Ticker

6/recent/ticker-posts

অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা : আসাদ চৌধুরী


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হিরন্ময় তারকা অধ্যাপক একেএম হারুনুর রশীদ স্যারের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। অধ্যাপক একেএম হারুনুর রশীদ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে একজন কবি, গীতিকার, সুরকার, নাট্যনির্মাতা, নাট্য অভিনেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, একাত্তরের এক শব্দসৈনিক, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন শিক্ষক। হারুনুর রশীদ স্যারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছিলেন তাঁর সহকর্মী, দেশবরেণ্য কবি আসাদ চৌধুরী। দুই জনই আজ প্রয়াত। তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে হারুন স্যারকে নিয়ে আসাদ চৌধুরী স্যারের লেখাটি পোস্ট করা হলো। লেখাটি কবি জয়দুল হোসেন সম্পাদিত ‘এ কে এম হারুনুর রশীদ স্মারক গ্রন্থ’ থেকে সংগৃহীত।


অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা : আসাদ চৌধুরী


ঘাড়ে ট্রাকশন বেঁধে লেখা যে কষ্টকর তা-ই নয়, রীতিমতো বিরক্তিকরও। অথচ যা পারি যতোটুকু পারি লিখতেই হবে। সাহিত্য একাডেমীর প্রীতিভাজন জয়দুল হোসেন আবার দিলারা হারুনের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন যে তিনি অসুস্থ, তাই কথা বলতে বলতে যদি খেই হারিয়ে ফেলি, পুনরাবৃত্তি ঘটে পাঠক/পাঠিকা আমাকে ক্ষমা করবেন।


দীর্ঘদেহী একহারা ছিপছিপে শরীর, প্যান্ট আর শার্ট পরতে ভালোবাসতেন, পাজামা-পাঞ্জাবিও পরিধান করতেন, টেরি করে চুল আঁচড়াতেন-এ তো গেল বাইরের কথা তাঁর ভিতরে অসম্ভব কল্পনাপ্রবণ সৃজনশীল মনের অধিকারী ছিলেন। তিনি। আধুনিক, নজরুল এবং লোকসংগীত গাইতেন। আমি অবশ্য তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ‘আমারও পরাণ যাহা চায় তুমি তাই'- এই গানটি শুনতে চাইতাম। নিজে গান লিখতেন, দরকার হলে একরাতে ৩/৪টি গান রচনা করা, সুর সংযোজন সমেত, তাঁর কাছে ডাল-ভাত ছিল। কবিতা লিখতেন, ছড়া লিখতেন, নাটক লিখতেন, নাটক করতেন। প্রচুর হাসতে পারতেন, যাকে বলে হো হো করে হাসা, ঠাট্টা-তামাশা করতে ভালোবাসতেন, সব মিলিয়ে মাইকেলি মেজাজের মানুষ। এমন লোক অধ্যাপক হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করবেন— এটাই তো স্বাভাবিক। মহান ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তিনি ছিলেন অনাপোসী মনোভাবের। কৃষক-শ্রমিকের ভাগ্যোন্নয়নের কথা বলতেন সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির দ্বারা, পরে বেশ পরে, সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ লক্ষ্য করেছিলাম।


আমি অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদের কথাই বলছি-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোনো পাঠক তা যদি এখনো না বুঝে থাকেন তবে অনুরোধ বাকী লেখা না পড়লেও চলবে। না, না রেগে যাইনি তবে একটু খানি....।


দিলারা আমার ছাত্রী, হারুন আমার সহকর্মী, তবে তিনি আমার ছোটবোনের সহপাঠীও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একসঙ্গে পড়েছেন। ঢাকায় গেলে আমার বোন তাঁর খোঁজখবর নিতেন। আমরা একসঙ্গে অনেক বছর কাটিয়েছি। একদিনের জন্যও তাঁর সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়নি, মনোমালিন্য হয়নি, তার কারণ আমরা পরস্পর পরস্পরকে বিশ্বাস করতাম, শ্রদ্ধা করতাম। অনেক রকমের উস্কানি আমরা অবলীলাক্রমে উড়িয়ে দিতে পেরেছিলামও এসব কারণেই। 



মনে পড়ে, দিলারাই জানিয়েছিলেন তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে যোগদান করতেন চান। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনকে বলেও রেখেছিলেন। আমার কাছে আবেদনপত্রগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হলো, আ রে, হারুন সবুজ কালিতে আবেদন করেছেন, কোথাও পাশের সন উল্লেখ করেননি। আমি একটা সবুজ কালি কিনে দিলারাকে জিজ্ঞেস করে নিজের হাতে সন বসিয়ে দিয়েছিলাম। না, তদবিরের জন্য নয়, নিজের যোগ্যতায় হারুন বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করল। প্রায় একই সঙ্গে আল আমিন চৌধুরী, আনোয়ারউল্লা চৌধুরী, নীরুকুমার চাকমা, পদার্থ বিজ্ঞানে ইকবাল সহ আরোও অনেকে। বাংলা বিভাগের মধ্যমণি হরলাল রায়, আমি তাঁকে এবং ব্রজেন্দ্রকুমার দাসকে দাদা ডাকতাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের তুমুল নামডাক! আবু তাহের ইন্টারমিডিয়েটে কুমিল্লা বোর্ডে প্রথম হয়েছেন খ্যাতির মুকুটে বাড়তি অলক গুঁজে দিয়েছেন।


উল্লেখ করতেই হয় সে-সময় মধ্য ষাটে মিয়া ফুল মোহাম্মদ, সুনাল সূত্রধর, ওস্তাদ গজেন্দ্রনাথ রায়, ওস্তাদ উমেশচন্দ্র রায়- যেমন রাগসঙ্গীতে, তেমনি গৌরাঙ্গ দাস(?) নেপাল কর, জুলফিকার, ছায়া রায়, সুমিত্রা ভট্টাচার্য, শিরিন আক্তার, সিদ্দিক মিয়া, ফিরোজ আহমদের মতো কণ্ঠশিল্পী। চেমন আরা, সালমা খানও সে সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ওস্তাদ আফজালুর রহমান তখন থেকেই টেলিভিশনে সরোদ বাজাতেন। সুবল দাসের মতো জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক (বাংলা, উর্দু ছায়াছবির) মাঝে মধ্যে আসতেন। প্রাণতোষ চৌধুরীর কল্যাণে সে সময় তার বাসায় গিয়ে শকুনতলা দাসের গান শুনতাম। শকুনতলা একটি সিনেমায় কণ্ঠ দিলেও কোনো অনুষ্ঠানে তার গান শুনিনি। মানিক মিয়ার মতো ইভেন্ট স্পেশালিস্টও তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সংগীত সংসদ, পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিল ছাড়াও তিতাস সাহিত্য পরিষদই বা কম কীসে সে সময়। ষাটের প্রায় শেষদিকে জাগরণ, সাপ্তাহিক তিতাস তখন সবেধন নীলমণি। হারুন এসেছে আর জয় করেছে। তাকে কখনো হারমোনিয়াম বাজাতে দেখিনি। বলতেন বাজাতে জানি না। আমার কখনো বিশ্বাস হয়নি।



তবে, হ্যাঁ তবে একটু চোখ ধাঁধানো হারুনের অনুরোধে তাঁর পিতার সঙ্গে আমার অনেক কথা হলো। কিন্তু তিনি অনড়। বাপকা বেটা হারুনও। আইউব বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী, কণ্ঠশিল্পী দিলারা বেগমের বেগম কাটা পড়ল, হলেন হারুন। 


ছয় দফা, এগারো দফা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে এদের যে ভূমিকা তার তুলনা হয় না। পরবর্তীকালে দিলারা অবশ্য সংসদ সদস্য হয়েছিলেন, পিছুটান না থাকলে দিলারার তো অনেকদূর এগিয়ে যাবার কথা ছিল। যোগ্যতা ও আন্তরিকতার অভাব ছিল না তাঁর। 


মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে আমি চর্কির মতো ঢাকা, চট্টগ্রাম, মুন্সিগঞ্জ, বরিশাল, আগরতলা, কলকাতা চষেছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে হারুনের সম্পৃক্তির কথা আমি তাঁর মুখে শুনেছিলাম। জয়দুল হোসেনের ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া'তে এই প্রসঙ্গটি আরো বিস্তারিত এলে ভালো হত। কি কষ্টের মধ্যে তারা সে সময় কাটিয়েছিল সে তো আমি জানি। বিজয় অর্জনের পর আমার ঘরটি লুট হয়ে যাওয়ায় আমি হারুনদের সঙ্গেই মাস কয়েক কাটিয়েছি-না, তাদের সেই ত্যাগের তুলনা হয় না। হারুন মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প মোটিভেটর ছিলেন। 


আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার কথা বলি। আমার বিয়েটা হয়েছিল দিলারা এবং হারুনের জন্যই। ঘটকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন মিনু ভাই, মিন্নাত আলী স্যার। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্পর্কে লিখতে গেলে আমি ভীষণ কষ্ট পাই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আমার প্রথম প্রেম। আমি একটি লেখায় দাবি করেছিলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হোক। হারুন লুফে নিয়েছিলেন আমার প্রস্তাবনা, আমরা বাঙালিরা সমৃদ্ধ-সংস্কৃতির অধিকারী। পাকিস্তানি শোষকরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে গুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, সে চেষ্টা এখনো দেশে প্রকটভাবেই আছে। নইলে যশোর উদীচীর অনুষ্ঠানে, ছায়ানটের পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমাবাজি হয়? জঙ্গিরা বাঙালি সংস্কৃতিকে নিঃশেষ করতে চায়। হারুন এ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। মাঝেমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গেলে আমরা সাহস বিনিময় করতাম। দেখতাম তাঁর চোখ চিকচিক করছে। 


ঠিকই করেছিলেন তিনি। তাঁর অনুরোধে আমি গিয়েছিলাম সুলতানপুর ফিরোজুর রহমান রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে। আমি অবাক হয়েছি তিনি কত দক্ষ প্রশাসক, কী দায়িত্বশীল অধ্যক্ষ। ছাত্রদেরকে হারুন শৃঙ্খলা শেখাচ্ছেন, ভাবতেই হাসি পাচ্ছিল। তবে আমি আমার স্বল্প শিক্ষক জীবনে একটি বড় সত্য শিখেছি যে, ছাত্রদের কাছে প্রচুর শেখার আছে। তিনি স্বাপ্নিক। নতুন মানুষ গড়তে চেয়েছিলেন। সোনার বাংলাদেশের জন্য হীরের টুকরো তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তাঁর আন্তরিকতার অভাব ছিল না।


আর ভাবছি না যাদের সঙ্গে মিশতাম, তারা একে একে চলে যাচ্ছেন। ডা. চন্ডিপদ চক্রবর্তী, ডা. ফরিদুল হুদা নেই, ডা. জে আমিন নেই, ধীরেন দা নেই, (আবুল) মোমেন স্যার নেই, জাহাঙ্গীর ভাই তো শহীদ হয়ে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন, হারুনই সে দায়িত্ব যতটুকু পারে পালন করে গেছেন। হারুনের মতো সংস্কৃতিকর্মীরাও।


ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাঁর ক্ষেত্রটুকু ছোট হয়ে এসেছিল। ঢাকায় এসেছিলেন অনেক দেরিতে। অত্যন্ত শৌখিন, নিজে বাজার করতেন, ঢাকায় এসে মেলা তদবির করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিরে গিয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন থাকা-খাওয়ার কষ্ট সহ্য হয়নি।


জয়দুল হোসেন ঠিকই তাঁর মৃত্যু সংবাদ দিয়েছিলেন। জানাজায় শরিক হতে বলেছিলেন। দিলারার মোবাইল নাম্বারও দিয়েছিলেন কিন্তু কিছুই হয়নি। যেতেও পারিনি, যোগাযোগও রাখতে পারিনি। আমিতো সেই একজন ভাঙাচুরা মানুষ। এই লেখা যিনি পড়বেন তার কাছে বিনীত অনুরোধ বিদ্রোহী রণক্লান্ত হারুনুর রশীদের জন্যে দোয়া করবেন। তিনি যেন শান্তি লাভ করেন। দিলারা যেন সব শোক সহ্য করে আবার স্বামীর অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শুধু দিলারা নয় অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন সংস্কৃতিকর্মীরা। 


মানুষ মরণশীল, কিন্তু এ কে এম হারুনুর রশীদ বেঁচে থাকবেন তাঁর ভক্ত শ্রোতাদের কাছে, পাঠকের কাছে, আর তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে। 


লেখক : আসাদ চৌধুরী, কবি ও টিভিব্যক্তিত্ব।

সূত্র:  এ কে এম হারুনুর রশীদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনা : জয়দুল হোসেন, পৃষ্ঠা ২০-২৩।


—-শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ (সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মী)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ