Ticker

6/recent/ticker-posts

বাবার ওয়্যারলেস সেট নিয়ে স্মৃতি,

ছবির এই ব্যক্তি আমার বাবা সংযুক্ত ছবিটি সত্তর অথবা আশির দশকে তোলা তার হাতে যেই যন্ত্রটি রয়েছে এটিকে আমরাওয়ারলেস’ (ওয়্যারলেস টেলিফোন সেট) হিসেবে জানতাম এখনকার প্রজন্ম এত বড়ো টেলিফোন সেট হয়তো কেউ  দেখেনি, আর দেখবেও না। ৮০ দশকের শেষে বা ৯০ দশকের শুরুর দিকে দেখা এই যন্ত্রটি ছিল আমাদের কাছে এক মহাবিস্ময়ের নাম

তখন মোবাইল ফোন আবিষ্কার হলেও বাংলাদেশে এর অস্তিত্ব ছিল না আমরা ছোটরাতো দূরের কথা বড়োরাও মোবাইল ফোনের কথা চিন্তা করেনি এমনকি তারযুক্ত ডায়াল টেলিফোনও তখন সবার ঘরে ছিল না বিভিন্ন সরকারি অফিস এবং অবস্থাশালী ব্যক্তিদের বাড়িতে কদাচিৎ দেখা যেত সেই সময়ে তারহীন এই টেলিফোন সেট দেখে আমরা বিস্ময়ে অবাক হয়ে যেতাম

কখনো কখনো অপর প্রান্তের ব্যক্তির সাথে কথা বলে নিশ্চিত হতাম আসলেই ঘটনা সত্যি! তার ছাড়াও অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে মানুষের আওয়াজ এবং তা রেকর্ডেড নয় আমি যা বলছি তার প্রত্যুত্তরে তিনিও কথা বলছেন এবং তিনি যা বলছেন আমি তার উত্তর দিতে পারছি / বছর বয়সি আমাদেরত তখন কম আশ্চর্যের কথা নয় বরং তারের ভিতরে দিয়েও মানুষের কথা কিভাবে আসা-যাওয়া করে এটি ভেবেই তো অবাক হতাম তার উপর আবার তার ছাড়া টেলিফোন !!

আব্বা বাবা চাকরি করতেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মেরিন বিভাগে ২৭ বছরের চাকরি জীবনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করলেও তিনিওয়্যারলেস অপারেটরহিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন ফেরিঘাটের ভাসমান জেটির অফিসের কোনো এক কক্ষে ছিল এই বিশেষ যন্ত্রটি (‘ওয়্যারলেস অপারেটর রুম বা ওয়্যারলেস সেকশন এরকম কিছু একটা লেখা ছিল রুমের দরজার উপর সঠিক মনে নেই)

আব্বার সাথে ফেরি ঘাটে গেলে এই রুমে ঢুকে বসে থাকতাম দেখতাম আমার বাবা বা তার অন্য কোনো সহকর্মী কিছুক্ষণ পরপর অপরপ্রান্ত থেকে আসা ফোন রিসিভ করে কথা বলছেন অথবা নিজেই বিভিন্ন বোতাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অন্য পাশের জনের কাছে নিজের বার্তা দিচ্ছেন

যমুনা নদীর উপর তখন দুই ধরনের ফেরি/জাহাজ চলাচল করতো একরকম ফেরি/জাহাজ দিয়ে মানুষ পারাপার হতো এরা সবাই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে রেলগাড়ি যোগে সিরাজগঞ্জ অথবা ফুলছড়ি এবং পরবর্তীতে বালাসী ফেরিঘাট ঘাটে নামতেন, অথবা অন্য কোনো যানবাহনে করে এই ফেরি ঘাটে এসে যাত্রী পারাপারের জাহাজে উঠতেন এবং তারা সেই জাহাজে নদী পার হয়ে অপর প্রান্তেরজগন্নাথগঞ্জ ঘাটঅথবাবাহাদুরাবাদ ঘাটফেরিঘাটে নেমে আবার রেল যোগে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা যাতায়াত করতেন (কয়েকটি স্টেশনের নাম উল্লেখ করলাম এই জন্য বাবা দুই জেলার কয়েকটি স্টেশনে চাকরি করেছেন)

আরেক ধরনের ফেরি ছিল যেখানে মালবাহী রেল বগি বা ওয়াগনগুলো পার হতো এটিও ছিলও আরেক মজার কাণ্ড বিশাল কর্মযজ্ঞের এই কাহিনি নিয়ে আরেকদিন লিখতে হবে)

উপরিউক্তওয়্যারলেসসেটগুলো দিয়ে এই দুই ধরনের ফেরির তথ্য আদান প্রদান করা হতো এবং তা খাতায় লিখে হতো অর্থাৎ কবে, কয়টার সময় কোন জাহাজ ছেড়েছে এবং অন্য প্রান্ত থেকে কয়টার সময় কোন জাহাজ ছেড়েছে এসব রেজিস্টার করা হতো আমরা বসে বসে মাঝে মাঝে সেগুলো দেখতাম আর অবাক হতাম উৎসুক হতাম

বলা বাহুল্য যে তখন ডায়াল করলেই অপরপ্রান্তে খুব সহজেই টিউনিং পাওয়া যেত না আবার অপরপক্ষ সবসময় যে ওয়্যারলেস বসে রুমে থাকতেন তাও না ফলে এক প্রান্তের মানুষ টিউনিং করে বারবার ডাকতে থাকতো- হ্যালো বাহাদুরাবাদ, ঘাট, হ্যালো বাহাদুরাবাদ ঘাট, হ্যালো তিস্তামুখ ঘাট, হ্যালো তিস্তামুখ ঘাট এরকম ডাকাডাকির এক পর্যায়ে অপরপ্রান্ত থেকে সাড়া পাওয়া যেত তারপরে অনেকটা চিৎকার করে করে কথা বলে তথ্য আদান প্রদান করা হতো

আমাদের শিশু মনের বিস্ময় কাটাতে তাদের কাজের অবসরে আমরাও মাঝে মাঝে অপর প্রান্তের লোকের সাথে কথা বলতাম বাবা বা তার সহকর্মীরা আমাদের এই সুযোগ করে দিতেন বিশেষ করে আমার ছোট দুই ভাই-বোন এই ওয়্যারলেস সেটি দিয়ে বেশি কথা বলেছে একটু বড়ো হওয়ায় আমি সুযোগ পেতাম কম, তবে কথা বলেছি তাদের আগে আমার আরো ছোটোবেলায় আমি কথা বলেছি কিনা তা মনে নেই

আমাদের কথা খুব বেশি ছিল না দুই একটি কথা নাম কি, কোন ক্লাসে পড়ি, ভাইবোনের নাম কি, এই সব আর কি কিন্তু যন্ত্রটি আমাদের মনে এক বিস্ময়ের জন্ম দিত এই যে বিশাল নদী যমুনা, নদীর বুকে এত ঢেউ! নদীর উপর এত বাতাস! এই ঢেউ আর বাতাস ভেদ করে ওপারে মানুষের কথা যায় কিভাবে, ফিরে আসে কীভাবে- এসব ভেবে আমরা অবাক হতাম এখন মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে যারা নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু তখন তা ভাবা ছিল আমাদের জন্য রূপকথার মতো রহস্যময় এক ঘটনা তো ফলে আমাদের খেলাতেও এই হ্যালো হ্যালো খেলার চলে আসতো

আজকে হঠাৎ এই কথা বলার উদ্দেশ্য হলো যেআজ বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৬৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিবারের সন্তান হিসেবে এবং ফেরির সাথে আমার যে স্মৃতিগুলো আছে, সেগুলোকে যুক্ত করে একটি লেখা দাঁড় করাতে চাই এটি তার অংশ বিশেষ

আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আবুল হাসেম ১৯৭২ সালের ০৬ জুন চাকরিতে যোগদান করেন এবং ০১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সালে চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন অবসর গ্রহণের তিন বছর পর ২০০২ সালের নভেম্বর নিজ বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে মৃত্যুবরণ করেন মৃত্যুর আগের প্রায় এক বছর তার ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত ছিল সবার কাছে আবার প্রয়াত বাবার জন্য দোয়া কামনা করছি

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

১৫ নভেম্বর ২৫

সংযুক্তিআজ ১৫ নভেম্বর, জাতীয় রেলপথ দিবস ১৮৬২ সালের ১৫ই নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ৫৩ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে রেলপথের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রেল কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ছোট ছোট রেলপথ সেকশন চালু করেছিল সেই সময় "ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে" প্রথম রেলপথ স্থাপন করে, যা মূলত অর্থনৈতিক প্রশাসনিক কাজের জন্য ব্যবহৃত হতো ২০২০ সাল থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ রেলওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় রেলপথ দিবস পালন করছে দিবসটি উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী আলোচনা সভা, রেলপথ উন্নয়ন উপস্থাপনা এবং রেলসেবার মানোন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরা হয়

১৬৩ বছরে রেলপথ দেশের যোগাযোগ, শিল্প, কৃষিপণ্য, পরিবহন, পর্যটন আঞ্চলিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে বর্তমানে রেলওয়ে দেশের ৮টি বিভাগে রেলসেবা বিস্তারের পাশাপাশি নতুন রুট, ডুয়েলগেজ, সিগন্যাল আধুনিকায়ন এবং নতুন ট্রেন চালুর লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে

রেলপথ শুধু ইতিহাস নয়-এটি বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি যাত্রার সঙ্গী আগামী দিনে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপদ, দ্রুত স্বাচ্ছন্দ্যময় সেবা দিতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে-এমন আশা করছেন যাত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা

-----সংগৃহীত)


 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ