যুদ্ধ-লড়াই বা আন্দোলন-সংগ্রামের মহত্ত্ব জয়-পরাজয়
কিংবা আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে নির্ধারিত হয় না। পৃথিবী কত বীর, কত যোদ্ধা কিংবা সাধারণ
মানুষ আছেন যারা পরাজিত হয়েও মহত্ত্বের খ্যাতি পেয়েছেন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা তার প্রকৃত
উদাহরণ। অসংখ্য যুদ্ধ-লড়াই, আন্দোলন-সংগ্রাম আছে যেগুলোতে আহত-নিহতের সংখ্যা অনেক কম
কিন্তু তা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। মানুষের মহত্ত্ব নির্ধারিত হয়- কে সত্য ও নায়ের পক্ষে
আছে, নিজ দেশ-জাতির পক্ষে আছে, মানবতার পক্ষে আছে বা নেই- সেই অবস্থানের উপর।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তেমন একটি সংগ্রাম যেখানে নিহত সংখ্যা মাত্র ১০-১২ জন। ধারণা করা হয় সর্বমোট চল্লিশজন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও মহত্ত্ব অনেক। কারণ এই আন্দোলন ছিল মায়ের ভাষার কথা বলার জন্য। এই আন্দোলন ছিল একটি জাতিকে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করার জন্য, এই আন্দোলন ছিল জাতি হিসেবে আত্মসচেতনার উন্মেষের আন্দোলন।
ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পরও যখন এই দেশের একদল মনে করেন যে, ‘ভাষা আন্দোলন ভুল ছিল, ভাষা আন্দোলন ছিল ভারতের ষড়যন্ত্র কিংবা পাকিস্তানিরা আমাদের মাতৃভাষা কেড়ে নিতে চায়নি, সেটা ছিল দুই পক্ষের ভুল বোঝাবুঝি’, তখন আমরা বুজতে পারি যে, ভাষা আন্দোলন সফল না হলে এত দিন আমাদের প্রাণের বাংলা ভাষা হারিয়ে যেত ভিনদেশি নানা শব্দ ও ষড়যন্ত্রের আড়ালে।
সাথে এটাও বুজতে পারি যে, মহান ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি। কেননা আমরা এটা দেখতে পাই যে, যে বিদেশি শব্দগুলোর বিপরীতে ভালো এবং প্রচলিত বাংলা শব্দ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও দেশের কিছু সংখ্যক জনগোষ্ঠী তাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় এখন আরবি, উর্দু, ফারসি, হিন্দি এবং ইংরেজি শব্দ বলতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
আমরা জানি বাংলা ভাষায় একটি মিশ্র ভাষা। এই ভাষায় প্রচুর বিদেশি শব্দের প্রবেশ এবং অনুপ্রবেশ রয়েছে। এবং সেই শব্দগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে ব্যবহার করি। কিন্তু উদ্দেশ্য মূলকভাবে নয়। উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাংলা ভাষার প্রচলিত শব্দ পরিবর্তে বিদেশি শব্দের ব্যবহারকে আমি ‘ভাষা সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে চাই। তাই বিদেশি ভাষা ব্যবহার দূষণীয় না হলেও কেউ যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচলিত দেশীয় কোনো শব্দের পরিবর্তে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করে তখন তা অবশ্যই দূষণীয় এবং দোষণীয় হবে বলে আমি মনে করি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি বিদেশি শব্দ ব্যবহারের বিরোধী নয় বরং আমি নিজেও বিভিন্ন লেখায় প্রচুর আরবি, উর্দু, হিন্দি এবং ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি এবং তা লেখার প্রয়োজনীয়তা এবং চাহিদা অনুযায়ীই করি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে নয়।
ছোটোবেলায় পাঠ্য বইয়ে ছড়া-কবিতা বা গদ্যে আমরা ‘জল’ এবং ‘পানি’ দুটি শব্দই পাঠ করেছি। কিন্তু ব্যবহার করার বেলায় ‘মুসলিম’ শিশুরা ‘পানি’ এবং ‘হিন্দু’ শিশুরা ‘জল’ শব্দটি ব্যবহার করতে হয়েছে। একজন মুসলিম শিশু হিসেবে আমি এটা অনেকের কাছে অনেকবার শুনেছি যে, ‘পানি’ শব্দটি মুসলমানদের এবং ‘জল’ শব্দটি হিন্দুদের। (যদিও তারা জানতেন না যে ‘পানি’ শব্দটি মুসলিম ভাষা হিসেবে পরিচিত আরবি, উর্দু বা ফারসি ভাষার শব্দ নয় এবং এটি সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত হিন্দি ভাষার একটি শব্দ)
কোনো কারণে ‘পানি’কে ‘জল’ বলেই বড়োদের (মুরুব্বি এবং হুজুর প্রকৃতির লোকের কাছে) প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। তারপর কথা কথা বলার ক্ষেত্রে ‘পানি’ শব্দটিতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। কিন্তু সাহিত্য চর্চার শুরুর পর থেকে ‘জল’ আর ‘পানি’র মধ্যে পার্থক্য বা আলাদা করিনি। বরং দুটো শব্দই ব্যবহার করেছি, এখনো করছি। যে লেখাতে যেটির প্রয়োজন হয়, সেটিই ব্যবহার করছি। হিন্দু বা মুসলিম শব্দ হিসেবে তাকে আলাদা করছি না। বেশি বা বিদেশি শব্দ হিসেবে একটিকে গ্রহণ, বা বর্জন করছি না। কিন্তু আমি যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘জল’ ব্যবহার না করে ‘পানি’ ব্যবহার করি অথবা পানি ব্যবহার না করে ‘জল’ শব্দ ব্যবহার করি তা অবশ্যই নিন্দনীয়।
আমার বড়ো কন্যা তাসফিয়া তার ছোটোবেলায় ‘মাম’, ‘পানি’ এবং ‘জল’ তিনটি শব্দই ব্যবহার করেছে। সে খাবার পানকে বলত ‘মাম’, দৈনন্দিন ব্যবহারের পানিকে ‘পানি’, আর নদী বা পুকুরের পানিকে বলত ‘জল’। এখন অবশ্যই সবকিছুতেই ‘পানি’ বলে। কখনো সখনো ‘জল’ বললে আমরা বাধা দেই না, যে বাধা ছোট বেলায় আমার পেয়ে এসেছি।
‘মা’ এবং ‘আম্মা’ শব্দই আমাদের দেশে খুব বহুল প্রচলিত দুটি শব্দ। এ দুটি শব্দের মধ্যেও যথারীতি হিন্দু-মুসলিম ট্যাগ রয়েছে। যারা ‘মা’ কে ‘মা’ ডাকে তাদের ‘আম্মা’ ডাকতে বাধ্য করা কিংবা যারা ‘আম্মা’ ডাকে তাদেরকে ‘মা’ ডাকতে বাধ্য করা যেমন অনুচিত, তেমনিভাবে অনুচিত অন্যান্য বিদেশি শব্দগুলোকে জোর করে ব্যবহার করার জন্য।
তাই আজ যারা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলতে চায় তাদের তা-ই বলতে দিন, যারা ‘বিপ্লবী দীর্ঘজীবী হোক’ বলতে চায় তাদের তা-ই বলতে দিন, কিংবা যারা ‘জয় বাংলা’ বলতে চায়, তাদের তা-ই বলতে দিন।— এতে করে প্রত্যেকে একদিকে যেমন নিজের পছন্দমতো ভাষায় কথা বলা স্বাদ উপভোগ করবেন অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যেকের আত্মপরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
মোট কথা : ভাষার ব্যবহার হবে স্বাচ্ছন্দ্যে, মাধুর্যতায় সাথে এবং সম্মানের সাথে। উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে, চাতুর্যতার আশ্রয় নিয়ে কিংবা জোরজবরদস্তি করে যা বলাতে চাওয়া হয় তা হবে ‘ভাষা সন্ত্রাস’, সেটি যে ভাষারই হোক, যে দেশেরই হোক, যে ধর্মেরই হোক। ৫২ সালের আমাদের বীর জনতা এই ‘ভাষা সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধেই সোচ্চার হয়েছিল। প্রথমে ‘রাষ্ট্রীয় ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ এবং পরবর্তীতে ‘সাংস্কৃতিক ভাষা সন্ত্রাসীর’ বিরুদ্ধে। ‘রাষ্ট্রীয় ভাষা সন্ত্রাসী’র বিরুদ্ধে লড়াইটি বায়ান্নতে শুরু হয়ে একাত্তরে শেষ হয়ে গেলও ‘সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে লড়াইটি এখনো চালু রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক বলেই মনে হচ্ছে।
তার জন্য দায়ী দেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পর্যন্ত সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ না হওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে দেশীয় সাংস্কৃতিক চর্চাগুলো বিলুপ্তি বা বাধা প্রাপ্ত হওয়া এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বাংলার ভাষার প্রচলন না হওয়াই অধিকাংশ দায়ী বলে আমি মনে করি।
জোর জবরদস্তি নয়, ভাষা হোক স্বাচ্ছন্দ্যময়, ভাষা হোক উন্মুক্ত। তাই আসুনই- ভাষার মাসে, ভাষা দিবসে, ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। মাতৃভাষার চেতনায় উজ্জীবিত হই।
সকল ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা, মহান ভাষা দিবস অমর হোক।
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
৩১ জানুয়ারি-২১ ফেব্রুয়ারি ২৬
ছবি লোকেশন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ-২০১৪

0 মন্তব্যসমূহ