Ticker

6/recent/ticker-posts

প্রাণতোষ চৌধুরী:

প্রাণতোষ চৌধুরী: 

স্মৃতির ফ্রেমে সময়কে ধারণ করা অমর আলোকচিত্র শিল্পী।
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ 

১৯৫৩ সালে থেকে আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন জেলার বরেণ্য আলোকচিত্রশিল্পী প্রাণতোষ চৌধুরী। মৃত্যুর আগে রোগশয্যায় শয্যাশায়ী হওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ করেছেন— আজন্ম ভালবাসা এই পেশাটিকে। ছয় দশকেরও বেশি সময় ক্যামেরাকে সঙ্গী করে নিয়ে চষে বেরিয়েছেন জেলা, উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক মিছিল সমাবেশ, যুদ্ধ, মহামারি থেকে শুরু করে জেলায় ঘটে যাওয়া প্রায় সকল ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন প্রাণতোষ চৌধুরী ও তাঁর ক্যামেরা। যুগ যুগ ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতীত ঘটনার জলজ্যান্ত সাক্ষী প্রাণতোষ চৌধুরীর তোলা আলোকচিত্র । বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি তুলেছনে তিনি। স্মৃতির ফ্রেমে সময়কে ধারণ করে তিনিও হয়েছেন অমর।

প্রাণতোষ চৌধুরীর বাবা রাধাচরণ চৌধুরী ছিলেন সেকালের একজন স্বনামধন্য আইনজীবী। তাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল বিজয়নগর উপজেলার বুধন্তী ইউনিয়নের সেমড়া চৌধুরী বাড়িতে। প্রাণতোষ চৌধুরীর মা প্রিয়বাসী চৌধুরী একজন গৃহিণী। এই দম্পতির ঘরে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ১০ ডিসেম্বর (১৩৪১ বঙ্গাব্দ ২৪ অগ্রহায়ণ) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পশ্চিম পাইকপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন প্রাণতোষ চৌধুরী। তাঁরা ছিলেন তিন ভাই এক বোন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নিলেও এটি ছিল তাঁর কাছে অন্যতম ভালোলাগা ও আনন্দের অনুসর্গ। ফলে ক্যামেরা তাকে করেছিল কর্মচঞ্চল ও তরুণ। জেলাবাসীর কাছে তাই পেয়েছিলেন ‘চিরতরুণের’ খেতাব। সদা হাস্যোজ্জ্বল, বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন তিনি। ছিলেন সাংস্কৃতিক অন্তপ্রাণ মানুষ। আজীবন যুক্ত ছিলেন সাহিত্য একাডেমিসহ নানান সংগঠনের সাথে। এসব সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি আয়োজনে অগ্রভাগের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। 


সংগীতপ্রেমী মানুষ ছিলেন প্রাণতোষ চৌধুরী। ছোটোবেলায় সংগীত শিক্ষা অর্জন করেছিলেন, বড় হয়েও তা ধরে রেখেছিলেন। সংগীতকে পেশা হিসেবে না নিলেও কোনো অনুষ্ঠান বা ঘরোয়া আড্ডায় বসে যেতেন হারমোনিয়াম-তবলা নিয়ে। তাঁর গলায় বিখ্যাত ক্লাসিক্যাল সংগীত শুনে মুগ্ধ হতেন সংস্কৃত বোদ্ধা মানুষজন। নাটক পছন্দ করতেন তিনি। জেলায় বিভিন্ন সংগঠন বিশেষত ব্রানাস ও সাহিত্য একাডেমি আয়োজিত বিভিন্ন নাটকের নানা চরিত্রে অভিনয় করে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন দাপটের সাথে। 

ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ কিন্তু প্রচণ্ডভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। সকল ধর্মকেই করতেন সম্মান। কাজে, কর্মে বৃহৎ কিন্তু মনের দিক দিয়েছিলেন শিশুর মতো সরল। ছোট বড় সকলের সাথেই এমনভাবে মিশেছেন যেন তিনি তাদেরই বয়সের একজন। নীতি-আদর্শে মন ছিল দৃঢ়, শক্ত। বিভিন্ন বিষয়ে সত্য ও সুন্দরের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতেন বলে জানিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মীগণ।

তিনি যখন থেকে ক্যামেরায় কাজ শুরু করেছিলেন তখন তখন ছিল সাদা-কালো ক্যামেরার যুগ। যুগ পালটিয়ে ক্যামেরা রঙিন হলেও প্রাণতোষ চৌধুরী আজীবন সাদামনের মানুষই হয়ে রয়েছেন। পোশাক-আশাক, চালচলন ও জীবন ধারণেও ছিলেন সাদাসিধে ভাবাপন্ন। সবসময় ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ পরতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিলো না অহমিকা, কথায় ছিল না ঈর্ষার রেশ। 


প্রাণতোষ চৌধুরী জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ভালোবেসেছেন আজীবন। দীর্ঘ জীবনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিজের শ্রেষ্ঠ এবং উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই জন্য বারবার রাজধানীর ঢাকায় কাজ করার সুযোগ পেয়েও বর্ণাঢ্য জীবনের সে হাতছানিকে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অবলীলায়।

দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বেশ কিছু সম্মাননাপ্রাপ্ত হয়েছেন সেগুলো হচ্ছে সাহিত্য একাডেমি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্মাননা স্মারক-২০০৪ খ্রি., ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয় শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে সম্মাননা স্মারক-২০০৫, খ্রি. জেলা শিল্পকলা একাডেমি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্মাননা স্মারক ২০১৩,পিস ভিশন বাংলাদেশ সম্মাননা স্মারক-২০১৯ খ্রি.,সুর-অঞ্জলির সভ্যবৃন্দ, আগরতলা, ত্রিপুরা, ভারত সম্মাননা স্মারক- ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাট্য সংস্থা সম্মাননা ও তিতাস আবৃত্তি সংগঠন সম্মাননা। 


প্রাণতোষ চৌধুরীর মৃত্যুর আগের বছর ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রাণতোষ চৌধুরীর ৮৬তম জন্মদিন উপলক্ষে সাহিত্য একাডেমির উদ্যোগে প্রকাাশতি হয়েছে ‘স্বরূপ-অরূপ প্রাণতোষ চৌধুরী’ নামে একটি স্মারক গ্রন্থ। বইটির সম্পাদকমণ্ডলীর প্রধান জয়দুল হোসেন এবং সম্পাদনা করেছেন মানিকরতন শর্মা। বইটিতে দুই বাংলার বহু লেখক প্রাণতোষ চৌধুরীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ ও তাঁর জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন।

প্রাণতোষ চৌধুরীর দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য একাডেমির সভাপতি কবি ও গবেষক জয়দুল হোসেন তাঁর এক লেখায় বলেন : “প্রাণতোষ চৌধুরীর পিতা রাধাচরণ চৌধুরী খ্যাতিমান আইনজীবী ছিলেন। একজন আইনজীবীর ছেলে আইনজীবী না হোক, অন্তত শিক্ষক বা অন্য কোনো চাকরিজীবী হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা হলেন না, হলেন আলোকচিত্রজীবী বা ফটোজীবী। স্বাধীন পেশা পিতার মতোই। এই আলোকচিত্র বা ছবি নিয়ে খেলা করা বাল্যকালে তাঁর নেশা ছিল পরিণত বয়সে এই নেশাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। নেশার সাথে যদি পেশা মিলে যায় তবে তা ষোলোকলায় পরিপূর্ণ হয়। প্রাণতোষ চৌধুরীর ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে।


বাল্যকালে অনেকটা শখের বসেই ছবি উঠাতেন। এই করতে করতে কখন যে পেশাদার আলোকচিত্রী হয়ে উঠলেন- তা তিনি নিজেও টের পাননি। কথা প্রসঙ্গে প্রায়ই বলেন, ‘এটা ভগবানের ইচ্ছা। ভগবান আমাকে সৃষ্টি করেই একটা ‘ভেদা' দিয়ে বললেন, নে- তোর ভাগ্যে ক্যামেরা।' এই নিয়ে অনেক হাসাহাসি এবং রসিকতা হয়েছে। প্রাণতোষ চৌধুরী একজন রসিক মানুষ। রসিকতা করে সহজেই লোকজনকে হাসাতে পারেন। 

বাল্যকালে সংগীতচর্চা করেছেন। সংগীতের ওপর তাঁর অগাধ দক্ষতা। তবে সঙ্গীতচর্চাটাকে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে হিসেবে গ্রহণ করেননি। যদি করতেন তবে তিনি ভালো একজন ওস্তাদ হতে পারতেন। তিনি কী হতে পারতেন সেটি বড় কথা নয়, বড় কথা হলো কী হয়েছেন সেটি। তিনি একজন আলোকচিত্র শিল্পী হয়েছেন। আলোকচিত্রী অনেকেই হতে পারেন, কিন্তু আলোকচিত্রশিল্পী কয়জন আছে বাংলাদেশে? খুব বেশি না। হাতে গোনা কয়েকজন। ঐ কয়েকজনের একজন তিনি।”

 

জয়দুল হোসেন আরো বলেন : “প্রাণতোষ চৌধুরী মানুষকে ভালোবাসেন কথায় কথায় বলেন, রোগটাকে ঘৃণা করো, রোগীকে নয়।' অর্থাৎ মানুষটির মধ্যে যে দোষটি রয়েছে সেটিকে ঘৃণা করো, মানুষটিকে নয়। মানুষটির সে দোষটি সারিয়ে তোলার চেষ্টা করো। এখানেই মানুষের প্রতি তাঁর প্রকৃত ভালোবাসা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে ভালোবাসেন তিনি। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। সেই গুণটাকে ভালোবেসে দোষটার নিরাময় চেয়েছেন সারা জীবন। 

প্রাণতোষ চৌধুরী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন আলোকিত মানুষ। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কোনো না কোনো ব্যাপারে স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। তাঁর স্বাতন্ত্র্য তাঁর মধ্যেই বিদ্যমান। তিনি আমাদের সময়ের একটি বাতিঘর। সেই বাতিঘরটি প্রতিনিয়ত আলো ছড়িয়েছেন। তাঁর আলোয় আলোকিত তাঁর সমাজ, সংসার পরিবার পরিজন । অসৎপথে প্রাচুর্যের হাতছানি তাঁকে স্বীয় আদর্শ থেকে নড়াতে পারেনি। জীবনে এখন আদর্শকে লালন করতে পেরেছেন বলেই সমাজের সকলেই তাঁকে ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন । 


‘স্বরূপ-অরূপ প্রাণতোষ চৌধুরী’ গ্রন্থের সম্পাদক মানিকরতন শর্মা বলেন : “প্রাণতোষ চৌধুরী আলোছায়াকে ক্যামেরার ফ্রেমে ধারণ করেছেন শিল্পিত চোখে। মাত্র ১৭-১৮ বছরে বন্ধুদের সাথে জিদ ধরে এই ক্যামেরার পেছনে বোধের চোখ মেলে ধরেছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে পড়ার চৌকাঠ না ডিঙিয়েই আলো-আঁধারের অনুষঙ্গ অব্যয়কে ক্যামেরায় তুলে ধরার ব্রতে নিবিষ্ট হন। তারপর স্রোতস্বিনী নদীর মতো কখনো শান্ত কখনো উচাটন সময়ে পাড় করে দিলেন। পুরো জীবনটাকেই একটা ফ্রেমে আবদ্ধ করে রাখলেন কিংবদন্তি আমাদের প্রাণতোষ চৌধুরী। 

সামাজিক-সাংসারিক অসংখ্য প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি কখনোই চওড়া কাঁধ হতে ক্যামেরাকে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম দেননি। সুমিষ্ট হাসির মাঝেও লুকিয়ে ছিল না বলা ক্যামেরার কথা। যে কথা কেউ শুনতে চাইনি। কখনো নীরবে নিবৃত্তে সে আলোকভাষার কষ্টমালা কথাগুলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা সকলেই ছবি দেখি কিন্তু ছবির ভাষা অনুভব করি না। ছবিও অন্তরের কুহুরে কথা বলে।”----প্রাণতোষ চৌধুরীও তাঁর তোলা ছবিগুলোর মাধ্যমে কথা বলবেন আমাদের সাথে, আমাদের আগামীর প্রজন্মের সাথে।



আলাকিত মানুষ প্রাণতোষ চৌধুরী ২০২১ সালের ৫ নভেম্বর শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পূর্ব পাইকপাড়াস্থ নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। চৌধুরীর প্রয়াণে শহরে শোকের ছায়া নেমে আসে । পরদিন পর শনিবার সকাল ৯টায় প্রয়াত সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য প্রাণতোষ চৌধুরীর মরদেহ নেওয়া হয় স্থানীয় আনন্দময়ী কালী মন্দির প্রাঙ্গণে। সেখান থেকে শহরের পূর্ব মেড্ডা শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তিনি স্ত্রী মিনতী চৌধুরী, চার কন্যা সুতপা, মিনাক্ষী, রুপালি ও ইতি চৌধুরী এবং দুই পুত্র কিশলয় ও মিঠুসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। 

প্রাণতোষ চৌধুরী আমাকেও যথেষ্ট স্নেহ করতেন। চলতিপথে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হলেই হাসি মুখে কথা বলতেন, সস্নেহে মাথায় হাত বোলাতেন। লেখাপড়া-চাকরিসহ না বিষয়ে খোঁজ খবর নিতেন। মৃত্যুদিবসে তাঁর স্মৃতিগুলো স্মরণ করছি। এই মহান আলোকিত শিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।


—--
প্রাণতোষ চৌধুরী: স্মৃতির ফ্রেমে সময়কে ধারণ করা অমর আলোকচিত্র শিল্পী।
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ 
০৫ নভেম্বর ২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ