সন্ধ্যা নামার আগে ফিরতে হবে বাড়ি, ঢুকতে হবে গোয়ালঘরে। তাই রাখালকে অনুসরণ করছে একপাল গরু। রাস্তা পাকা হওয়ায় তাদের খুরে ধুলো না উড়লেও মুহূর্তটি ছিল গোধূলিবেলা। পায়ে পায়ে কটকট শব্দ তুলে এগিয়ে চলছে তারা। লতাপাতা ছুঁয়ে রাস্তার ঢাল নেমে গেছে ফসলি জমির আলের পাশে।
কখনো ভারী, কখনো মৃদু বাতাসে দুলে উঠছে লতাপাতার ঝোপ থেকে উঁকি দেওয়া বুনোফুলগুলো। দুলে উঠছে জমি, নদী ও খালে জমে থাকা পানিও। ডুবন্ত সূর্যের স্নিগ্ধ আলোয় চিকচিক করে উঠেছে জলের ভাঁজ। অনতিদূরে, বেলা শেষে খাবারের আশায় একদল বক হাঁটু জলে নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কোথাও কোথাও মাচা বানিয়ে, ঘেরা দিয়ে, ধর্মজাল বা আনতা পেতে ধরা হচ্ছে মাছ। মাছের আশায় উৎপেতে আছে ধলাবক, মাছরাঙা ও চিল। জলাশয় বা শুকনো স্থানে কচুরিপানার দল নীল-গোলাপি আভায় দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শেষ বিকেলে দূর আকাশও সেজে উঠেছে বর্ণিল সাজে।
সিমনা–ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সড়ক (শেখ হাসিনা সড়ক) চালু হয়েছে দুই–আড়াই বছর হবে। দর্শনীয় স্থান হওয়ায় অনেকের মতো আমিও সেখানে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। বড়োজোর বটগাছ পর্যন্ত গিয়েছি, কিন্তু কখনো তৃতীয় ব্রিজটি পার হওয়া হয়নি। গত শুক্রবার বিকেলে প্রথমবার ঐ দিকটাতে গিয়ে অবাক হলাম— এত সুন্দর প্রকৃতি, আগে দেখতে আসিনি ভেবে আফসোস হলো!
আমার মতো মানুষদের জন্যই বুঝি রবি ঠাকুর লিখে গেছেন—
বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।
তিতাস, লইস্কার বিল ও আলিয়াজুড়ি নদীবেষ্টিত সিমনা–ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সড়ক। এর দুই পাশের অঞ্চল ভরা বর্ষায় বিশাল নদী, বর্ষা শেষে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, হাঁসের খামার, সবজি খামার, মৎস্য আরোহণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ফলে বছরের ভিন্ন সময়ে ভিন্ন রূপে, ভিন্ন সৌন্দর্যে নিজেকে মেলে ধরে স্থানটি। আর সেই সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন, বিশেষত শুক্র–শনিসহ ছুটির দিনে এখানে অনেক দর্শকের সমাগম ঘটে।
এ বছরের জুনে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় নয় কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাকা রাস্তার দু’ধারে কয়েক হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছগুলো। কয়েক বছরের মধ্যে সেগুলো ডালপালা ও পত্রপল্লবে ভরে উঠবে। ফুলে ফুলে সৌন্দর্য ও সৌরভ ছড়াবে বহু গুণে। ফলে আগামী কয়েক বছরে এই এলাকাটি আরও দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় ভ্রমণ স্পটে পরিণত হবে।
এ যেন একদিকে আশার কথা, তেমনি দুশ্চিন্তাও— ইতোমধ্যে বেশ কিছু জায়গায় অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। যেহেতু এখানে অনেকের ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গা রয়েছে, তাই ভবিষ্যতে একে একে যে যার মতো বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলবে। সেগুলো যেমন পরিবেশ দূষিত করবে, তেমনি ধ্বংস করবে জীববৈচিত্র্য। বিপন্ন হবে মাছ–পাখির আবাসস্থল।
এই অঞ্চল নিয়ে সরকারি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। হয়তো সেখানে কোনো স্থাপনা থাকবে না, অথবা যা থাকবে— তা হবে পরিকল্পিত— এবং তা এমনভাবে, যাতে জীববৈচিত্র্য শতভাগ নিরাপদ থাকে।
৭ নভেম্বর, এই হেমন্তের সৌন্দর্যের সাক্ষী : কবি হেলাল উদ্দিন হৃদয় ভাই, কবি তারিকুল ইসলাম।
------
বুনোফুলের সন্ধ্যানে
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
১১ নভেম্বর ২০২৫








0 মন্তব্যসমূহ