Ticker

6/recent/ticker-posts

কবি জয়দুল হোসেন-এর ‘পাখপাখালির মিলনমেলা’: ছড়ার দোলায় পাখির রাজ্যে মানবচরিত্র

 গ্রন্থ পরিচিতি : 

কবি জয়দুল হোসেন-এর ‘পাখপাখালির মিলনমেলা’: 
ছড়ার দোলায় পাখির রাজ্যে মানবচরিত্র
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

প্রায় সকল লেখকেরই সাহিত্য-যাত্রা শুরু হয় ছড়ার মাধ্যমে। পরিবারের বড়োদের কোলে বা দোলনায় দুলতে দুলতে। শিশুকাল থেকেই জনপ্রিয় সব ছড়া শুনতে শুনতে সবার মনে ছড়ার প্রতি ভালোবাসা জন্মে। যাকে বলে আজন্ম ভালোবাসা। শিশুবেলায় সেই ভালোলাগা-ভালোবাসা থেকেই বড়ো হয়ে কেউ যখন লেখক হয়ে ওঠেন; তখন তিনিও লেখালেখি শুরু করেন ছড়ার মাধ্যমে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রথিতযশা কবি ও গবেষক, শ্রদ্ধেয় জয়দুল হোসেন স্যারের সাহিত্য-যাত্রা ছড়ার মাধ্যমে হয়েছিল কি’ না তা জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু ছড়ার প্রতি তাঁর যে একটা আলাদা ভালোলাগা আছে তা সহজে অনুমেয়। 

কবি জয়দুল হোসেন-এঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। ‘স্বরবৃত্তে স্বারাঘাত’ নামে প্রকাশিত বইটি ছিল একটি ছড়াগ্রন্থ। পরবর্তীতে সম্পাদনা-সংকলন মিলিয়ে তাঁর প্রায় অর্ধশত বই প্রকাশিত হয়েছে। সময় অসময় দুঃসময়, বারোমাসি ছন্দ ছড়া, লাল সবুজ দেশের জন্য, ছড়া সমগ্র, ‘ফুল পাখি চাঁদ’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু ছড়ার বই। 

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবি জয়দুল হোসেন-এর আরেকটি ছড়াগ্রন্থ ‘পাখপাখালির মিলনমেলা’। পুরো বইয়ে একটি মাত্র ছড়া লিখিত হয়েছে। ১৫১ প্যারা বা ৬০৪ পঙ্ক্তির বিশাল একটি ছড়া। কিন্তুএটি পড়তে একজন পাঠকের অতৃপ্তি বা একঘেয়েমি লাগবে না। বরং একজন পাঠক এক নিঃশ্বাসে পুরো বই পড়ে শেষ করতে পারবেন। এই বইয়ে আরো অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে : যেমন বাংলাদেশে সচরাচর দেখা যায় কিংবা দেখা যায় না- এরকম প্রায় অর্ধশত পাখির নাম এখানে রয়েছে। এ-সকল পাখির নাম ব্যবহার করে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় ‘বিয়ের উৎসব’-কে। বিয়ে বাড়ির নানা কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়- এমন পাখির নামকে জুতসই ব্যবহার করেছেন বেশ মুনশিয়ানার সাথে।

পাখিরা যেমন জোড়ায় জোড়ায় বা দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে, তাদের আচার-আচরণে যেমন মায়া-মমতা এবং আনন্দ-বেদনার ব্যাকুলতা পরিলক্ষিত হয়, তেমনি কবি এখানে পাখিদের পরিবার বা সমাজকে ব্যবহার করে মূলত মানব জীবনের বিয়ের উৎসবকেই বুঝিয়েছেন। পাখিদের আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এখানে মূলত মানবচরিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। 

ছড়ার পঙক্তিতে পঙ্ক্তিতে ফুটে উঠেছে পারস্পরিক স্নেহ-মমতা, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা। আছে দুঃখ-কষ্ট কিংবা রাগ অভিমানের কথা। ছড়ায় ফুটে উঠেছে মানবতাবোধ, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, সাম্যবাদী আদর্শ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার বার্তা। এই ছড়ার মাধ্যমে বাঙালি সমাজে প্রচলিত হিন্দু-মুসলিম উভয় বিয়ের রীতি বা লোক সংস্কারগুলো তুলে ধরেছেন নিপুণ দক্ষতায়।

‘পাখপাখালির মিলনমেলা’ তাই সব বয়সি পাঠকের উপযোগী গ্রন্থ। শিশুরা যখন এই গ্রন্থ পাঠ করবে তখন একইসঙ্গে তারা বিভিন্ন পাখির নাম জানতে পারবে। একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে বিয়ে বাড়িতে কি কি ধরনের আনুষ্ঠানিকতা হয়- সেগুলো জানতে পারবে। জানতে পারবে বিয়ে নিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির কিছু হারিয়ে যাওয়া- কিছু প্রচলিত রীতি-নীতির কথা। বাংলার প্রকৃতি সম্পর্কেতো জানতে পারবেই। আর পড়তে পড়তে শিশুদের মেধা এবং মনন যেসমস্ত মানবিকতা ও নৈতিকতার বোধের চেতনা সঞ্চারিত হবে- সেগুলোর কথাতো আগেই বললাম। 

কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে- এই বইটি যখন শিশুরা পড়বে তখন তাদের কাছে মনে হবে এটি একটি শিশুতোষ বই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে একই বই যখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পড়বেন তখন তার মনে হবে মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় বর্ণনা করা হয়েছে এতে। এরকম আধ্যাত্মিকতা ও দার্শনিকতা পূর্ণ একটি ছড়াগ্রন্থ এই ‘পাখপাখালির মিলনমেলা’। কবি জয়দুল হোসেন যেন নিজের জীবনের যাবতীয় দর্শনের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন একটি ছড়ায়। 

একদিকে আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ এবং অন্যদিকে এটি একটি শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ; আবার লোকজ ঐতিহ্যে ভরপুর। সচেতন পাঠকদের মধ্যে কেউই এটিকে একটি ‘মহাকাব্যিক’ ছড়া বলতে দ্বিধান্বিত হবেন না। কবি জয়দুল হোসেনতো বটেই বাংলাদেশের আর অন্য যে-কোনো ছড়া-সাহিত্যিকের এমন গ্রন্থের নজির আছে কি’ না আমার জানা নেই। থাকলেও তা বিরল। সব মিলিয়ে আমি দাবি করতে পারি- এটি বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অভূতপূর্ব সংযোজন। যেটি নিঃসন্দেহে মহাকালকে অতিক্রম করে পাঠক মনে স্থায়ী জায়গা করে নেবে।

‘পাখপাখালির মিলনমেলা’ বইটি নিয়ে আমার আলাদা একটি ভালো লাগা আছে। আর তা হলো- এই ছড়াগুলোর জন্মের পর পরই যে দুয়েকজন তার মুখ দর্শন করেছেন; তাদের মধ্যে আমিও একজন। কবি জয়দুল হোসেন-এর গত বই মেলায় প্রকাশিত ‘ফুল পাখি চাঁদ’ গ্রন্থে এই ছড়াটিও স্থান পাওয়ার কথা ছিল। তখন এর আকার ছিল বড়োজোর ২৬ থেকে ৩০ লাইন। বইয়ের অন্যান্য ছড়া থেকে আকার একটু বড়ো হওয়ায় তিনি ভাবলেন ছড়াটিকে আরেকটু বড়ো করে আলাদা একটি বই প্রকাশ করবেন। তাই তিনি এই ছড়াটিকে আর সেই বইয়ে জায়গা না দিয়ে এর আকার বৃদ্ধি করার কাজ শুরু করলেন। 

ছড়ার আকার দুই থেকে চার পৃষ্ঠা যেতেই তিনি এটি আমার হাতে দিয়ে কম্পোজ করার কথা বললেন। দু-দিন পরে কম্পোজকৃত কাগজটি জয়দুল স্যারের হাতে দেওয়ার পর তিনি এটিতে আবার ঘষামাজা করলেন, কিছুটা আকারে বড়ো করলেন, তারপর আবার হাতে দিলেন। আমি সেটি উনার নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিকঠাক করে তাঁর হাতে দিই। আবার তিনি কাটাছেঁড়া করেন, ঘষামাজা করেন, আকার বৃদ্ধি করেন। এভাবেই চলতে লাগলো প্রায় ৭/৮ মাস। একসময় ছড়াটি প্রকাশকের হাতে গেলো। কিন্তু তাঁর ঘষামাজা থামল না। তখনও সেখানে টুকটাক কিছু সংশোধনী চলাতে লাগলেন তিনি।

 


তারপর এটি বই হয়ে হাতে আসলো। প্রিন্টার্স লাইন খুলে দেখি বর্ণ বিন্যাসে আমার নাম। আমি মনে করি আমার স্বল্প দৈর্ঘ্যের সাহিত্যচর্চা কালে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কেননা আমি স্বচক্ষে কাছ থেকে দেখেছি সত্তরোর্ধ্ব বয়স্ক একজন লেখক একটি ছড়ার জন্য, একটি বাক্যের জন্য, একটি শব্দের জন্য কী পরিমাণ ভাবেন, পরিশ্রম করেন বা করতে হয়। একটি ছড়ার একটি পদ্যে কিংবা একটি বাক্যে কী পরিমাণ রূপক-ব্যঞ্জনা-উদাহরণ থাকতে পারে- তা আমি এই লেখাগুলো টাইপ করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি নিজেও তা বর্ণনা করেছেন। 

একই সঙ্গে আমি বুঝতে পেরেছি একজন লেখক তাঁর লেখাকে কতটা ভালোবাসেন। একজন লেখক তাঁর লেখাকে কতটা হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেন। নীতি এবং আদর্শের সঙ্গে যায় না বলে হুট করে কোনো শব্দকে ঝেড়ে ফেলা যায়! এটিও এই লেখাগুলো টাইপ করতে গিয়েই আমার শেখা। কতগুলো পাখি, একটি উৎসব, কতগুলো আনন্দ-বেদনার মুহূর্ত কিংবা একটি শব্দ একজন লেখকের পরিচর্যায় কীভাবে আকর্ষণীয়, নান্দনিক, শৈল্পিক হয়ে ওঠে- একটি দীর্ঘ ছড়া প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তার চাক্ষুষ সাক্ষী হলাম এই ছড়াগ্রন্থের কাজ করার মাধ্যমে। আমি খুব আনন্দচিত্তে এবং আগ্রহের সাথে এই কাজটি করেছি। কারণ এর জন্য প্রায় দিন জয়দুল হোসেন স্যারের সান্নিধ্যে যেতে হয়েছে। তিনি প্রতিদিন নতুন নতুন কিছু শিখিয়েছেন। এই মুহূর্তগুলো আমার কাছে ‘হাতে কলমে শিক্ষার মতো একটি বিষয়। দীর্ঘ সময় একটি ছড়া-কবিতা নিয়ে নাড়াচাড়া করার কারণে ছন্দ এবং মাত্রার প্রতি আমার যে ভয়! তার অনেকাংশই কেটে গিয়েছে। ফলে এই বইটির প্রতি আমার একটি আলাদা ভালোলাগা কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। 

বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এই বইটি প্রকাশ করেছে প্রিয় কবি, সম্পাদক ও প্রকাশক গাজী তানভীর আহমেদ ভাই। তার আদিল প্রকাশ থেকে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন দেশের স্বনামধন্য শিল্পী ধ্রুব এষ। পরিবেশক হিসেবে রয়েছে স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পঙ্খিরাজ ও বাবুই। পাওয়া যাবে রকমারি, বইবাজার, প্রথমা, বাতিঘরসহ দেশের অনলাইন বই বিক্রির প্ল্যাটফর্ম সমূহে। 

রেগুলার সাইজ থেকে একটু বড়ো স্মার্ট সাইজের বই। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় বিভিন্ন পাখি ও ছড়ায় বিবৃত দৃশ্যের বিমূর্ত ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। রং-বেরঙের পাখির বিমূর্ত অবয়ব আর হলদে কালারের প্রচ্ছদে ম্যাট লেমিনেশন- বইটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। চার ফর্মা (৪৮ পৃষ্ঠার) বই পুরোটাই রঙিন ১৫০ গ্রামে আর্ট পেপারে ছাপানো। গ্রন্থটির কাগুজে মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা।


গুণী লেখক কবি জয়দুল হোসেন তাঁর ‘পাখপাখালির মিলনমেলা’ গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন ‘পাখি হয়ে যায় প্রাণ, যাঁদের’- তাদের উদ্দেশ্য। আসুন বইটি পড়ি আর আমাদের হৃদয়কে পাখির বৈশিষ্ট্যে সাজিয়ে তুলি। আমি বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

-----------

কবি জয়দুল হোসেন-এর ‘পাখপাখালির মিলনমেলা’: ছড়ার দোলায় পাখির রাজ্যে মানবচরিত্র

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

০৪ অক্টোবর ২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ