অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও উল্লাসকর দত্ত। একজন কালজয়ী কথাশিল্পী, অন্যজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী বীর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খ্যাতিমান এই দুই মনীষীর একজনের আজ জন্মদিন, অন্য জনের মৃত্যুবার্ষিকী। আজ ১৬ এপ্রিল, ১৮৮৫ সালের আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন উল্লাসকর দত্ত। অপরদিকে ১৯৫১ সালের আজকের দিনে মৃত্যুবরণ করেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। উল্লাসকর দত্তের ১৪১তম জন্মবার্ষিকী, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ৭৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
দুজনের জন্মই ব্রিটিশ ভারতে। দুজনের জন্মই তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশে। দুজনই বেড়ে উঠেছিলেন তিতাসের দোলা লাগানো নদীর তীরে- আলোছায়া, সুনীল-সুনীবির, শ্যামল মাটির দেশ, সুর সংগীতের দেশ, শিক্ষা ও সাহিত্যের দেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। উপমহাদেশ জুড়ে দুই জনই খ্যাতি পেয়েছেন নিজেদের আলাদা আলাদা মহান কাজের জন্য। একজন সাহিত্যে, অন্যজন বিপ্লবে। একজন নিরন্তর সাধনায়, অন্যজন অসীম ত্যাগে। তবে ভোগবাদী ছিলেন না কেউই। দুজনেই বেড়ে উঠেছেন জন্মভূমির মাটি ও মানুষের প্রতি প্রগাঢ় মমতা নিয়ে। দুজনেই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন যে ঋণ শোধ করা যাবে না, সেই ঋণ শোধের এবং তাঁরা তা শোধ করতেও পেয়েছিলেন।
দুজনের বয়সের পার্থক্য ২৯ বছর অর্থাৎ পুরো এক প্রজন্মের বয়সের পার্থক্য তাদের। বয়সের পার্থক্যের মতো তাদের আরো অনেক কিছুতেই পার্থক্য রয়েছে। উল্লাসকরের জন্ম বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলায়। শিক্ষা-দীক্ষায়, রাজনীতি-অর্থনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতিতে একটি অগ্রসর এলাকা তদানীন্তন সরাইল। যেটি একসময় পরিচিত ছিল তখন ভাটি বাংলার রাজধানী হিসেবে। সেই সরাইলের বিখ্যাত একটি গ্রাম কালীকচ্ছ-এ জন্ম ও বেড়ে ওঠা উল্লাসকর দত্তের।
অদ্বৈতর জন্ম বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার অত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল গোকর্ণঘাটে। এই গ্রামের দরিদ্র মালোপরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। বর্তমানে গোকর্ণঘাট পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হলেও সেসময় এটি ছিল এটি অনুন্নত এলাকা। তিতাস পাড়ের এই গ্রামটি পরিচিতি ছিল জেলেদের গ্রাম হিসেবে। শহরের সাথে এই গ্রামের যোগাযোগের উন্নত ব্যবস্থা ছিল না। নানা প্রয়োজনে খাল-বিল পেরিয়ে, উঁচু-নিচু ধুলিমাখা মাঠ ডিঙিয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
উল্লাসকরের ডাক নাম ছিল ‘পালু’। অদ্বৈতের কোনো ডাকনাম ছিল না। মূল নাম অদ্বৈতকে সংক্ষেপণ করে কেউ কেউ তাকে ‘অদু’ বলে ডাকত। দরিদ্রতাকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠে, দারিদ্র্যকে জয় করেছেন অদ্বৈতমল্লবর্মণ। আর উল্লাসকর দত্ত নিজের পারিবারিক সম্মান, ঐশ্বর্য দু’পায়ে ঠেলে বেছে নিয়েছিলেন দুঃখ-কষ্ট আর অনিশ্চয়তার জীবনকে। অদ্বৈত জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। মাত্র ৩৭ বছরেই নিভে গেছে তাঁর জীবন প্রদীপ। উল্লাস কর দত্ত পেয়েছিলেন আশি বছরের দীর্ঘ জীবন। জীবন সংক্ষিপ্ত হোক কিংবা দীর্ঘ, মহৎ কাজে বাধা নেই কারো সেই কথাটি যেন বলে গেলেন এই দু’জন মনীষী।
উল্লাসকর দত্ত বেড়ে উঠেছেন একজন অবস্থাসম্পন্ন পিতার ঘরে। উল্লাসকর দত্তের পিতা দ্বিজদাস দত্ত একজন বহুগুণী মানুষ ছিলেন। দ্বিজদাস দত্ত নিজে উচ্চ শিক্ষিত, ছিলেন শিক্ষক-অধ্যাপক ও একই সঙ্গে তিনি একজন বহু ভাষাবিদ, লেখক-গ্রন্থ প্রণেতা ও মানবতাবাদী ধর্ম প্রচারক। দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন তিনি, তার সাথে ঘুরেছেন পুত্র, উল্লাসকর। উল্লাসকর দত্তের মাতা মুক্তকেশী ছিলেন সর্বধর্ম সমন্বয় মতবাদের প্রবর্তক স্বামী আনন্দচন্দ্র নন্দীর কন্যা। উল্লাসকর দত্তের মাতৃকুল ও পিতৃকুলের প্রায় সবাই এবং জন্মগ্রাম কালীকচ্ছের অনেকেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। তাই পারিবারিক পরিবেশই উল্লাসকর দত্তকে দেশ প্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও বিপ্লবী হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্ম ও বেড়ে ওঠা জেলে পরিবারে। তার ওপর পিতা-মাতার অকাল প্রয়াণে অদ্বৈত মল্লবর্মণের বাল্যকাল কেটেছে অভাব-অনটনে, দারিদ্র্যের যাতা ক্লিষ্টে। বাড়ির সামনে আছড়ে পড়া তিতাসের ঢেউ তাঁর বুকে প্রেরণা দিয়েছে লেখক হয়ে ওঠার। তাঁর পিতার নাম অধরচন্দ্র মল্লবর্মণ। মায়ের নাম সারদা। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে অদ্বৈত ছিলেন দ্বিতীয়। সবার বড় বোন। শৈশবেই অদ্বৈতের পিতামাতার ও তার কিছুকাল পরে দুই সহোদরের মৃত্যু হয়। ১৯৩৪-এ তিনি কলকাতা যাওয়ার পূর্বেই তাঁর বোনটিও মারা যায়। বংশ ও পিতৃ পরিচয় দেবার মতো অদ্বৈতের আর তেমন কিছুই ছিল না।
উল্লাসকর সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হওয়ায় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পেরেছিলেন। সেদিক দিকে বঞ্চিত হয়েছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। শিশু অদ্বৈতের লেখাপড়ার প্রতি ঝোঁক দেখে, গুণী ছেলেকে গ্রামের লোকজন তাকে চাঁদা তুলে শহরের নামকরা স্কুলে পাঠিয়েছেন জ্ঞান অর্জন করার জন্য। যাতে করে তাদের কেউ একজন শিক্ষা-দীক্ষায় সমাজের ভালো অবস্থান গিয়ে জেলে সম্প্রদায়ের জীবনের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটায়। গ্রামের মানুষের চাঁদা নিয়ে নিজের শিক্ষা অর্জন করেছেন বলে অদ্বৈত মল্লবর্মণ আজীবন কৃতজ্ঞ থেকেছেন নিজের গ্রামের মানুষের প্রতি। তাই কলকাতায় বসেও দেশ-গ্রামের কারো চিঠি পেলেই বা কলকাতায় ভাসমান স্বজনদের সহায়তায় তাঁর নিজের চাকরির সামান্য বেতনের টাকা তাদের রোগ-শোক, উৎসবে প্রদান করেছেন।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ-এর জন্ম ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি। সেসময় উল্লাসকর দত্ত আন্দামানের কুখ্যাত কালাপানির জেলে অন্তরিন। কলকাতায় লেখাপড়ার ফাঁকে উল্লাসকর জড়িয়ে পড়েছেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবে। ইংরেজ অধ্যাপক বাঙালিদের মন্দ বলায় উল্লাসকর তাকে জুতাপেটা করে কলেজ থেকে বষ্কিার হয়েছেন। যোগ দিয়েছেন নামক ‘অনুশীলন’ নামক বিপ্লবী সংগঠনে। ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী প্রমুখ বিপ্লবীদের সঙ্গে মিলে বোমা তৈরির শিক্ষা অর্জন করেছেন।
১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল ইংরেজ বিচারক জজ ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তার গাড়িতে বোমা ছুড়ে মারেন। অন্য গাড়িতে থাকায় কিংসফোর্ড বেঁচে যায়, কিন্তু সেই গাড়িতে থাকা অন্য তিন জন নিহত হন। ব্রিটিশ পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিপ্লবীদের আকট করে। তাদের নামে মামলা হয়, মামলার রায়ে যাবজ্জীবন সাজা মাথায় নিয়ে তিনি যখন জেল খাটছেন, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার গ্রামের অজো পাড়াগাঁয়ে দারিদ্র্যকে সাথি করে নিয়ে বেড়ে উঠছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। তাঁর জ্ঞান ও গুণের কথা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গ্রামে। স্কুলে ভালো থাকবে হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়িয়েছে। তত দিনে সমগ্র ভারতবর্ষের ছড়িয়ে পড়েছে বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের নাম।
১৯২০ সালে ১২ বছর জেল খাটার পর জেলের নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়ে উল্লাসকর দত্ত যখন আইনি প্রক্রিয়া মুক্ত হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন, তখন অদ্বৈত মল্লবর্মণের বয়স মাত্র ৬ বছর। জেলের অমানুষিক নির্যাতনে শারীরিক মানসিক ক্ষতির শিকার হয়ে অপ্রকৃতিস্থ উল্লাসকর দত্ত যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ঘি-এর ব্যাবসা শুরু করেছেন, অদ্বৈত তখন জেলা জর্জ মাইনর স্কুলে পড়াশোনায় ব্যস্ত, লেখাপড়া শেষ করে অদ্বৈত ভর্তি হয়েছেন তার পাশের স্কুল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। ঠিক সেই সময় ব্যাবসা লস হয়, কলকাতা থেকে নিজ গ্রাম কালীগঞ্জে ফিরে এসেছেন উল্লাসকর দত্ত। এলাকার লোকজন ও বন্ধুরা তার কাছে তার দ্বীপান্তরের কথা সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় তিনি বন্ধুদের অনুরোধে তিনি তাঁর ‘দ্বীপান্তরের কথা’ ও ‘আমার কারাজীবন’ গ্রন্থরচনা করেন।
১৯৩০ সালে সময়ে কুমিল্লার দুই বিপ্লবী কন্যা শান্তি ও সুনীতি কালীকচ্ছে আসেন বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের সাথে দেখা করতে। কুমিল্লার মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে উল্লাসকর দত্তের আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য এসেছিলেন তারা। বিপ্লবী কন্যাদের অভিযানও ব্যর্থ হলে উল্লাসকর দত্তের সাথে দেখা হওয়ার বিষয়টি জেনে যায় ব্রিটিশ পুলিশ। ফলে তিনি আবারও গ্রেফতার হন এবং ১৮ মাসে জন্য জেলবন্দি হবে। এদিকে ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ চলে যান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আই ক্লাসে ভর্তি হতে।
দুজনের জীবনের এই ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ যখন অন্নদা স্কুলের ছাত্র, তখন উল্লাস কর তখন কালীকচ্ছে অবস্থান করছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের কারণে ক্ষুদিরামের ফাঁসি ও অন্যান্য বিপ্লবীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ তাদের অন্যতম একজন সহযোগী, উল্লাসকর উপমহাদেশে তখন আলোচিত একটি নাম। এই বিপ্লবীর সাথে অদ্বৈত মল্লবর্মনণের কখনো দেখা হয়েছিল বলে হয়েছিল কি,না তা জানা যায় না।
১৯৩৪ সালে অদ্বৈত মল্লবর্মণ লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে জীবিকার সন্ধানে চলে গিয়েছেন কলকাতায়। তিনি কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। এদিকে দ্বিতীয়বার কারা বারণ শেষে উল্লাসকর ফিরে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। এখানে ১০ বছর বসবাসের পর তিনি পুনরায় ১৯৪২ সালের দিকে উল্লাসকর আবারও কলকাতায় যান এবং সেখানে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করেন। কলকাতা থাকাকালে বঙ্গীয় সরকার তাঁর ভাতার ব্যবস্থা করলেও তিনি সরকারি ভাতা নিতে অস্বীকার করেন। এ সময় অদ্বৈত মল্লবর্মণ কলকাতায় অবস্থান করেছিলেন, কিন্তু এখানেও তাদের দুজনের মধ্যে দেখা সাক্ষাতের কোনো খবর পাওয়া যায় না। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর দেশ বিভক্তি ও নানা রাজনৈতিক পরিবর্তনে মর্মাহত উল্লাস কর দত্ত ফিরে আসেন। কিন্তু এখানেও তিনি বেশিদিন মন স্থির রাখতে পারেননি।
১৯৫১ সালের মৃত্যুবরণ করেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ মৃত্যুবরণ করেন। বই কেনা ও মানুষের প্রতি দানের সহযোগিতার মনোভাবের কারণে দীর্ঘদিন অনাহার ও অর্ধাহারে কেটেছে অদ্বৈত মল্লবর্মণের। উপার্জনের অর্ধেকের বেশি চলে যেত বই কিনতে, বাকি অর্ধেক দিতে হতো তাঁর উপর নির্ভরশীল স্বজন ও আশ্রিতদের। ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে প্রথম প্রকাশিত তিতাস একতটি নদীর নাম গ্রন্থের প্রকাশিত গ্রন্থের ভূমিকায়-এর প্রকাশক শ্রী সতীশ রায় বলেন- ‘আমরা চিরকাল অদ্বৈতকে তাঁহার মুষ্টি-অন্ন বহুজনের সঙ্গে ভাগ করিয়া খাইতে দেখিয়াছি।” এভাবে শরীরের প্রতি অযত্ন ও অবহেলা করে এবং অপুষ্টির শিকার হয়ে ১৯৪৮ সালে তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের পীড়াপীড়ি ও সহযোগিতায় কাঁচড়াপাড়া যক্ষ্মা হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুটা রোগ মুক্ত হয়ে তিনি ষষ্ঠীতলার বাসায় ফিরে আসেন। কেউ বলেন রোগ মুক্তির আগেই তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসেছিলেন লেখালেখিতে আরো বেশি সময় দিতে। কিন্তু সে সময় তিনি খুব বেশিদিন পাননি। ১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল কলকাতার নারকেলডাঙার ষষ্ঠী তলার বাড়িতে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই ক্ষণজন্মা কথাসাহিত্যিক।
১৯৪৮ সালে অদ্বৈত মল্লবর্মণ যখন যক্ষা রোগে আক্রান্ত হন, সেই বছর উল্লাসকর ৬৩ বছর বয়সে বিধবা লীলা পালকে ব্রাহ্মধর্ম মতে বিয়ে করেন। ১৯৫১ সালে উল্লাসকর দত্ত স্ত্রী লীলা পালকে নিয়ে আসামের শিলচরে চলে যান। এবং সেখানেই পদ্মনগরের তারাপুর জেল রোডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬২ সালে স্ত্রী লীলা পাল নানা রোগে ভুগে মারা যান। বিপ্লব উল্লাসের জীবনের সমস্ত আরাম-আয়েশ কেড়ে নেয়। দরিদ্রতাকে সঙ্গে নিয়ে রোগে-শোকে নিষঙ্গ অসহায় জীবন যাপন করতে থাকেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে উল্লাসকর। এসময় শিলচরের সরকার তাঁকে পুনবার্সন করতে চেয়েছিল, অভিমানী বিপ্লবী তাও প্রত্যাখান করেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর ১৪ বছর পর আসামের শিলচরে ১৭ই মে মৃত্যুবরণ করেন বিপ্লবী উল্লাস কর দত্ত। তাঁর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে একজন মহৎপ্রাণ অগ্নিপুরুষের জীবনাবসান ঘটে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই দুই খ্যাতিমান ব্যক্তির খ্যাতি দুই কারণে। একজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের কারণে, অন্যজন সাহিত্য এবং সাংবাদিকতায় অনন্য ভূমিকা রাখার কারণে। দুজনের কর্মজীবনে দুজনে কাজের ক্ষেত্রে ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় তাদের অশেষ মিল ছিল আর তা হলো : দুজনেই স্বদেশ, মাটি ও মানুষের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। উল্লাসকর দত্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, লড়াই করেছেন, বিপ্লব করেছেন, বোমা ফাটিয়েছেন, জেল খেটেছেন। আর অদ্বৈত নিজের জীবন ধারণের সামান্য পয়সা থেকে জ্ঞানার্জনের জন্য বই কিনেছেন, আর নিজের গ্রামের অসহায় মানুষদের সহায়তায় অর্থ প্রদান করেছেন। উল্লাসকর দত্ত যেমন নিজের মাটি, মানুষকে স্বাধীন দেখতে চেয়েছেন, অদ্বৈত মল্লবর্মণ তেমন নিজের মাটি ও মানুষকে উন্নত জীবনের জন্য চিন্তা করেছেন। তাদের সুখ, দুঃখ এবং কষ্টের কথাগুলো তুলে ধরেছেন তার লেখালেখির মাধ্যমে।
উল্লাস কর দত্তের বিপ্লব একাংশে সফল হয়েছিল কারণ শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা এ দেশ থেকে তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। অন্যদিকে একরকম ব্যর্থ হয়েছিল কারণ তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বিভক্ত হয়েছিল। বিপ্লবী ব্রিটিশদের তাড়াতে চাইলেও দেশভাগ চাননি। ফলে দেশভাগের অভিমানী ক্ষত নিয়েই উল্লাসকর দত্তকে মৃত্যুবরণ করতে হয়।
ঠিক তেমনি সফলতা ও ব্যর্থতার গ্রাফ দেখা যায় অদ্বৈত মল্লবর্মনের জীবনেও। অদ্বৈত মল্লবর্মণ তার জন্মস্থান মানুষের সুখ-দুঃখের কথা, তিতাস পাড়ার মালদের জীবন আলেখ্য বিশ্বে মানুষের কাছে জানাতে চেয়েছিলেন, তা তিনি খুব ভালোভাবেই পেরেছিলেন। কিন্তু জেলে পাড়ার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন, জীবনমানের যে উন্নয়ন তিনি চেয়েছিলেন তাকে নিয়ে গড়ে যেতে পারেননি বা দেখে যেতে পারেনি। হতভাগ্য মালো পাড়ার বৃদ্ধ, যুবক ও শিশুদের দুর্দমনীয় কষ্টগুলোকে অক্ষুন্ন রেখেই কলকাতার ষষ্ঠীতলায় মৃত্যুবরণ করেন নিঃসঙ্গ অদ্বৈত মল্লবর্মণ।
উল্লাসকর দত্তের জীবনে প্রেম এসেছিল, সেই প্রেম হারিয়ে গিয়েছেছিল তার জেল জীবনের অন্ধকারের আড়ালে। সেসময় প্রেমিকা লীলা পালের বিয়ে গিয়েছিল। সেই প্রেমিকার স্বামী মারা গেলে শেষ জীবনে ৬৮ বছর বয়সে উল্লাস কর তাকে জীবন সঙ্গিনী করে নিয়ে আসেন। যৌবনের প্রেমকে সার্থকতা দান করেন বার্ধক্য এসে, প্রমাণ করে দেন প্রেম অমর। প্রমাণ করে যান বিপ্লবীরা কথা রাখে। কিন্তু এই তাদের এই দাম্পত্য জীবনও খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না, বিয়ের মাত্র চৌদ্দ বছর পরে রোগে ভুগে মারা যান লীলা পাল, আর তারও তিন বছর পর আশি বছর বয়সে বিপ্লবী জীবনের সমাপ্ত করেন উল্লাসকরও।
অদ্বৈতের জীবনে প্রেম এসেছিল কিনা জানা যায়নি, তবে তিনি বিয়ে করেননি। উল্লাসকর দত্তের মতো তিনিও মৃত্যুবরণ করেন পৃথিবীতে রক্তের ধারাবাহিকতা না রেখে। তবে তারা দুজনে কর্মনিষ্ঠা, দেশপ্রেম দিয়ে অসংখ্য মানুষকে নিজের অনুসারী বানিয়ে গেছেন। তারা আমাদের শিখিয়ে যান, বিপ্লবের মৃত্যু নেই, বিপ্লবীর মৃত্যু নেই। সাহিত্যের মৃত্যু নেই, সাহিত্যিকের মৃত্যু নেই। মৃত্যু তাদের দুজনকেই আড়াল করলেও অমর করে রাখে। অমর করে রাখে তাদের মহান কর্মকে। অমর করে রাখে দেশ, মাটি, মানুষ ও স্বজাতির জন্য তাদের ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তকে। একজনের কাছে ছিল কলমই বোমা। শব্দের বিপ্লবে তিনি দেশ ও দেশের মানুষের কথা বলেছেন। অন্যজন বোমাকে দিয়েছেন শব্দের রূপ, বিপ্লবকে দিয়েছেন সাহিত্যের মাধুর্যতা। যুগে যুগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভারত ও বাংলাদেশের এই অঞ্চলের মানুষদের কাছে তারা অমর হয়ে রইবেন। অমর হয়ে রইবেন যুগলবন্দি প্রেরণার উৎস হিসাবে।
এই লেখাতে উল্লাসকর দত্ত এবং অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনের তুলনামূলক সাদৃশ্য-বই সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল কিনা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। আপাতত দৃষ্টিতে অদ্বৈত এবং উল্লাসকরের মধ্যে কোনো সংযোগ নেই। কিন্তু আমাদের কাছে আছে। কেননা আমরা এই দুজনকেই ধারণ করি, লালন করি দেশপ্রেম ও মানব প্রেমের প্রেরণার উৎস হিসাবে। এই মৃত্যুহীন দুই প্রাণের প্রতি আমাদের অগাধ শ্রদ্ধা।
------
অদ্বৈত-উল্লাস, ভিন্ন নদী-অভিন্ন ঢেউ : যুগলবন্দি প্রেরণার উৎস।
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
১৬ এপ্রিল ২৬
বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই লেখাটি আরো অধিক পরিমার্জন করার দাবি রাখে। লেখাটি কপি না করার জন্য অনুরোধ রইল। ভালো লাগলে শেয়ার দেওয়া যেতে পারে।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:
* গ্রন্থ : তিতাস একটি নদীর নাম ।
* উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত একাধিক নিবন্ধ।
* কথোপকথন: জয়দুল হোসেন (কবি ও গবেষক ব্রাহ্মণবাড়িয়া)।
* গ্রন্থ : ছোটদের অদ্বৈত মল্লবর্মণ: মানিকরতন শর্মা
* প্রবন্ধ : কালজয়ী ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ: আমির হোসেন (কথাসাহিত্যিক) (কিচিরমিচির, প্রথম সংখ্যা, মার্চ, ২০২৩)।
* নিবন্ধ : তিতাস একটি নদীর নাম ও অদ্বৈত মল্লবর্মণ চর্চা: সাইফুল ইসলাম রিপন : দৈনিক জনকণ্ঠ, ০৮ জানুয়ারি ২০১৬।
* গ্রন্থ : অবিভক্ত বাংলার অসমাপ্ত বিপ্লব: জয়দুল হোসেন (কবি ও গবেষক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ।
* প্রবন্ধ : উল্লাসকর দত্তের সংগ্রামী জীবন ও স্মৃতি রক্ষার আন্দোলন: জহিরুল ইসলাম চৌধুরী স্বপন:
* কথোপকথন : আমির হোসেন (কথাসাহিত্যিক, সংগঠক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া)।
* কথোপকথন : ফেরদৌস রহমান (সাধারণ সম্পাদক-উদীচী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখা)।
* উইকিপিডিয়া বাংলা, এবং লাইব্রেরি ডটকম, স্যাটেলাইট চ্যানেল, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।

0 মন্তব্যসমূহ