ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তৃত প্রায় কবি জামিলা বেগমের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
কবি জামিলা বেগম ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গুণী কবিদের মধ্যে অন্যতম ও নারী কবিদের অগ্রজ। সত্তর বছরের বেশি সময় তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য কাজ করে গেছেন। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই গুণী কবি সম্পর্কে অজানা।
কবি জামিলা বেগমকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কবি ও গবেষক শ্রদ্ধেয় জয়দুল হোসেন। তাঁর ২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘সপ্তডিঙ’ নামক গ্রন্থে ‘জমিলা বেগম : একজন বিস্তৃত-প্রায় কবি’ প্রবন্ধে কবি জামিলা বেগমের জীবন ও সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। উল্লেখিত প্রবন্ধটির কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো।
কবি জামিলা ত্রিশের দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রকাশিত বীরেশ্বর ভট্টাচার্য ‘জয়ন্তী’ পত্রিকার লেখা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেন তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত ‘দরদী’ ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’, ‘পুষ্পপত্র’ ও ঢাকার ‘বেগম’ পত্রিকাসহ দুই বাংলার সেরা পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত লেখালেখি করতেন তিনি।
ষাটের দশকে কবি আসাদ চৌধুরী, লেখক আহমদ ছফা ও কথাশিল্পী মিন্নাত আলী কর্মসূত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলেন। জমিলা বেগমের সাথে তাঁদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এক সাথে সাহিত্যচর্চা করেছেন, সাহিত্যের সংগঠন গড়ে তুলেছেন। সংকলন প্রকাশ করেছেন, সুখে-দুখে পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
সত্তর ও আশির দশকে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তিনি মাসিক “মা” নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতেন। ১৯৬৯ সালে প্রথম প্রকাশিত পত্রিকাটি, ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। তারপর এটি সাপ্তাহিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে মাসিক 'মা' তখন সুধী মহলের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এ পত্রিকায় প্রথম যাঁরা লিখেছেন তাঁদের অনেকেই সাহিত্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
জমিলা বেগমের স্মৃতিচারণমূলক রচনা 'কালান্তরের ঢেউ' ধারাবাহিকভাবে ‘মা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অনেকেই আগ্রহভরে লেখাটি পড়েন এবং প্রশংসাও করেন। লেখাটিতে তৎকালীন সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। এ ছাড়া গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর আনন্দ-বেদনার চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর বিভিন্ন কবিতায়।
কবি জামিলা বেগম ১৯১৭ সালে বর্তমান কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার গাঙের কোট গ্রামে তিনি জন্য গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছমেন্দর আলী সরকার। ১৯৩২ সালে বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাস্থ কসবা থানার পানিয়ারূপ গ্রামে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী ওয়ালী আহাম্মদ সরকারের পদস্থ কর্মচারী ছিলেন। ১৯৮৫ সালে স্বামীর মৃত্যুর পরও জমিলা বেগম সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। চার ছেলে ও চার মেয়েসহ আট সন্তানের জননী জমিলা বেগম সাত দশকেরও অধিক সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌড়াইলে নিজস্ব বাসভবন 'পলাশবাড়িতে’ বসবাস করেছেন।
গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকেই তিনি এখানে ছিলেন। এ বাড়িটিকে ঘিরে সাহিত্য-সংস্কৃতির অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে—যা আজ বিস্তৃত প্রায়। এ বাড়ির সামনে বিস্তীর্ণ একটি মাঠ ছিল। এ মাঠে তখন বিভিন্ন সাহিত্য-অনুষ্ঠান হত। অনেক প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিক এখানকার অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। মাঠের এক পাশে একটি ছাপড়া ঘরে ছিল মাসিক 'মা' পত্রিকার অফিস এবং ছাপাখানা। এ মাঠ পরবর্তীতে একটি আধুনিক মার্কেট এবং সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছিল। ( উল্লেখ্য যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রয়াত খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী নিজাম ইসলাম কবি জামিলা বেগমের ছেলে।)
এক সাক্ষাৎকারে জমিলা বেগম বলেন, "আমাদের দেশ আমার মাতৃভাষা। এছাড়া আমার অন্য কোনো দেশ নেই। আমি বাংলা ভাষার সাতচল্লিশ অক্ষরে আমার সর্বস্ব সমর্পণ করেছি। এই পৃথিবী আর প্রকৃতিই আমার সাহিত্য। আমি যে দেশে বাস করি তার প্রধান নদীর নাম চেতনা। ভূখণ্ডের নাম অস্তিত্ব। আর আকাশ তো আকাশই। দিকচক্রবালব্যাপী শাশ্বত আকাশ। বাংলা ভাষার সাতচল্লিশটি অক্ষর ছাড়া আমার আর কোনো অলংকার নেই। এই সাতচল্লিশটি অক্ষরের শব্দের গভীরে বসে আমি দেখব সারা পৃথিবী।'
জামিলা বেগম তাঁর সত্তর বছরের সাহিত্য জীবনে তিনি প্রচুর কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন। সকল রচনা আজ আর কারও সংগ্রহে নেই। কিছু হারিয়ে গেছে, একাত্তরে কিছু লুট হয়ে গেছে, আর কিছু তিনি নিজেই বাতিল করে দিয়েছেন। বাকিগুলো নিয়ে তিনি তিনটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন, এর একটি কবিতার, 'ক্লান্ত পথিক', একটি গল্পের, ‘প্রান্তরেখা' এবং স্মৃতিচারণমূলক অন্য পাণ্ডুলিপির নাম 'কালান্তরের ঢেউ'। এ তিনটি পাণ্ডুলিপি গ্রন্থকারে প্রকাশ করতে না পারার বেদনা নিয়ে ২০০৪ সালে ১৬ মার্চ ৮৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আমরা এই মহিষী কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
মরহুম কবি স্মৃতির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর লিখিত একটি কবিতা এখানে উল্লেখ করা হলো-
বাংলার মায়া
জমিলা বেগম
সুদূর প্রান্তরে আমার কেটে যায় বহুদিন
কত বসন্ত শরত-সন্ধ্যা হয়েছে বিলীন।
তবু সেই নদীতট বটের ছায়া
ভুলিতে পারিনে আজো—;
বাংলার মায়া।
ক্লান্ত সমীরণ ভরা সেই নিরালা দুপুর
দূর হতে ভেসে আসা বাউলের সুর
পুরোনো দিনের গান, "শ্যাম বিনোদিয়ারে বন্ধু বিনোদিয়া”
মন আজো ঘুরে ঘুরে সেথায় ফেলে ছায়া।
বাংলার মায়া।
সেই বকুলতলায়, শ্মশান ঘাটের পাশে
শৈবালিনী মেয়েটি কি আজও হেথায় আসে?
নেচে নেচে করা তো ফুল, দুহাত ভরিয়ে
সে যে কি অমৃত সুখ
বাংলার মায়া।

0 মন্তব্যসমূহ