইন খুরশিদ-এর ফেসবুক পোস্ট।


ছবি কৃতজ্ঞতা 

১. সায়াহ্নের সুর স্মৃতির সুরুভী গ্রন্থের লেখক পরিচিতি।

২. মরহুম কবির বড় ছেলে হাসনাইন খুরশিদ-এর ফেসবুক পোস্ট।

৩. পনিরুল আলম ( সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া), (জন্মদিন পালনের ছবি)।


লেখার শেষে কবি খুরশেদুল ইসলাম রচিত দুটি কবিতা পাঠকদের উদ্দেশ্যে সংযুক্ত করা হলো। 


তোমার চরণ ছুঁয়ে অন্ধকার জ্বলে

খুরশেদুল ইসলাম


কোথাও যাই না আমি। 

যদিও যাবার কথা ছিলো কোলাহলে

যেখানে নিঝুম রাত ঘুমপাড়ানিয়া গানে 

রজনীগন্ধার মতো মৃদু মৃদু দোলে। 

কিন্তু সেই যে ডাকলে তুমি, হলাহলে 

কি স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলে তৃষ্ণার মাধুরী। 

তাই অলকনন্দার মতো তোমাকে জড়াই 

চর্যাপদের রাখীবন্ধনে। 

তুমি এলে আমার আকাশ থেকে মেঘগুলো মুছে যায়, 

সমস্ত শরীর জুড়ে আলোর সুরভি ছোটে; 

প্রত্যুষের সূর্যোদয় ডানা মেলে নিকোনো উঠোনে। 

বস্তুত: তুমি এলে মল বাজে দিগম্বরীর।

একদিন অন্ধকার আদিগন্ত ছেয়ে দিলো: 

রুদ্র মহীতল,-পারেরঘাটায় জাগি অনালম্ব

'পার করো' বলে কাকে ডাকি। 

সহসা আকাশ ভেঙ্গে উদ্ভাসিত হলে। 

এক আলোর প্রতিমা, বিদ্যু-বিভায় দেখি তুমি এলে হিরন্ময়ী।

দিগন্তের সীমা তোমার দৃষ্টির রাগে লুপ্ত হলো। 

সেই থেকে সূর্য-জ্বালা সাকী- প্রিয়া তুমি। 

তোমার চরণ ছুঁয়ে অন্ধকার জ্বলে অবিরল।



-------------

পরমানন্দপুরে পাখির সুরভী

খুরশেদুল ইসলাম


সম্প্রতি পরমানন্দপুরে আমার শরীর ভরিয়ে দেয় পাখির সুরভী

ক্রমান্বয়ে দীপায়ন তৃণমূল ছুঁয়ে গেছে ডগায় ডগায়

কনক ছোপানো শিশিরের ভোর

স্বরে অ-স্বরে আ’র ছড়া কাটি অরুণ রবির রাগে

রাঙিয়ে দিয়েছে পাখিদের ঠোঁট, ডানার পালক

বিন্দুর ভিতরে দেখি সিন্ধুর বিস্তার, বিন্দুতে বসত যত বিন্দুবাসিনী

সুললিত কণ্ঠে পড়ে শিশুতোষ কবিতার পদ

ডাগর ডাগর চোখে জাগাতে শিখেছে হৃদয়ে অনুভব।

রাখাল বালক আর শস্যের কিশোর ভীরু ভীরু পায়ে চলে যায় গুরুগৃহে

পাখির আনন্দ নিয়ে চোখ তুলে আকাশের দিকে

সম্ভাবনা ছড়ায় পথের উপরে আগামীর রক্তাভ গোলাব।

অন্নময়ী এঘরে ওঘরে দেয় অন্নের সওগাত, পাখির সুরভী ছোটে উঠোনে অন্দরে

ঘরময় নীরবতা সহসা চকিত করে চড়ুইয়ের উড়াউড়ি

অলিন্দে আসীন রূপসীর হাত থেকে দানা খুঁটে কপোতের ঠোঁট

অঙ্গনে ভেরেণ্ডা গাছে টুনটুনি নাচে, সিটকি গাছের ঝোপে ডাকে তেলকুপি

বেতসের আড়া থেকে দোয়েলের শিস স্পর্শ করে অন্তরে অন্তহীন লোক

শ্যামার সুমিষ্ট সুর ছিটায় প্রাণের ভিতর চাঁদের জ্যোৎস্না

আমের মুকুল ছুঁয়ে ঝরে পড়ে কোকিলের কুহু

বউ-কথা-কও পাখির আহবান রূপবতী যুবতীর মনে তোলে ঢেউ

কচুরিপানার দামে নিশিভর ডাহুকের কণ্ঠস্বর

ডিমের ভিতর থেকে অক্লান্ত ফুটিয়ে তোলে নতুন জীবন

বড়ইচারার চর ছেড়ে উড়ে আসে খঞ্জনার ঝাঁক

বরুণ তলায় পড়ে চন্দনার লালচে হলুদ পা

তালাবের কালো জলে তন্দ্রালস রাজহংস ভাসে

সাগরদীঘির জল ছুঁয়ে উড়ে যায় বালিহাঁস

যাদুর বিলের জলের কিনারে হাঁটে সাদা বক

নলখাগড়া বনের ভেতর থেকে নিঃশব্দে বেড়িয়ে আসে রাঙাঠোঁট ধবল সারস

শঙ্খচিল নেমে আসে তবিলার বিলে

দক্ষিণ বন্দের জালের খুঁটিতে বসে মাছরাঙা পাখি

অকস্মাৎ ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নেয় জলের সন্তান দারকিনি মলা ঢেলা পুঁটি

ফ্যাচ্চা দোলায় পুচ্ছ আধাডোবা নৌকার গলুইয়ে

ক্যাচকাওয়া উড়ে খায় এখানে ওখানে

নগরকান্দার বাঈদে বাদামী চিলের ডানা পতাকার মতো দোলে

কোড়ালের সুতীক্ষ্ণ চিৎকার হঠাৎ বিদীর্ণ করে নিথর আকাশ

গোরস্থানে নতুন বেষ্টনীর দেয়ালে বসে বুলবুলি

ছেলেদের ভেঙ্গে গেছে ঘুম পাড়ায় পাড়ায় নব-জাগরণ

বর্গীরা পালিয়ে গেছে, বুলবুলিতে আর খায়না ক্ষেতের ধান।

এখন কণ্ঠে তার সন্দিপনী গান, কবর গাহের মৃত্তিকা প্লাবিত করে

নিরন্তর জাগিয়ে তোলে নতুন জীবন

প্রত্যুষের নিমীলিত পদ্মরাগের মতো নতুন জীবন

ঝিলপাড়ে আন্দোলিত কাশফুলের শুভ্রতার মতো নতুন জীবন

ভোরের নদীর মোহনা ছাপিয়ে উজান পানির মতো নতুন জীবন

শীতের কুয়াশা ভেদী পানকৌড়ির ডানার শব্দের মত নতুন জীবন

স্পন্দিত আমি নন্দিত আমি আত্মার অনন্ত আলোতে সে জীবন।

প্রত্যক্ষ করি- সায়াহ্নের তমাল শিখর থেকে তারপর আঙুল বুলাই

আবার যৌবন-সন্ধি ওষ্ঠাধারে ছোঁয়ায় বাঁশরী

আবার নতুন করে সপ্তস্বরা হৃদয়ে ছড়িয়ে দেয় ফাল্গুনের রঙ

আমি নন্দিতাকে ছুঁই, সঙ্গিতাকে ছুঁই, বন্দিতার চরণ ছুঁয়ে

আমার আঁধার জ্বলে নির্নিমেষ।

অনেক পুরোনো বসতি পরমানন্দপুর

প্রত্যন্ত পল্লীর বুকে একখানি নিভৃত গ্রাম

এই গ্রামে জন্ম নিয়েছিলাম গত শতকের তিরিশ দশকে

আমি একজন খুরশেদুল ইসলাম।

সুদূর অতীতে জোতদার পিতামহ সম্পন্ন ছিলেন

দুঃসময় সবকিছু কেড়ে নিলে বা’ছাব বিপন্ন হলেন-

আমার শৈশবে একদিন তিনি অকস্মাৎ পরপারে পাড়ি জমালেন

একগুচ্ছ জার্মানীর ‘পরে একখানি সবুজ পাখির শরাহত উত্তরাধিকার

                                                                  অতএব হাতে তুলে নিই-

গ্রাম ছাড়া হয়ে যাই গ্রামান্তর, বুক বাধি ঝঞ্ঝাহত পাখির ডানায়।

মাইনর স্কুলে পড়ি, হাইস্কুল পাস করি,

কলেজ ছাড়িয়ে যাই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

মাইকেল মধুতে মন ঢেলে দিই, নজরুল রবীন্দ্রনাথ প্রিয় হয়ে উঠেন,

বিষ্ণু দে, সুভাষ, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ,

সিরাজী, ফররুখ ছড়ায় রূপোলী পাখা নিলীমার বুকে।

শেক্সপিয়র, মিল্টন, টেনিসন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কলোরিজ

আমাকে তুমুল করে অধিকার।

বায়রনের বৃত্তান্তমালায় নিজেকে বিস্মিত দেখি

শেলীর প্রবুদ্ধ ডেমাগর্গন আমাকে উদ্বুদ্ধ করে,

কীসের নাইটিঙ্গেল আমাকে সবুজ বাগে নির্বিরোধ জানায় আহ্বান

দ্রোহের পতাকা বয়ে হয়ে যাই বনের নিবাসী।

বাগদত্তা দয়িতার শুভ পরিণয় আমাকে ক্লিষ্ট করে

খাতার পাতায় সঙ্গোপন সংক্ষোভে হৃদয় উজাড় করে

ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিই, অতঃপর জীবনের কাছে মানি পরাভব।

গ্রামীণ সম্ভ্রান্তি আছে এমন ঘরের এক তরুণীর সাথে

আমাকে দাম্পত্যে আবদ্ধ করেন একজন হাক্কানী আলেম।

পেশা সূত্রে এখানে ওখানে থাকি-

এ কলেজ থেকে ও কলেজে যাই, অধ্যাপনা করি, লেখালেখি করি,

উপাধ্যক্ষ অধ্যক্ষ পদের অনিবার্য ক্লিন্নতায় ফুটাতে চাই ক্রিসিন্থিমাস

পথের দু'পাশে সযত্নে গড়ে তুলি নন্দন কানন

কেবলই ফুলের মূল্যে বিলিয়ে দিই স্বপ্নময় আমার বৈভব।

হোটেল শেরাটনে, পূর্বাণীতে, ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে,

ধানমন্ডির কবিতা কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

কার্যালয়ে, কাকরাইলের স্কাউট ভবনে, দেশী-বিদেশী

কবিদের মাঝে নিজেকে পেয়েছি প্রত্যয় দৃপ্ত পাখির সৌরভে,

বঙ্গভবনে বারংবার পঙ্ক্তিমালার কোলাহলে

অশান্ত পাখির কণ্ঠে ছিটিয়ে দিয়েছি ফোঁটা ফোঁটা অস্তিত্বের রঙ

অস্তিত্ব অকুতোভয় শার্দুল প্রতিম অবিশঙ্ক উচ্চারণ

একাত্তরের রক্তস্নাত বিজয় নন্দিনী বঙ্গভূমি

সহসা তোলেন চোখ বার কোটি মানুষের বঙ্গভবনে

সমগ্র দরবার হল হিরন্ময় হয়ে যায়

সমবেত অভ্যাগত হয়ে যান ফুলের সমান,

ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় রাজপথ প্যাভমেন্ট জনপদ

বাড়িঘর মাঠ-ঘাট, বিল-ঝিল, জলাশয়, নদী।

বিশ্বাসের লালিত লবঙ্গ ফুল হাতে নিয়ে আমি চলে যাই সুদূর অতীতে।

কমলাঙ্কে কমল গন্ধ একদিন ভরে দিয়েছিল মন

চর্যাপদের রাখি বন্ধনে বেঁধেছিল আমাকে প্রথম

চাঁদপুরে চাঁদের জ্যোৎস্না পরিয়েছিল সুবর্ণ কিংখাব

রিমঝিম স্বরবৃত্তে আমাকে আকুল করেছিল চৌমুহনী

নড়িয়া জুড়ে নাড়ির স্পন্দন শুনেছিলাম সারাক্ষণ।

রাজধানীতে যখন এলাম ওষ্ঠাধর আর ছোঁয় না বাঁশরী

দিগন্ত এসেছে নেমে দৃষ্টির সীমায়।

অতঃপর চলে যাই ঘর তিতাস পারের রূপোলী শহরে

বড় ছেলে পূর্বাহ্ণেই গভীর অরণ্যে চলে গেছে

মেজোটি জীবন বিমুখ দিগন্তের ওপারে এখন

শোকাকুল সঙ্গিনী বন্দিনী হয়ে আছে নানা বেড়াজালে

অন্তহীন অন্ধকারে আমি জেগে থাকি

তথাপি জীবন সংগ্রামে অজেয় থাকতে চাই

নির্বিরোধ উঠে আসে মৃত্তিকার সমতলে

যুগান্তের পর ফিরে এলাম পরমানন্দপুরে-

এখানে আমার অনেক কিছুই আছে:

হারিয়ে যাওয়া নদীর রেখার মত দিকচিহ্ন আছে, পদচিহ্ন আছে

উদার আকাশ আছে, অরুণিমা আছে

মেঘ মেদুর সজল হাওয়ার মত হাত আছে

রংধনু আছে বিচিত্র বর্ণের মত আনন্দ আছে

এখানে কবর-গাহে বা’ছাব ঘুমিয়ে আছেন

জননী ঘুমিয়ে আছেন,

পূর্ব পুরুষের অনেকেই চিরনিদ্রায় শায়িত এখানে।

এখানে কবর-ফুঁড়ে যে জীবন বেরিয়ে আসে

আমি তাকে ভালোবাসি, আমি সেই জীবনের অনুগামী

হৃদয় আপ্লুত করে অতীত স্মৃতির সোহেল পূরবী

পরমানন্দ পুর জুড়ে এখন কেবলই পাখির সুরভী।



কবি খুরশেদুল ইসলাম রচিত তিনটি বইয়ের প্রচ্ছদ







২০০৩ সালে কবি-অধ্যাপক খুরশেদুল ইসলাম স্যারের ৬৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানের এই দুর্লোভ ছবি প্রদান করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্যতম সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠক, শ্রদ্ধেয় পনিরুল আলম ভাই। তাঁর প্রতি জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ছবিতে থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনেক গুণিজন এখন প্রয়াত। মহান আল্লাহ তাদের পরপারে ভালো রাখুন, আমিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ