এ যুগের মানুষ বেশি ভালো, নাকি আগের যুগের মানুষ বেশি ভালো ছিলেন? এই প্রশ্ন করা হলে বেশিরভাগ মানুষই হয়তো বলবেন- ‘আগের যুগের মানুষই বেশি ভালো ছিল’। আসলেই তাই। আমাদের বাবা-চাচা, তাদের বাবা-চাচা, আমাদের মা-খালা, দাদি-নানি, তাদের মা-খালা, দাদি-নানি এখনকার মানুষ থেকে বেশি সৎ, মানবিক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তারা এখনকার মানুষের মতো এত চালবাজ- ঠকবাজ, মিথ্যাবাদী, প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ ছিলেন না। অন্যকে ঠকিয়ে নিজে ভালো থাকার যে প্রচেষ্টা এখনকার মানুষের মধ্যে সর্বদা দেখা যায়, তা আগের যুগের মধ্যে ছিল না। ছিল না নিজেকে বড় দেখাতে গিয়ে- অন্যকে ছোট করার মানসিকতা।
ধর্ম সম্পর্কে তাদের জ্ঞানও ছিল সীমিত। এত আলেম-ওলামা, পীর-দরবেশ-, পূজারি-পুরোহিত তখন ছিলেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা ছিলেন ধর্ম অন্তপ্রাণ মানুষ, ধর্মভীরু মানুষ। অধর্ম হবে, পাপ হবে বলে নিজের কোন স্বার্থ তারা অনায়াসে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ধর্ম নিয়ে রেষারেষি,পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, মত-দ্বিমত তাদের মধ্যে ছিল না। পাড়া-মহল্লায় এত নেতা-কর্মী, রাজনীতিবিদও তখন ছিল না। কিন্তু সমাজ ছিল সুশৃঙ্খল, রাষ্ট্র ছিল অলিখিত শৃঙ্খলার বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন হয়নি সনদ, সংবিধান, আইন-কানুনের এত ধারা-উপধারা। এসব ছিল হয়তো বা কিন্তু বৃহত্তর সমাজে সবিশেষ তার প্রয়োজন পড়েনি।
সভ্যতার এত উন্নতি হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত প্রসার হলো, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের এত প্রসার লাভ করল, কিন্তু আমাদের সোনার মানুষগুলো হারিয়ে গেল কই, কীভাবে?
চারিদিকে এত খুন-ধর্ষণ, মারামারি, চুরি-ছিনতাই, প্রতারণা আর ভেজালের ভিড়ে আমার কেবলই মনে হয় কীসে মানুষকে মানুষ বানায় আর কীসে মানুষকে অমানুষে পরিণত করে? কোন জ্ঞান, কোন ধর্ম, কোন মন্ত্র, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ একটি সমাজকে, একটি জাতিকে সভ্য বানায়। এসব না থাকা সত্ত্বেও আমাদের আগের যুগের মানুষ কীভাবে একটি ভালো মানুষের সমাজ গড়ে তুলেছিলেন, রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন -তা আমাকে ভাবায়িত করে, অবাক করে। আরাম-আয়েশ, বিলাসবহুল জীবন-যাপনের এত আয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন অসুখী? আর ভাঙা ছনের ঘরে পাটি বিছিয়ে ঘুমিয়ে তারা কিভাবে সুখী হয়েছিলেন? অল্পে তুষ্ট হওয়ার মন্ত্র তারা কোথায় পেয়েছিলেন, সেই মন্ত্রটাই বা কি?
জ্ঞান-বিজ্ঞান সভ্যতা সমৃদ্ধির উন্নত শিখরেও অবস্থান করেও একটি সুখী জীবন, একটি আদর্শ পরিবার, একটি মানবিক সমাজ, একটি সুশৃঙ্খলা রাষ্ট্র গড়ে না তোলার মাশুল প্রতিনিয়ত দিচ্ছে অসংখ্য মানুষ। কেউ সম্মান হারিয়ে, কেউ সহায়-সম্পদ হারিয়ে, কেউবা জীবন হারিয়ে। গতকাল অন্য কেউ, আজ আমি, কাল আপনি, পরশু আবার অন্য কেউ- এভাবেই কি চলবে আগামীদিন?
আমরা না হয় একটি খারাপ সমাজে বসবাস করছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মরাও কী সেই সমাজেরই অংশ হবে। আমরা কী তাদের জন্য একটি ভালো সমাজ, রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারবো না ???
------
আলোর পথের সন্ধানে…৪
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২৫ জানুয়ারি ২৬
লোকেশন: ঝাউবন, লাবনী পয়েন্ট, কক্সবাজার।




0 মন্তব্যসমূহ