বাড়ির উঠান কিংবা স্কুলের আঙিনা যখন শিশুদের নানা পারফরমেন্সের মঞ্চ হয়ে ওঠে, তখন ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’ প্রবাদটি আর কার্যকর থাকে না। তখন উঠান হয়ে ওঠে একটি রঙিন মঞ্চ, যেখানে শিশু ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করে, গান গায়, হেলে দুলে নেচে ওঠে বাংলা গানের সুর-তালে। কারো কণ্ঠে আবার আজান, সুরা-কেরাত কিংবা হামদ-নাত পরিবেশিত হয়। ‘বিশ্ব-জোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’ মন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে জীবনকে রঙিন করার অভিপ্রায়ে ভালো ছেলে-মেয়ে হতে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হতে চেষ্টা করে তারা। আর তাদের সেই চেষ্টায় অন্ধকারের নদীতে আলোর বৈতরণি হয়ে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন এন্ড প্র্যাকটিসেস (সিদীপ)।
সম্প্রতি সিদীপ আয়োজিত শিশুদের অংশগ্রহণে এমন একটি অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ হয়েছে আমার। সিদীপের গবেষণা ও প্রকাশনা কর্মকর্তা মো. মাহবুব-উল-আলম ভাইয়ের আমন্ত্রণে এক বিকেলে পৌঁছে যাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামে অবস্থিত ইউনুছ মোল্লা কিন্ডার গার্টেন স্কুলের আঙিনায়। সেখানে গিয়ে দেখি ছয় সাতটি বেঞ্চে সেজেগুঁজে বসে আছে কিছু ফুল, কিছু পাখি। কেউবা এসেছে আবার সাধারণ পোশাকেই। তারা সবাই এই স্কুল অথবা আশেপাশের আরো অন্য কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী। যারা সবাই আবার সিদীপ পরিচালিত উঠোন শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষার্থী।
সিদীপের উঠান শিক্ষা কার্যক্রমের এই বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত হয় বিশেষ এই অনুষ্ঠান। যেখানে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা কবিতা আবৃত্তি, গান, নাচ, গজল ইত্যাদি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। স্থানীয় কোনো বাড়ির উঠোন কিংবা কোনো স্কুলের আঙিনায় এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এর জন্য কোনো মঞ্চ বা প্যান্ডেল নির্মাণ করা হয় না। ছোট ছোট শিশুরা সুসজ্জিত মঞ্চ বা জাঁকজমকপূর্ণ প্যান্ডেলকে সাধারণত ভয় পায়। উচ্চ মঞ্চে মন খুলে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে না। বাড়ির যে উঠোন তার নিত্য খেলার জায়গা- সেই উঠোনে নিজেকে মেলে ধরতে তার মনে আর সংকোচবোধ কাজ করে না এবং তারা তাদের ভেতর লুকিয়ে থাকা সুকুমারবৃত্তির প্রকাশ ঘটাতে পারে।
দেখলাম- একজন শিশু এসে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করলো এবং তার তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের কর্মসূচি শুরু হলো। তারপরে একে একে কেউ গাইলো, কেউ আবৃত্তি করল ‘আমাদের ছোট নদী’, ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’সহ জনপ্রিয় সব ছড়া। ‘বসন্ত বাতাসে সইগো’, ‘রেশমি চুড়ি’ ইত্যাদি জনপ্রিয় লোকসংগীত কিংবা আধুনিক গানের সঙ্গে নেচে উঠলো কেউ। কেউ আবার একাধিক বিষয়ে অংশগ্রহণ করল। সাধারণ ছোট একটি মাইক্রোফোন হাতে কেউবা আবার খালি গলায় নিজেদের পরিবেশনা উপস্থাপন করেছে। কিছুটা শুদ্ধ কিছুটা অশুদ্ধ উচ্চারণ, কিছুটা ভুলভাল বাক্যে এবং সুর-বেসুরে তাদের পরিবেশনাগুলো মিকি মাউস, মিস্টার বিন কিংবা টম জেরির হাস্যরসাত্মক কাজের মতোই আনন্দদায়ক। কবি আহসান হাবীবের বলা রূপকথার সেই মজার রাজ্য যেন এক একটি উঠান বা মঞ্চ- “খেলাঘর পাতা আছে এই এখানে, স্বপ্নের ঝিকিমিকি আঁকা যেখানে। এইখানে আমাদের মানা কিছু নাই, নিজেদের খুশি মত কাহিনী বানাই।”
শিশুদের পরিবেশনার পাশাপাশি চলছিল প্রতিযোগিতা, অর্থাৎ তারা স্বাধীনভাবে বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করছিল তখন তাদের শিক্ষিকাগণ কার কোন বিষয় ভালো হয়েছে সেই বিষয়ে নাম্বারিং করছিল। পরিবেশনা শেষে দ্রুত সময়ের মধ্যেই পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। পুরস্কার বিতরণের আগে ছিল সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা। যেখানে সিদীপের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে আমাকে পরিচয় করে দেওয়া হয় একজন শিশুসাহিত্যিক হিসেবে। আমার বক্তব্যে আমিও কিছুক্ষণের জন্য শিশু হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। এ আয়োজনের অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত একটি দিক ছিল- আর তা হলো স্থানীয় দুজন প্রবীণ ব্যক্তিকে ফুল বরণ ও সম্মাননা জানানো। অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিশুরা স্থানীয় একজন প্রবীণ নারী এবং পুরুষকে ফুলের মালা পড়িয়ে অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে বরণ করে নেয়। বাবা মা শিক্ষক-শিক্ষিকা কিংবা বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের মান্য করা এবং তাদের কথা অনুযায়ী চলার জন্য শিশুদের অনুপ্রেরণামূলক এই কার্যক্রমটি ক্ষুদ্র হলেও এর দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রভাব সিদীপের অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী চিন্তাপ্রসূত একটি কার্যক্রম বলে আমার মনে হয়।
সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন এন্ড প্র্যাকটিসেস (সিদীপ) একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনা তাদের প্রধান কার্যক্রম হলেও শুধু অর্থনৈতিক কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই প্রতিষ্ঠানটি। দেশপ্রেম, মানবতাবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা নিয়েছে বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে দেশের শিক্ষা, পাঠাগার, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য উন্নয়ন বিষয়ক কার্যক্রম। এছাড়াও নিয়মিত ‘শিক্ষালোক’ নামে একটি শিক্ষা বিষয়ক বুলেটিন প্রকাশিত হয় তাদের।
দরিদ্র শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় সহায়তা প্রদানের পরিচালিত শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় দেশের ২০টি জেলার প্রায় ২০০০ এর উপর গ্রামে ৩০৫৫টি শিক্ষাকেন্দ্রে বর্তমানে প্রায় ৬৩০০০ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। শিশু থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা নামমাত্র ফি (৫০-১০০ টাকা) দিয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অনেকে আবার বিনামূল্যেও পড়ছে। এখানে যারা পড়ান তারা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই মহৎ কাজের সঙ্গী হয়েছেন। প্রতিষ্ঠান থেকেও তারা খুবই স্বল্প সম্মানী প্রাপ্ত হন। গ্রামের নারীদের মধ্যে যারা স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করছেন কিংবা কোনো কারণে লেখাপড়া বন্ধ রয়েছে অথবা বাড়ির গৃহিণীরা শিক্ষিকা হিসেবে এখানে যুক্ত হতে পারেন এ কার্যক্রমে।
স্কুলের শিশুদের ঝরেপড়া রোধ ও জ্ঞান বিতরণে সিদীপের এই কার্যক্রম নিঃসন্দেহে একটি মহতী উদ্যোগ। ২০ বছর ধরে নীরবে-নিভৃতে “কোনো গাঁয়ে কোনো ঘর, কেউ রবে না নিরক্ষর” এই স্লোগানে বাংলার ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি। তাদের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে এসেছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীরাও। সিদীপ পরিচালিত এসব স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক আয়োজনে অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আর্থিক সহযোগিতা সেই কথাই প্রমাণ করে। একদিনের দেখা ও শেখার সে আয়োজন আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। সিদীপের শিশু শিক্ষার এই কার্যক্রম সত্যিই যেন কবি আহসান হাবীবের সেই রূপকথার খেলাঘর।
আজকের লেখা শেষ করতে চাই একটি স্বরচিত ছড়া দিয়ে।
উঠান মঞ্চ
উঠোন আমার লেখার খাতা
উঠোন আমার বই
উঠোন আমার মায়ের আঁচল
মায়ায় বেঁধে রই।
উঠোন বাবার কাজের জায়গা
উঠোন খেলার মাঠ
উঠোন থেকেই শুরু আমার
বিশ্ব ভ্রমণ ঘাট।
উঠোন দাদার গল্পের আসর
উঠোন ভরা ধান
উঠোন আমার বিশ্ব মঞ্চ
গাই কবিতা গান।
উঠোন দেখায় সূর্য আমায়
উঠোন দেখায় চাঁদ
উঠোন থেকেই চলতে শেখা
বাধার গিরিখাত।
আয়রে শিশু অবুঝ সবুজ
হাঁটি হাঁটি পা
উঠোন থেকেই বিশ্ব মঞ্চ
সবাই চলে যা।
--------
উঠান যখন মঞ্চ
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
শিক্ষালোক (জানুয়ারি-এপিল ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত পৃষ্ঠা : ২০-২১।



0 মন্তব্যসমূহ