ফুটফুটে এই শিশুটির নাম আয়েশা। বাবা-মা আর আত্মীয়-স্বজনের মুখে হাসি ফোটানো এই ফুলটা ঝরে গেছে ঈদের দুই দিন আগে। পরিবারের সবার মাঝে আনন্দ বিলানোর জন্য তার জন্য সময় বরাদ্দ ছিলো মাত্র দুই বছর। হ্যাঁ, মাত্র দুই বছর। সৃষ্টিকর্তা হয়ত বরাদ্দ করেছিলেন অনেক বছর, তবে আমরা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছি খুব জলদি।
৫ জুন ২০২৫। কক্সবাজার থেকে একটি ট্রেন ছুটে আসছিল চট্টগ্রামের দিকে। পথে কালুরঘাট সেতু। যে সেতুটি বাংলাদেশের আর অন্য আর দশটি সেতু থেকে একেবারেই ব্যতিক্রম। যে লাইন দিয়ে ট্রেন চলে, একই লাইন দিয়ে চলে সাধারণ যাত্রী পারাপারের বিভিন্ন যানবাহন। যেমন : রিকশা, সিএনজি, অন্যান্য সাধারণ যানবাহনগুলো। ফলে এই ব্রিজের উপর দিয়ে যে ট্রেনগুলো চলাচল করে, সে ট্রেনগুলোকে ব্রিজে ওঠার আগে ধীরে উঠতে হয়, তার আগেই দায়িত্ব রত লাইনম্যানরা ব্রিজ খালি করে দেন। প্রয়োজনে ট্রেনকে থামানোর সিগন্যাল দিয়ে সাধারণ যানবাহনগুলোকে পারাপারের সুযোগ করে দেওয়া হয়। সেদিনও ব্রিজের উপর বেশ কিছু যানবাহন থাকায় লাইনম্যান ট্রেন চালককে থামার জন্য রেড সিগন্যাল দিয়েছিল, কিন্তু লোকোমাস্টার সিগন্যাল অমান্য করে ট্রেন উঠিয়ে দেয় ব্রিজে। ফলাফলে তিনজন নিহতসহ কয়েকজন আহত হয়। নিহতেদের মধ্যে ছোট্ট আয়শাও ছিল। মৃত শিশুটিকে কাঁধে নিয়ে তার বাবার ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনির গগন বিদারী চিৎকার কানে বাজছে। সেদিনের পর থেকেই আয়েশার নিথর শরীর দেখে নিজের কন্যা দুটোর কথা বারবার মনে পড়ছে। সেই জায়গায় আমি হলে আমি কি এভাবে সহ্য করতে পারতাম?
যে ঈদ এসেছিল আনন্দের বার্তা নিয়ে, সেই ঈদ আয়েশার বাবা মার কাছে সারা জীবন এখন একটা বেদনার নাম। ঈদের আগে এরকম বেদনা এসেছে আরো অনেকের ঘরে। দাদা বাড়িতে ঈদ করতে এসে পানিতে পড়ে মারা গেছে ছোট্ট এক শিশু। এছাড়াও দেশের জায়গায় রোড অ্যাক্সিডেন্ট ও মারামারির ঘটনাতো আছেই। গত বছর থেকে নিরীহ ফিলিস্তিনীদের উপর বর্বর ইসরাইলের হামলায় নিহত নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের লাশের ছবি দেখতে দেখতে, এবং নিজ দেশে সদ্য অনুষ্ঠিত কোটা বিরোধী জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা-পুলিশের বীভৎস লাশের ছবি দেখতে দেখতে এবং অভ্যুত্থান, পরবর্তীতে একের পর এক অরাজকতা, মব, ধ্বংসলীলা দেখতে দেখতে আমাদের মন এতটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে যে, এখন কারো মৃত্যুর খবর আমাদের আর ততটা ব্যথিত করে না। সম্ভবত মানুষের মৃত্যুর মিছিলকে আমরা রোজকার স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে ভাবতে শিখে গিয়েছি।
দুই.
প্রতিবার কোরবানির ঈদের পশুদের বেদনাদায়ক বিভিন্ন দৃশ্য আমাদের মনকে আহত করে। একটি ভিডিওতে দেখলাম, একজন মালিক তার ছাগলকে জড়িয়ে ধরে শেষ বিদায় দিচ্ছে। ছাগলটিও তার নিজ ভাষায় কান্নার স্বরে মালিককে কিছু বলতে চাইছে। ভিডিও দেখে বোঝা যায়- ছাগলটি বলতে চাইছে, ‘হে আমার মালিক, আমাকে তুমি বেঁচো না। কিছু টাকার জন্য আমাকে তুমি মৃত্যুর কাছে শপে দিও না।’
আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম মালিক তার গরুকে হাটে বিক্রি করার জন্য নিয়ে এসেছে। গরুর পিছনে পিছনে চলে এসেছে একটি কুকুর। ওই মালিকের বাড়িতে নাকি এই কুকুর আর গরু একসাথে বড় হয়েছে। তাদের দুজনের এতই ভাব যে, গরু যেদিকে যায়, কুকুরটিও সেই দিকেই যায়। মালিক বিক্রি করার জন্য গরুকে বাজারে নিয়ে আসলে কুকুরটির সাথে চলে এসেছে। গরুর হাটে কাদা পানির দেশে বসে আছে তারা। পশুতে পশুতে কী নির্মল, নির্মোহ বন্ধুত্ব তৈরি হলে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর পাশে এভাবে বসে থাকতে পারে? পরবর্তীতে কী হয়েছিল জানি না? এই কুকুর কি বিক্রয় হওয়া গরুর কাছে চলে গিয়েছিল? গিয়ে থাকলে সে কি তার নিজ বন্ধুকে মানুষের শরীর ছুড়ির নিচে পড়ে রক্তাক্ত হতে দেখেছিল? দেখে থাকলে সেই কুকুরের সেই অনুভূতিটা কি?
আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম একজন মধ্যে বয়স্ক মহিলা তার ছাগলটিকে বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন পশুর হাটে। মায়ের সাথে হাটে এসেছে ১০-১২ বছরের একজন কিশোর। ছেলেটি ছাগলটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে— আর কাঁদতে কাঁদদে বলছে, ‘আমি ওরে বেচুম না, মা... বাড়ি নিয়া চলো... আমার বন্ধু রে কেন ছাড়বা ?’
কোরবানির পশুর হাটে এরকম দৃশ্য প্রায় সময় মানুষের ক্যামেরাবন্দি হয়। অন্যের লাইক কমেন্টসের ধাক্কায় ভেসে ভেসে আমাদের চোখের সামনেও আসে। আমরা দেখি, একজন রাখালের এক হাতে টাকা, আরেক হাতে জড়িয়ে ধরে আছে প্রিয় গরু-ছাগলের শরীর। কেউ দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরে রাখে পশুর। পশুগুলোও কাঁদতে কাঁদতে শরীর জড়িয়ে তার মালিকের সাথে। পশুর মালিক চোখ মুছতে মুছতে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়!
মানুষ হিসেবে আমরা মানুষের অনুভূতি বুঝি। অবলা কুকুর-বিড়াল, গরু-ছাগল বা হাঁস-মুরগির জন্য- যাদের কোনোটি কখনো আপনি লালনপালন করেছেন সন্তানের মতো অপত্য স্নেহে। টাকার জন্য তাকে মৃত্যুর মুখে তুলে দেওয়া কি খুবই সহজ কাজ? যাকে খাওয়ালেন, গোসল করলেন, যার যত্ন নিলেন, রোগের ওষুধ কিনে দিলেন, সেবা-শুশ্রূষা করলেন। যাকে রোদে পুড়তে দিলেন না, বৃষ্টিতে ভিজতে দিলেন না, সেই পশু মানবসন্তানের চাইতে কম কীসে? আপনি ডাক দিলেই নির্ভয়ে যে ছুটে আসে আপনার কাছে, একটু আদর স্নেহ পেতে নিজের শরীরকে এলিয়ে দেয়, সেই পশুকে জবেহ করে ফেলা কি এতই সহজ?
ঈদের দিন সকালে দেখতাম, কোরবানির গরুরগুলোর চোখে পানি। আমরা ছোটরা বলাবলি করতাম, রাতে তারা স্বপ্ন দেখেছে, আজ তাদেরকে জবেহ করা হবে। এজন্য সকাল থেকেই তারা কাঁদতে থাকে। পশুর হাটেও অনেক গরুর চোখের পানি নজরে পড়ে। অবলা এসব প্রাণীর চোখের পানি আদের বিবেককে নাড়া দেয় না। অনেক বছর আগে আমি নিজেই গরু জবেহ করতাম, কিন্তু বর্তমানে গরু জবেহ করাতো দূরের কথা, আমি একটি মুরগি জবাই করতেও ভয় পাইভ জবাব করা দেখতেও ভয় পাই। শিশুদের তা দেখতে দেই না।
তিন.
প্রতি বছর কোরবানির ঈদে আমি বিষণ্ন হয়ে উঠি। ধর্মীয় উৎসবে, আবরণে মানুষ আর পশুদের দুঃখগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যাও। তারপরেও মনের ভেতর কোথাও না কোথাও রেশ তো ঠিকই থেকে যায়। না, আমি কুরবানির বিরোধিতা করছি না। যে বিধান মহান আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে দিয়েছেন। তার বাইরে যাওয়ার একচুল পরিমাণ ক্ষমতা কারো নেই।
মানুষের শরীরে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে মাছ-মাংস অত্যাবশ্যকীয় একটি পুষ্টি উপদান। বেঁচে থাকার জন্য আমরা মানুষতো বটেই, অনেক পশু অন্য পশুর মাংস খেয়ে থাকে। এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, ইকোসিস্টেমকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিবছর কোরবান এলেই মানুষের উৎসব আর পশুদের কান্না দেখে আমার মনে বারবার লুকিয়ে দেয় কোরবানির বিধান আমাদের কেন দিলেন?
আমি ফিরে যাই কোরবানির ইতিহাসে। যেদিন স্বপ্ন দেখেছেন হজরত ইব্রাহিম (আ:)। ‘তোমার প্রিয় জিনিসকে কুরবানি দাও, আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করো’। ইব্রাহিম (আ:) ভাবলেন, আমার ছেলে ইসমাইলের (আ.) থেকে প্রিয় সম্পদ তো আমার আর কিছু নেই। তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানকেই আল্লাহর রাস্তায় জবাই করার জন্য উদ্যত হলেন। ইব্রাহিমের (আ.) ছুরি স্পর্শ করল ভালো ইসমাইলের (আ.) গলা।
এসব আমরা সবাই জানি। এরপর পরবর্তীতে কী হয়েছিল তাও জানি। আসুন একবার পরবর্তী দৃশ্যটাকে ভিন্নভাবে কল্পনা করি। ধরুন, ইব্রাহিম (আ.) এর কোরবানি হয়ে গেছে। মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন। এবং তিনি মানবজাতির জন্য বিধান দিয়ে দিয়েছেন, প্রত্যেকের সন্তানকে প্রতিবছর এভাবে কোরবানি করতে হবে। তারপর থেকে পৃথিবীতে, দেশে দেশে, যুগে যুগে বাবারা তার প্রিয় ছেলেকে, প্রিয় মেয়েকে প্রতি ঈদে কুরবানি দিচ্ছেন। লোকজন বাড়ির উঠোনে একটু গর্ত খুঁড়ে, একটি শিশুকে জোর করে ধরে নিয়ে আসছে। হাত-পা বেঁধে তাকে মাটিতে শুয়ে কয়েকজন মিলে চেপে ধরছে, আর একজন তার গলায়……..।
জানি এই দৃশ্যটি আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আমি পারবো না। এই অসম্ভব কাজটি করতে ইব্রাহিম (আ.) উদ্যত হয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর নবী ছিলেন, তাই তিনি নিতার পেরেছিলেন। কিন্তু আমরা নবী নই। আমাদের ইমান অত শক্ত নয়। আমরা আমাদের সন্তানদের কোরবানি করতে পারবো না। করতে হলে বারবার স্রষ্টার বিধানের প্রতি বিদ্রোহী হয়ে উঠবো। এটি মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা ভালো করে জানেন। জানেন বলেই তিনি ইসমাইল (আ.)-এর গলা কাটতে দিলেন না। ধারালো ছুরি মহান আল্লাহর নির্দেশে ইসমাইল (আ.)-এর গলার চামড়া কাটতে ব্যর্থ হল। কিন্তু নবীর আত্মত্যাগ দেখে মহান আল্লাহ খুশি হলেন, তার বদলে পশু কোরবানি করার বিধান জারি করলেন।
একবার ভাবুন পশুর অনুভূতি আর মানুষের অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য কোথায় এবং কত টুকু। নিজের সন্তানকে যদি কোরবানি করতে হতো, তখন আপনার অনুভূতি কেমন হতো? আপনি কি হাসতে হাসতে তা করতে পারতেন, নিশ্চয়ই পারতেন না। তাহলে একটি অবলা জীবকে কোরবানি করার সময় আপনি হাসেন কেন? ধারালো ছুড়ি হাতে পশু জবেহ করার আগে বা পরের সেই মুহূর্তগুলোকে আপনি আনন্দ-উৎসব হিসেবে কেন নিচ্ছেন? এই বিষয়ে আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা কী?
চার.
ঈদ শব্দের আভিধানিক অর্থ আনন্দ বা খুশি। এই অর্থকে সামনে রেখে আমরা নানাভাবে ঈদের খুশি উদযাপন করি। নতুন কাপড় চোপড় করি, মজার মজার খাবার খাই। নানান জায়গায় ঘুরতে যাই। নানা আনন্দ অনুষ্ঠানে মেতে উঠি। আচ্ছা, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কি ঈদ মানে এসব?
হুজুর তো বললেন ঈদ মানে খুশি। ৩০ দিন না খেয়ে রোজা থাকার কষ্টকে মহান আল্লাহর নির্দেশে মেনে ফেলতে পারার খুশি। এক মাস রোজা রেখে নিজের সকল গুনাহ থেকে ক্ষমা পাওয়ার পাওয়ার নাম খুশি তথা ঈদ। সেই খুশিতে ঈদের দিন সকালে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানতে নামাজ পড়তে যাওয়ার নাম খুশির নামাজ, ঈদের নামাজে, ঈদগাহে যাওয়ার সময় নিজের সাধ্য অনুযায়ী একটু ভালো কাপড় পরে যাওয়া, একটু ভালো খাবার খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা ঈদকে বানিয়ে ফেলেছি ভিন্ন রকমের উৎসবে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে যা বড়োই বেমানান।
একইভাবে কোরবানির ঈদ মানেও এই পশু হত্যার আনন্দ নয়, মাংস খাওয়ার আনন্দ নয়। এটি ত্যাগের আনন্দ। মহান আল্লাহ বিধান পালন করতে পারার আনন্দ। ঈদ দল বেঁধে পশু হত্যার মতো নিষ্ঠুর কাজটি করতে পারার আনন্দ নয়। বরং কষ্টের সঙ্গে এই বিধানটা পালন করার নামই ত্যাগ কোরবানি। যেমন : আমরা জেনেছি, কোরবানির পশুকে বাজার থেকে কিনে এন কয়েকদিন আগে থেকেই তাকে আদর যত্ন করার কথা বলা হাদিসে বলা হয়েছে। তার শরীরে হাত বুলিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যাতে পশুকে যখন কোরবানির করা হবে তখন যেন তার মনে তার জন্য একটু মায়া বা কষ্টের অনুভব হয়। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কষ্টটাকে মেনে নেওয়ার নামই কোরবানির। কিন্তু আমি আপনারা চতুর্দিকে কোরবানির নামে যে উৎসব দেখি, তাতে কি মনে হয় আমরা খুব কষ্টে কোরবানির পশুটিকে হজুরের ছুরির নীচে পাঠিয়েছি? আমার তো তা মনে হয় না, বরং আমি দেখি একটি মাংসল পশু দেখে আমাদের সবার চোখে মুখে সুস্বাদু মাংস খাবারের আনন্দ। গরুকে শুইয়ে দিলেই জবেহ হয়ে যাবে, তারপরে সুস্বাদু মাংস খেতে পারব, সেই আনন্দ দেখি সবার চোখে মুখে। এ আনন্দ নিয়ে কোরবানি করলে কি সত্যিই মহান আল্লাহ কবুল করেন, নাকি একজন মাংস লোভী পশু হত্যাকারী হিসেবে আল্লাহর দরবারে আপনার আমার নাম লিখে রাখেন ফেরেস্তারা?
পাঁচ.
আমার মেয়ে তাসফিয়ার বয়স সারে সাত বছর। কোরবানি কী, সেটা সে না বুঝলেও এখন মোটামুটি বুঝতে পারে। ঈদ উপলক্ষে মানুষের বাড়ির সামনে গরু দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের নিজের গরু কোথায়, এই খোঁজ করা শিখেছে সে। যদিও প্রতিবছর বাড়িতে গেলে চাচাতো ভাইদের সাথে মিলে যে আমরা কোরবানি দেই, সেই গরুটি তাকে দেখানো হয়। গরুর সাথে ছবি তোলা হয়। কিন্তু ছোটো বলে সেটা মনে রাখতে পারে নাই। এই বছর ঈদের দুই দিন আগে থেকেই বলেছে, ‘আব্বু, সবাই তো গরু কিনেছে, আমাদের গরু কোথায়। আমি বললাম- তোমার দাদু কিনে রেখেছে, গ্রামে আছে। আমরা গ্রামে গেলে দেখবে। প্রতিবছরই তো যাই, তোমার কি মনে নেই। সে বলল, মনে আছে তো, কিন্তু আমার ইচ্ছে হচ্ছে এখনই যাই।
ঈদের আগের দিনই সে আর তার মা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছে। তাদের পরিকল্পনা আগের দিন চলে যাবে। কেননা তার ছোটোবেলায় অনেক সময় আমরা একদিন আগেই তাদেরকে গ্রামে পাঠিয়ে দিতাম। শুধু আমি যেতাম সকালবেলা। কিন্তু এবার বললাম না, ঈদের দিন আমরা সবাই একসাথে যাব। যেহেতু আমাদের বাসায় আরেকটি ছোট বেবি আছে। গ্রামের পরিবেশ সে অ্যাডজাস্ট করতে না পেরে কান্নাকাটি করবে। ফলে আমরা সকালবেলা ঈদের দিন বাড়িতে গেলাম। বাড়িতে ঢোকার পরে মেয়ে বলল, আমাদের কোথায়? কোথায়? আমি তাকে নিয়ে ঠিক পাশেই চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে গেলাম। উঠান পেরুতেই তাদের ঘর। এবার তাদের কাছ থেকেই গরু কেনা হয়েছে।
ভাইকে দেখলাম, কোদাল নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে। যেখানে গরু থেকে জবেহ করা হবে সেই জায়গায় গর্ত করার জন্য। বললাম- ভাই, গরু কোথায়? বলল, ভিতরে আছে, যা দেখে আয়। গোয়াল ঘরে ঢুকতেই দেখলাম গরুর সামনে দাঁড়িয়ে ভাবি কাঁদছে। বললাম, কাঁদতেছো কেন- পিছন থেকে ভাই বলল, ‘নিজে পালসে তো, তাই মায়া লাগতেছে। জিজ্ঞেস করলাম, কয় বছর ধরে পালছে। বলল, তিন বছর। তিন বছর! আসলেই তো, তিন বছর একটা পশু নিজের কাছে থাকলে, তাকে আদর যত্ন করে লালন পালন করলে সন্তানের চাইতে মায়া তো কম হওয়ার কথা না!
এরপরে ভাবি যা বলল, তাতে আমি আরো বেশি অবাক এবং কষ্টে নিপতিত হলাম। আর তা হল এই গরুটির একটি বাছুরই আছে। এবং সে মায়ের দুধ খায়। আমি আকাশ থেকে পড়ার মতো করে বললাম, বাছুর থাকলে কোরবানি দিতে দিলে কোনো, সে বাছুর কিভাবে বাঁচবে? সে কি মায়ের দুধ খায় না? তখন ভাবি কাঁদতে কাঁদতে বলল- আরেকটি গরু আছে এবং তার বাছুর আছে, সেই গরুর দুধ খেয়ে থাকবে।
এবার আমি তাসফিয়া নিয়ে আমাদের বাসায় আসলাম। আম্মাকে বললাম, তুমি এই গরু কোরবানির জন্য কিনতে রাজি হলে কেনো? (বলা বাহুল্য, আমরা ভাইবোনেরা আব্বাকে আপনি করে বললেও আম্মাকে তুমি সম্বোধন করে থাকি। বড়ো ভাইদের তো তাই। এবং এটা আমাদের কারোই কোনো সংকোচ থাকে না।) আম্মা বেশ কিছুদিন যাবে অসুস্থ। অনেক কিছু খোঁজ করার সময় তার হওয়ার কথা নয়। বললেন, কী হয়েছে, আমি বললাম, এই গরুর যে একটা বাছুর আছে। বাছুরের মাকে কোরবানির করলে, বাচ্চা থাকবে কীভাবে? আম্মা বলল, আমি তো জানি না এই কথা। আমি বললাম, তুমি যদি আগে খোঁজ নিতে, তাহলে অন্তত এই গরুটি কোরবানি করতে আমি রাজি হতাম না।
যাইহোক, কিছুক্ষণ পরেই কোরবানি দেওয়ার জন্য গরুকে যখন ঘর থেকে বের করা হলো। তখন আমার দুই ভাতিজি, যার একজনের বয়স ৭ বছর, আরেকজনের বয়স ১১-১২ বছর। তারা ও তাদের মা অঝোরে কাঁদতে ছিল। এর মধ্যে গরুটিকে ধরাধরি করে মাটিতে শুইয়ে দেওয়া হলো। গরুটিকে জবেহ করার পরে আমার আরেক ভাবি (আরেক চাচাতো ভাইয়ের বৌ) ছুটে আসলো গরুর রক্তে পা ভেজানোর জন্য। সাথে আরো কাউকে ডাকতেছিল। তখন প্রতিবছরই এরকম করতে অনেককে দেখি। যে গর্তে গরুর রক্ত জমে, সেখানে দুই পা ভিজিয়ে তারপরে সারাক্ষণ হাঁটতে থাকে। এতে নাকি কোনো একটি রোগ ভালো হয়। তাদেরকে গরুর কাছে যেতে দেখে আমি ডেকে বললাম, যে রোগ ভালো হওয়ার জন্য তোমরা এই কাজটি করতেছো, সারা বছর কি সেই রোগ থাকে না। সারা বছর তো গরু জবাই করে রক্ত পা ভেজাও না। তাহলে কুরবানির গরুর রক্তে পা ভেজাতে যাও কেন? পায়ে রক্ত লাগিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে একবারে কি বিবেকে বাধে না। আমার বলা শুনে সে ভাবি আর সেটা করল না। এ বছর এই দৃশ্যটি আমার আর দেখতে হলো না বলে, আমার কাছে ভালো লাগলো।
ছয়.
আমি আগেই বলেছি, প্রাণিজ মাংস খাওয়া আমাদের শরীরের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য অন্যতম একটি মাধ্যম। এবং কোরবানি করা মহান আল্লাহ তাআলার একটি সুস্পষ্ট বিধান। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। তাছাড়া কোরবানি সবার জন্য ওয়াজিব নয়, সামর্থ্যবানদের জন্য ওয়াজিব। বর্তমান সময় যে হারে পশু কোরবানি করা হয়। তাদের সবার কি সে সামর্থ্য আছে? নাকি সামাজিক মর্যাদা, পরিবারের সদস্যদের মুখ রক্ষার জন্য কোরবানি করা হয়। এবং যাদের সামর্থ্য আছে তাদের মধ্যে যারা সারা বছর অবৈধভাবে সুদ, ঘুস, দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা রোজগার করে তাদের কোরবানি কি আল্লাহ কবুল করেন, করবেন? নামাজ-রোজার খবর নাই, হালাল, হারামের বাছ-বিচার নাই, বছরে একবার কোরবানি দিলেই কি সব গুনাহ মাফ, র্ধম এত সোজা?
আমার বক্তব্য স্পষ্ট, আত্ম তুষ্টি বা তৃপ্তি জন্য নয় কোরবানি। কোরবানি মাংস খাওয়ার উৎসব নয়। ত্যাগের, ত্যাগের মহিমা, কষ্ট এবং বেদনার অনুভূতির নাম কোরবানি। নতজানু মনে খোদার মেনে নেওয়ার নাম কোরবানি। আমার মনে হয় না, এই অনুভূতির বাইরে গিয়ে মাংস খাওয়ার উৎসব কোরবানি করলে, সেই পশু কোরবানির হিসেবে মহান আল্লাহওয়ালা কবুল করেন। আমার মনে হয়, এই যে এত এত পশু হত্যা জবেহ করা হয় এরা সব এর অনেকগুলি কোরবানির হলেও সবারটা কোরবানির নয়, হয় পশু হত্যা। আর এই, আর আপনি, আমি এই হত্যাকারীদের একজন।
আমি কল্পনায় দেখি, যে-সব পশু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করা হয়েছে। সেগুলোর আত্মা উড়ে উড়ে সাত আসমান পার হয়ে মহান আল্লাহর কাছে চলে যাচ্ছে। কল্পনায় দেখি, যারা মাংস খাওয়ার উৎসবে পশু কোরবানি করছে তাদের কোরবানির তো হচ্ছেই না, বরং তাদের আত্মাগুলো আমাদের চারপাশে ঘুরঘুর করছে। শত শত গরু মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়ার আত্মা আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি দেখি আত্মাগুলো বাতাসের সাথে আমাদের, আমাদের কারো কারো শরীরে প্রবেশ করছে।
ফলে সভ্য সমাজে বসবাস করে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারছি না। কবুল না হওয়া কোরবানির পশুর আত্মাগুলো আমাদের শরীরে বসবাস করে বলে আমরা নিজেরাও একে জন পশু হয়ে উঠছি। ফলে আমাদের সমাজে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, ঘুস আর দুর্নীতি বেড়েই চলছে। প্রতিবছর কোরবানির নামে পশু হত্যা যেমন বেড়ে চলছে, এমনিও তেমনি বেড়েছে অমানুষের সংখ্যাও। আমাদের চারপাশে অসংখ্য এরকম অমানুষদের একজনই চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুতে লাইন মেনে সিগন্যালটি মানতে চেষ্টা করেনি। ফলে শিশু আয়েশাসহ তিনজন নিরাপদ মানুষের প্রাণ হলো কোরবানির ঈদের মাত্র ২ দিন আগে।
দুই বছরের ছোট্ট শিশুর আয়শা ও তার বাবা মার মুখ আমি কল্পনা করি, মৃত্যুর আগ মুহূর্তে শিশু আয়েশার মুখ আমি কল্পনা করি। নিজের সন্তানতুল্য পশুটিকে কোরবানির জন্য হাটে বিক্রি করে দেওয়া মানুষের মুখ আমি কল্পনা করি, গেরস্তের ঘরে ফেলে আসা পশুগুলোর মুখ আমি কল্পনা করি। যে মালিকটিকে তার বিশ্বস্ত মনে হতো। যে মালিকটিকে স্বজাতি না হয়েও আপন মনে হতো, সেই মালিক যখন কিছু টাকার জন্য তাকে পশুর হাটে দিয়ে আসে, সেই মানুষের মুখ আমি কল্পনা করি। আমি কল্পনা করি মানুষের ছুরির নিচে শোয়ার আগ মুহূর্তে একটা গাভির অনুভূতিটা কী? সে কি তার বাছুরের কথা মনে করে, সে কি তার মালিকের কথা মনে করে, নাকি সে মহান আল্লাহর মহান আল্লাহর কথা মনে করে?
যে কোরবানি ছিল ত্যাগের, ধৈর্যের, উৎসর্গের, সেই কোরবানিকে গোস্ত খাওয়ার উৎসবে পরিণত করা, কান্নার বদলে হাসিমাখা মানুষের মুখ আমি কল্পনা করি। আর মনে মনে বলি-
মানুষ বানিয়েছে প্রভু, দুটো পা দিয়েছ
চার
পেয়ে পশু বানাওনিতো-
মানুষের রূপ দিয়ে- পশুর স্বভাব দিয়েছো
মানুষ বানাওনিতো।
কোরবানি : ভোগ নয়, হোক ত্যাগ- হত্যা নয়, হোক আত্মসমর্পণ।
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
১০ জুন ২৫


0 মন্তব্যসমূহ