Ticker

6/recent/ticker-posts

বড় পাখির বড় রং, আন্ডা পাড়ার দেখো ঢং


‘পুরস্কার একজন লেখককে মহৎ করে না বরং লেখকই পুরস্কারকে মহৎ করিয়া তোলে’- এরকম অনেক ডায়ালগ অনেক গুণিজনদের দিতে দেখি। কথা ঠিকই আছে! তবে এসব কথা বড় লেখকদের বেলায় খাটে। ছোটোখাটো লেখকদের বেলায় খাটে না। ছোট লেখক বলতে আমাদের তৃণসাদৃশ্য লেখক নয়, বৃহৎ বড় লেখক। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দের মতো লেখক, যারা সকল পুরস্কারের ঊর্ধ্বে, পুরস্কার তাঁদেরকে মহৎ না করলেও তাঁদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট লেখকদেরকে কিছুটা হলেও মহৎ ও সম্মানিত এবং পরিচিত করে তোলে বিভিন্ন পুরস্কার।
আমাদের পরিচিত বলয়ের কোনো লেখক পুরস্কার প্রাপ্ত হলে আমরাও খুশিতে গদগদ হয়ে উঠি। ফলে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের নিয়ে আমাদের মনে আলাদা আগ্রহ ও সম্মানবোধ কাজ করে। আমরা যারা সাহিত্য-সংস্কৃতির বারান্দায় ঘোরাফেরা করি আমাদের কাছে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকরা হচ্ছে চাঁদ-তারার মতো উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা এবং সম্মানিত। বিশেষকরে রাষ্ট্রীয় বা একাডেমিক পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের আমরা বরাবরই যথেষ্ট সমীহ করেই চলি।
সমীহ করার কারণও আছে বইকী। টুকটাক লেখালেখি করতে গিয়ে বুঝতে পারি সাহিত্যচর্চা করা খুব সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে হয় না, অল্প পরিশ্রমও দিয়েও হয় না। যথেষ্ট জ্ঞান-মেধা এবং দীর্ঘ সাধনার পরেই একজন লেখক লেখক হয়ে ওঠেন। লেখকের এই যাত্রা খুব সহজ যে নয় তা বুঝতে পারি বলেই একাডেমিক পুরুষপ্রাপ্ত লেখকদের নিয়ে আমাদের মাঝে আলাদা আবেগ-আহ্লাদ কাজ করে।
(দুই)
বেশ কয়েক বছর যাবৎ লক্ষ্য করছি, আমাদের সেই আবেগ-আল্লাদে এক বালতি জল দিয়ে দেয় বাংলাদেশের একাডেমিক পুরস্কারের ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম অভিভাবক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। পুরস্কারপ্রাপ্ত যে লেখকদের আমাদের সম্মানের চোখে দেখার কথা, পুরস্কার প্রাপ্তির নাম ঘোষণা পড়েই তারাই হয়ে ওঠেন অসম্মানিত। পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন লেখকের লেখা যেখানে আরও বেশি চর্চিত হওয়ার কথা, সেখানে লেখকের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, বৈবাহিক, ধর্ম, বর্ণ, পেশা এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে নিয়ে বেশি চর্চা হয়। যা হওয়ার কথা ছিল না মোটেই।
আমার ছোট মুখ বড় কথা মানায় না। তারপরেও বিষয়টিকে আমি গোড়ায় গলদ হিসেবে দেখতে চাই। মানে গলদটা হচ্ছে ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়ার প্রথা। ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়া হয় বলেই ব্যক্তির জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়। কিন্তু পুরস্কার যদি ব্যক্তিকে না দিয়ে ব্যক্তির কর্মকে দেওয়া হতো তাহলে হয়ত সমালোচনা যথেষ্ট কমে যেত।
প্রতিবছর বইমেলা উপলক্ষে এবং বইমেলা ছাড়াও সারা বছর অসংখ্য বই বের হয়। সেসব বইয়ের মধ্যে যে-সব বই সাহিত্য মানে উত্তীর্ণ, সেই বই নির্বাচিত করে, নির্বাচিত বইকে পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন করতে হবে। এখন বই যেহেতু নিজে পুরস্কার নিতে আসবে না। সে ক্ষেত্রে পুরস্কার নিতে আসবেন সংশ্লিষ্ট বইয়ের লেখক অথবা তাঁর উত্তরসূরি।
কোনো গ্রন্থ পুরস্কৃত হলে সেই গ্রন্থ-এর প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে। কেন বইটি পুরস্কার পেল, কি ধরনের বই, কি লেখা আছে তাতে- তা জানতে চেষ্টা করবে সবাই। আলোচনা-সমালোচনা হলেও হবে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ নিয়ে। গ্রন্থের বিষয়, ভালো-মন্দ, ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে। লেখকের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নয়। প্রতিবছর গ্রন্থকে পুরস্কার না দিয়ে ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়া হয় বলেই দেশে পুরস্কার নিয়ে এত হইচই হয় বলেই আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক মনে করে।
একজন লেখক এক জীবনে নানা পেশায় সম্পৃক্ত থাকেন। একাধিক রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন। একাধিক বিয়ে-শাদি করেন। যে কোনো লেখকের দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার জীবনে অনেক চড়াই উৎরাই থাকে। লেখককে নিয়ে থাকে অনেক বির্তক। কেউ কেউ ধর্মেও পরিবর্তন করেন। ফলে সরলরেখায় লেখকের জীবন পরিচালিত হয় না। তাই ব্যক্তি লেখককে পুরস্কার দিতে গেলে যে কোনো লেখেই কোনো না কোনো মানদণ্ডে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন এবং সমালোচনাও থেমে থাকবে না। তাই ব্যক্তির বদলে ব্যক্তির কর্মকে পুরস্কার দিতে হবে। কর্মকে পুরস্কার দিলে সমালোচনা আনেকাংশে কমে যাবে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন এবং সাহিত্য প্রতিভা আলাদা নয় কি?
অবার অনেক সময় দেখেছি- একজন লেখক পুরস্কার পেলে তার দুর্বল কিছু লেখা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। কোনো লেখকের সব লেখাকাই যে শক্তিশালী ও সাহিত্যমানে উন্নীত হবে- এমন তো কথা নয়। প্রথম জীবনের সকল লেখকের লেখাই দুর্বল থাকে। পরবর্তীতে ক্রমাগত চর্চার মধ্যে দিয়ে শক্তিশালী লেখকে পরিণত হন। আবার অনেক লেখকের প্রথম জীবনে শক্তিশালী লেখা লিখলেও শেষ জীবনে ভালো লিখতে পারেন না- এমনটা গুরুজনদের বলতে শুনেছি। এখন পুরস্কার পেলেই যদি লেখকের দুর্বল লেখা সামনে আনা হয়, তাহলে তো এটা এক ধরনের অসম্মানই বটে। সেক্ষেত্রে লেখকের নির্বাচিত এক বা একাধিক বইকে পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করলে অন্য বইগুলো আর সমালোচনার জন্য আলোচনায় আসবে না। ফলে পুরস্কার হবে নির্ঝঞ্ঝাট- নিষ্কণ্টক।
নির্বাচিত গ্রন্থকে পুরস্কৃত করা হলে মানসম্মত বই প্রকাশের আগ্রহ বাড়বে লেখক এবং প্রকাশকদের মাঝেও। অনেক লেখকদেরকে দেখি নিজেকে বড় লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ক্রমাগত বই বের করতে থাকেন। কিন্তু তাদের লেখা পড়লে বোঝা যায় লেখাগুলো মানসম্পন্ন নয়। বইকে পুরস্কার দেওয়া হলে প্রতিটি লেখক-প্রকাশকগ মানসম্মত বই প্রকাশে আরও মনোযোগী হবেন।
নোবেল সাহিত্য পুরস্কার, বুকার পুরস্কার, পুলিৎজার পুরস্কার এবং নিউস্ট্যাড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজগুলো এই মানদণ্ডে দেওয়া হয় বলে জেনেছি। আমাদের দেশেই কেন ব্যতিক্রম? আর বাংলা একাডেমি একটি প্রতিষ্ঠান এবং তার পুরস্কার যেহেতু একাডেমিক পুরস্কার, সে ক্ষেত্রে ব্যক্তির একাডেমিক কার্যক্রমকেই পুরস্কৃত করা উচিত, ব্যক্তিকে নয়। সাহিত্য চর্চায় অবদান রাখার জন্য ব্যক্তিকে সম্মানিত করতে চাইলে সে ক্ষেত্রে পুরস্কার নয় বরং অনুদান দেওয়া উচিত।
(তিন)
আরেকটি কাজ করা যেতে পারে- কয়েক বছর আগে শ্রদ্ধেয় কবি আবু হাসান শাহরিয়ার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। যেখানে তো তিনি সারা বাংলাদেশের লেখকদের একটি তালিকা প্রকাশ করে পুরস্কার পেতে পারেন এমন অনেক লেখকের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। আমার মনে হয় এটিও একটি ভালো উদ্যোগ। বাংলা একাডেমি সারা বাংলাদেশেরই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য লেখকদের তালিকা প্রকাশ করতে পারে। সেটি ১০০ থেকে ১০০০ জনও হতে পারে। প্রত্যেকের নামের পাশে কে কোন গ্রন্থের জন্য পুরস্কার পাবেন, এরকম এক বা একাধিক গ্রন্থের নাম ও প্রকাশ করা যেতে পারে। তারপর সাহিত্য বোদ্ধা মানুষ যারা আছেন তারা সেই তালিকার নানা লেখকের গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করবেন। কয়েক বছরের আলোচনা-সমালোচনা পর্যবেক্ষণ করলেই করলেই বোঝা যাবে কাদের পুরস্কার দেওয়া যাবে এবং কাদের দিলে সমালোচনা হবে। অর্থাৎ পুরস্কার ঘোষণার আগেই সমালোচনা হয়ে গেলে পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার পর সমালোচনা সুযোগ কমে যায়।
পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য নির্বাচিত বই এবং তার লেখক তালিকা প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট বইগুলোর পাঠকীয়তা বৃদ্ধি পাবে, বইয়ের বিক্রি বাড়বে। ফলে লেখক ও প্রকাশনা সংস্থা উভয়ই লাভবান হবেন। এতে সংশ্লিষ্ট লেখকগণ পুরস্কার পেতে কয়েক বছর দেরি হলেও তিনি পাঠক সমাজে আলাদাভাবে সম্মানিত হতে থাকবেন। সর্বোপরি একটি ভালো বই পাঠকের হাতে পৌঁছাবে। তারপর একসময় যখন সেই বই এবং তার লেখকগণ পুরস্কৃত হবেন, তখন পাঠকই বলবেন যে, যথাযথ ব্যক্তিই পুরস্কার পেয়েছেন, এই বই আমি পড়ে দেখেছি, এটা ভালো বই।
রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও এই তালিকায় কোনো প্রভাব ফেলবে না। কেননা তখন আগে থেকেই বোঝা যাবে কোন সরকারের সময় কাকে পুরস্কার দিলে সমালোচনা হবে আর কাকে দিলে হবে না। কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের এই আইডিয়াটি কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রতিবছর সেই তালিকা আপডেট করাও যেতে পারে।
(চার)
কবিতা লেখার জন্য যদি পুরস্কার পাওয়া যায় তবে কবিতা লেখার জন্য পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হওয়া ব্যতিক্রম কিছু নয়। এতে কবির মহত্ত্ব কমে যায় না। বরং পুরস্কারের জন্য নাম মনোনীত করার আগে যাদের নিয়ে বিতর্ক হতে পারে এসব যারা মাথায় রাখেন না, তারাই এর জন্য লজ্জা পাওয়ার কথা। এক্ষেত্রে আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি গত কয়েক বছর যাবৎ বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এর আগেও নাকি একাডেমিক পুরস্কার নিয়ে নানা ঘটনা ঘটেছে।
একজন কবি কোন আদর্শ লালন করবেন- সেটি যেমন তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। তেমনি তিনি কোনো কবিতা লিখবেন বা লিখবেন না, সেটিও তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। আবার পুরস্কার যারা দেবেন, তারাও কাকে দেবেন, বা কাকে দেবেন না সেটিও সংশ্লিষ্ট সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু পুরস্কারের জন্য নাম ঘোষণা করে পুরস্কার না দেওয়া বা পুরস্কার প্রত্যাহার করা কখনোই উচিত নয়।–আবার কোনো দিক দিয়ে যোগ্য কিন্তু অন্য কোনো দিকে বিতর্ক হতে পারে এমন ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য নাম নির্বাচন করাও উচিত নয়।
প্রতিবছরের বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক একদিকে যেমন সম্মানিত সম্মানিত হন, অন্যদিকে অসম্মানিত হন। এতে আমরা বাংলাদেশের শত শত তরুণ লেখক আশাহত হই। ভবিষ্যৎকে অন্ধকার হিসেবে দেখি। এই অবস্থা পরিবর্তন হওয়া উচিত। পুরস্কার যারা পান আমরা তাদের সঙ্গে পরিচিত হই কিংবা না হই, আমরা তার লেখার সাথে পরিচিত হই বা না হই, তিনি আমাদের আদর্শের হন বা না হন, গুনি লেখক হিসাবে আমরা তাদের সম্মান এবং শ্রদ্ধা চোখে দেখি, দেখতে চাই। পুরস্কার যারা পান না তাদেরকেও আমরা সম্মান এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখি। কিন্তু বিতর্ক সৃষ্টি সুযোগ দিয়ে অশ্রদ্ধা করার অধিকার কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের থাকতে পারে না। বাংলা একাডেমিকে এই সম্মান-অসম্মানের এই খেলা বন্ধ করতে হবে। এর জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদানে হয়তো সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে নয়তো পুরস্কার প্রথা বাতিল করে দিতে হবে।
বিশ্বের বড় বড় সাহিত্য পুরস্কারগুলো ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না। ব্যক্তির সাহিত্যকর্মকে দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে কোনো লেখক পুরস্কার পেলে তিনি কোন বই-এর জন্য পুরস্কার পাচ্ছেন সেটি তার নামের পাশে উল্লেখ থাকে। অর্থাৎ একজন লেখক সারা জীবনের যত ভালো সাহিত্যকর্ম রচনা করুক কিংবা যত খারাপ রচনা করুক সবগুলো বই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয় না। বিবেচিত হয় বিশেষ একটি বই। তখন সহজেই অনুমান করা যায় যে, সংশ্লিষ্ট লেখক পুরস্কারের জন্য আসলেই যোগ্য কিনা। এজন্যই সাহিত্যের নোবেল বা বুকার পাওয়ার পরে একজন লেখকের সংশ্লিষ্ট বইয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। কারণ অনেকেই হয়তো সেই বইটি পড়েননি। সবারই আগ্রহ জাগে সেই বিশেষ বইতে কী আছে যার জন্য এত বড় পুরস্কার পেলেন তিনি। পুরস্কারের জন্য এরকম গ্রন্থ নির্বাচন করা হলে বিতর্ক অনেকাংশই কমে যাবে। বাংলাদেশে পুরস্কারের প্রদানের ক্ষেত্রে এরকম সিস্টেম যদি না আনা যায় তবে পুরস্কার দেওয়ার প্রথাই বাতিল করা করে দেওয়া যেতে পারে।
সে ক্ষেত্রে পুরস্কারের টাকা দিয়ে কিছু মানসম্মত পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করা যেতে পারে। দেশে অনেক লেখক রয়েছেন যারা টাকার অভাবে বই বের করতে পারেন না। এসব লেখকদের খুঁজে বের করে তাদের বই প্রকাশের উদ্যোগ নিলে রাষ্ট্রের টাকার যথাযথ সদ্গতি হবে। অন্তত বছর বছর পুরস্কার প্রদানের নামে লেখককে অসম্মান করার এই সিস্টেমটা চালু না থাকুক। বাংলা একাডেমি বড় প্রতিষ্ঠান, আগের মতো ক্ষুদ্র লোকের এসব নিয়ে কথা বলা মানায় না। তারপরও দুই একটি কথা বলে ফেললাম এজন্য যে আমরা আমাদের শ্রদ্ধেয় লেখকদের অসম্মান আর দেখতে চাই না।
কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের মহাপতঙ্গ গল্পে একটি বাক্য আছে- যুদ্ধবিমান থেকে বোমা পড়াকে ছোট চড়ুই পাখি ভেবেছিল মহাপতঙ্গ ডিম পাড়ছে। কিন্তু সেই ডিম (বোমা) ফেটে যখন প্রকৃতির সবকিছু ধ্বংস করে দিল, এমনকি পাখিটি নিজেও আহত হল- তখন চড়ুইপাখি ভাবে- এভাবে ডিম পেড়ে লাভটা কী? মাটিতে পড়ে ফেটেই তো গেল, তা দিয়ে বাচ্চা ফোটাতে পারল না আমাদের মতো। মহাপতঙ্গকে ডিম পাড়তে দেখে (বিমান থেকে বোমা পড়তে দেখে) পাখিটি ব্যঙ্গ করে বলেছিল- বড় পাখির বড় রং, আন্ডা পাড়ার দেখো ঢং’। ছোট্ট পাখির মতো আমিও বলতে চাই- এত বড় পুরস্কার ঘোষণা করে লাভ কি ? যদি লেখককে সম্মানই না দেওয়া যায়।
(পাঁচ)
এ বছর কবিতায় পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রদ্ধেয় কবি মোহন রায়হানের কবিতা আমি কখনো পড়িনি। এখন আমি পড়িনি বলেই তিনি বড় কবি নন, এটা ভাবার অবকাশ আমার নেই। আমাদের অগ্রজ কবিদের মুখে শুনেছি তিনি একসময় খুব ভালো কবিতা লিখতেন এবং বিপ্লবী কবিতা লিখতেন। আমরা সেটাই বিশ্বাস করে বসে আছি। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি কবিতা লেখেন না, বা লিখলেও আমাদের সামনে আসেনি বলে আমরা পড়তে পারিনি, এটি একদিকে আমাদের ব্যর্থতা। এমনকি পুরস্কারের জন্য তার নাম ঘোষণা হওয়ার পরও তারও কোনো কবিতা সামনে আসিনি। এসেছে পুরস্কার থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর। যে কবিতাটি নিয়ে তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি বলে গুঞ্জন উঠেছে সেই কবিতাটি পড়ার মাধ্যমে কবি মোহন রায়হানের কবিতার সঙ্গে পরিচিত হলাম। আমার মতো আরও অসংখ্য মানুষ নতুন করে প্রথমবারের মতো এই কবিতাটি পাঠ করেছে। কবিতার বিষয়বস্তুর সাথে সবাই একমত, নাকি দ্বিমত এটি যেমন আলোচ্য, তারচেয়ে বেশি আলোচ্য বিষয় হচ্ছে একটি মৃত কবিতার জীবিত হয়ে গেছে এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে। মৃত এজন্য যে, কবিতাটি দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল না। কবি পুরস্কার থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে এটি আলোচনায় এসেছে। একটি কবিতা লেখার জন্য একজন কবির পুরস্কার বাতিল হতে পারে- এটি চাট্টিখানি কথা নয়। ফলে কবিতাটি আগের চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী হয়েছে। এতে বোঝা যায়- একজন কবির কবিত্ব পুরস্কারের চাইতেও বড়। রাষ্ট্র কখনো কবি পুরস্কার দিতে পারে না, রাষ্ট্র যেটা পারে, সেটা হচ্ছে লেখকের পাশে দাঁড়ানো। বাংলা একাডেমি পুরস্কার কি প্রতিবছর লেখক এর পাশে দাঁড়াচ্ছে, নাকি লেখক থেকে সরে যাচ্ছে?প্রতিবছর বাংলা একাডেমি পুস্কার নিয়ে বিতর্ক ওঠা সেই প্রশ্নটিই নতুন প্রজন্মের লেখকদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এজন্যই বুঝি প্রখ্যাত লেখক-গবেষক-দার্শনিক ড. সলিমুল্লাহ খান বাংলা একাডেমমিকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘একটি খচ্চর প্রতিষ্ঠান হিসেবে’ (যদিও তিনি গত বছর আবার এই প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন, সেটি ভিন্ন বিষয়।)
(ছয়)
প্রতিবছর বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক ঘোষণার পর পর একদল লেখক উঠে পড়ে লেগে যান পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের নামে নানা বদনাম করার জন্য। লেখকের সাহিত্য মান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে কিন্তু তারা যখন লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক সামনে নিয়ে আসেন, তখন এতে স্পষ্ট হয় যে তারা মূলত ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকেই এই ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। আমি লক্ষ্য করছি যে, প্রতিবছর সাহিত্য পুরস্কার সমালোচনাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু কমন ফেস আছে। যেন পুরস্কার প্রাপ্ত লেখকদের অসম্মান করাই তাদের কাজ। কাকের মাংস কাকে খাওয়ার মতো অবস্থা। আমার পরিচিতর বাইরেও আরো এরকম লোক থাকতে পারে। এই ধরনের লোকদেরকে চিহ্নিত করে রাখা উচিত। আমরাও যেন ভবিষ্যতে দেখতে পারি সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে তারা কোন পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। সম্প্রতি ওঠা বিতর্কের প্রেক্ষাপটে শ্রদ্ধেয় কবি মজিদ মাহমুদের পোস্ট থেকে জানতে পারলাম, তাকেও একবার বাংলা একাডেমির মঞ্চে ওঠা থেকে বঞ্চিত করেছিলেন এক ধরনের উৎসাহী লেখক। এখন তারা নাকি কেউ আর সাহিত্য পাড়ায় আলোচনায় নেই। প্রত্যেক বছর একাডেমি পুরস্কার নিয়ে সমালোচনাকারীদের তালিকা চিহ্নিত করা থাকলে ভবিষ্যতে আমরাও দেখতে পেতাম ভবিষ্যতে তারা আলোচনায় থাকে কি না।
(সাত)

যে কথার যায় না বলা, তা অব্যক্তই থাক।
--
বড় পাখির বড় রং, আন্ডা পাড়ার দেখো ঢং
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
২৬ ফেব্রুয়ারি ২৬

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ