Ticker

6/recent/ticker-posts

বইমেলার স্মৃতি-৪

একদিন কথাসাহিত্যিক আমির হোসেন স্যার বললেন, ‘বই মেলায় যাইবানি শ্রাবণ’ ? বললাম, ‘যামুতো স্যার কোনোদিনতো যাই নাই, কোনো কিছুই তো চিনি না, আপনার সাথে গেলে তো ভালোই হয় তারপর পরিকল্পনা করে আরো কয়েকজন মিলে আমার অমর একুশে বইমেলায় গেলাম সাধারণত গল্প শুরুর আগেএকদিনশব্দ যুগল দিয়ে অনেকদিন আগের কোনো ঘটনা বুঝালেও, অমর একুশে গ্রন্থমেলায় যাওয়ার ঘটনাটা আমার খুব বেশিদিন আগের ঘটনা না মাত্র চার বছর আগের কথা ২০২২ আমার প্রথম গল্পগ্রন্থরাজকুমার তোতা পাখির গল্পবের হওয়ার বছর সেটি সে বার ট্রেনে করে আমরা বইমেলায় গেলাম স্যার ঘুরে ঘুরে মেলা দেখালেন ঘুরতে ঘুরতে ভাবলাম, এত বছর হলো সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার সাথে যুক্ত আছি অথচ কখনো মেলায় আসেনি প্রতিবছর বিকেল বেলা নানা চ্যানেলের পর্দায় দেখি বইমেলার খবরাখবর আসবো করে আসা হয় না  

আসলে একে তো ঢাকার সাহিত্য সমাজ সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা তখন ছিল না, ছিল না কারো সাথে পরিচয়। তার ওপর ছুটি ম্যানেজ করা, টাকা-পয়সার সমস্যা আর স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের নানা কাজের ঝামেলাতো লেগেই থাকতো। সবচেয়ে বড়ো কথা আমির হোসেন স্যারের মতো এর আগে কেউ বলেনি, ‘চলো বইমেলাটা দেখে আসি (অনেকে হয়ত ভেবেছে আমি এসবের যোগ্য নই, কিংবা আমাকে সুযোগ দিলে হয়ত তাদের ভাগে কম পড়ে যাবে)

 


যেহেতু ততদিনে আমরা একটা টিম হয়েছি (নেতিবাচক দৃষ্টিতে কারো কারো ভাষায় আমার একটা সিন্ডিকেট গড়েছি) এবং আমার একটা গল্প বইয়ের প্রকাশিত হয়েছে, সে উপলক্ষে এই প্রথম ঢাকা বইমেলায় আসা। তারপর প্রতিবছরে আসছি। কখনো একা, কখনো আমির হোসেন স্যার অথবা অন্যদের সাথে। তবে আমি হোসেন স্যারের সাথে বেশি আসা হয়েছে। স্যারের সাথে মেলায় ঘোরার সুবিধা হল স্যার অনেক ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে যেমন জানেন, তেমনি বিভিন্ন লেখকের বই এবং সংশ্লিষ্ট বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কেও জানেন। ফলে আমির স্যারের সাথে ঘোরাঘুরি করলে গ্রন্থ লেখক সমাজের অনেক বিষয়আসয় সহজেই জানা যায়। 


 

আমি দ্ব্যর্থ কণ্ঠে বলতে পারি- সাহিত্য-সংস্কৃতি বলতে আমি কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়াকেই বুঝতাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাইরে কখনো আসার ইচ্ছা বা চেষ্টা আমার যেমন জাগেনি, তেমনি অন্য কেউ জাগায়ওনি। আমির হোসেন স্যার এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি আমাকে চিনিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাইরে সাহিত্য-সংস্কৃতির বিশাল একটা জগৎ আছে। মোটামুটি এই অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের শাতাধিক সাহিত্য পত্রিকা, অসংখ্য সংগঠন এবং শত শত লেখকদের সম্পর্কে জানাশোনা তৈরি হয়েছে। এর অনেকটা সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা যেমন একটা ভূমিকা আছে, তেমনি অনেক ব্যক্তিদেরও, ব্যক্তি এবং সংগঠনের ভূমিকা আছে। কিন্তু সবার আগে বলতে হবে আমির স্যারের নাম

 


আমির হোসেন স্যারকে নিয়ে আমার বিভিন্ন লেখা আছে। সেখানে আমি স্যারের সঙ্গে পরিচয় শুরু এবং আমাদের সম্মিলিত কাজগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকে সেই দিকে যাচ্ছি না। আজকে আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে এবছর বছর আমি একদিনই মেলায় গিয়েছি। স্যার দুবার গিয়েছেন। আমি যাওয়ার তিন দিন আগেই। এবার স্যার বইমেলা থেকে এসে আমাকে বলছেন- স্যারকে নাকি বেশ কয়েকজন লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক জিজ্ঞেস করেছেন- আপনি এসেছেন, আপনার সাথে শ্রাবণ কোথায়? তাকেতো দেখছি না। স্যার উত্তর দিয়েছেন, শ্রাবণ অমুক দিন আসবে। মানে ঢাকায় যারা আমাদের চেনেন তাদেরও একটা ধারণা হয়ে গেছে স্যার যেখানে থাকেন, সেখানে আমিও থাকবো

 


প্রায় এক মাস আগে স্যার এই কথাটা আমাকে বললেন। এখনো কথাটা মনে হলে আমি একটু পুলক অনুভব করি। একজন মানুষের সাথে আরেকজন মানুষের আত্মিক যে অ্যাটাচ্মেন্ট সেটা অন্যদের চোখেও সহজেই ধরা পড়ে। এই বিষয়টা নিয়ে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখাতে পারি। আমাদের মঙ্গল সাহিত্য আড্ডায় এই নিয়েও কথা হয়েছে। মানে এখানে দুইতিন জনের একজন একটা জোড়া আছে। একজনের খোঁজ করলে আরেকজনের নাড়ি-নক্ষত্রের খোঁজ পাওয়া যায়। আমরা বলি মানিকজোর। এরকম বেশ কয়েকটি মানিকজোড়া আছে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর। কিন্তু আমির হোসেন স্যারের সাথে আমার কোনো জোড়া নেই। কারণ আমাদের বয়স এবং যোগ্যতার ফারাক অনেক। কিন্তু সেই দূরত্বে কেউ অতিক্রম করে যারা আমাদের কাছাকাছি দেখেন বলেই এই আমার ভালোলাগা। 

 


২০২৩ সালে আমির হোসেন স্যারের হার্টের অপারেশন হলে আমরা ভেবেছিলাম, হয়ত তাকে আমরা আগের মতো সাহিত্য-সংস্কৃতির কাজে, লেখালেখিতে বা প্রকাশনা কিংবা ঘোরাঘুরিতে পাবো না। কিন্তু অপারেশনের পরে তিনি অবাক করে দেখালেন যে, তিনি আগের চেয়েও আরও বেশি তরুণ হয়েছে। আগেরটা থেকে আরো বেশি অ্যাকটিভ হয়েছেন। তাঁর সব কাজের পরিমাণ আরো বেড়েছে। সম্ভবত তিনি তার মনের বয়স কমিয়েছেন বলেই তরুণ হয়েও আমি তার কাছাকাছি আসতে পেরেছি।এবং প্রকাশনা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির অনেকগুলো কাজের স্যারের সহযোগী হতে পেরেছি।স্যারও আমার অনেক কাজে সহযোগিতা করেছেন। যাইহোক, এবারও মেলায় গিয়ে স্যারের সাথে দেখা করি এবং যথারীতি বিভিন্ন স্টল এবং লেখকের সাথে দেখা করা বা নতুন কারো সাথে পরিচিত হই। বইমেলা স্মৃতি, তাই এই স্মৃতির সাথে অবিচ্ছেদ আমির হোসেন স্যারের অংশটুকু এই লেখায় যুক্ত করে নিলাম। বিগত বছরগুলোর মতো মতো এবারের মেলাতেও ঘুরাঘুরি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

 


এবারের বইমেলায় আমির হোসেন স্যারের ৩৮তম প্রকাশিত বই নদীভিত্তিক উপন্যাস উপন্যাসচরকেদরখোলা’, উপন্যাসটি বের হওয়ার আগেই যে কয়েকজন এটির পড়েছে তাদের মধ্যে আমিও একজন। স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপ্রাণন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিতচরকেদরখোলাবাংলা সাহিত্যতো বটেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নদীভিত্তিক যে কয়েকটি উপন্যাস বা গল্প রয়েছে তাদের মধ্যেচরকেদরখোলাখোলাও নতুনতম সংযোজন। উপন্যাসের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাতো আরো কয়েক বছর আগে থেকেই। এই উপন্যাসটিও পাঠকদের ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। (চরকেদেরখোলায় একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা লেখা আরম্ভ করেছি। দেখি কত দিনে শেষ করতে পারি। 



বইমেলার স্মৃতি-৪

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

১৪ মার্চ ২৬

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ