Ticker

6/recent/ticker-posts

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবন ও কর্ম


ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা, ভাষা সংগ্রামী ও শহীদ বুদ্ধিজীবী 
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবন ও কর্ম

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতীসন্তান শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন ছিলেন একজন বহুগুণে গুণান্বিত মানুষ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন হয়ে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তাঁর রয়েছে মহৎ কর্মযজ্ঞ। নিজের জীবন দিয়ে তিনি বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের মানচিত্র ও পতাকাকে করেছিলেন সমুন্নত। বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সাথে স্বর্ণাক্ষরে তাঁর নাম লেখা রয়েছে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য, পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য, পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য, যুক্তফ্রন্ট সরকার আমলের পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও সমাজকল্যাণ দফতরের মন্ত্রী এবং আত্মজীবনীকার। তিনিই প্রথম পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলা ভাষা প্রবর্তনের জন্যে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। 

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ২ নভেম্বর (১২৯৩ বঙ্গাব্দের ১৬ কার্তিক) সাবেক ত্রিপুরা জেলা, পরে কুমিল্লা জেলা, বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত রামরাইল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯০৪ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুল হতে প্রবেশিকা, ১৯০৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এফ.এ., ১৯০৮ সালে কলকাতা রিপন কলেজ হতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি.এ এবং ১৯১০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি প্রায় এক বছরকাল কুমিল্লার মুরাদনগর বাঙ্গরা উমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন ও পরবর্তীতে আইনজীবী হিসেবে ১৯১১ সালে তিনি ত্রিপুরা জেলা বারে (বর্তমান কুমিল্লা জেলা বার) যোগদান করেন। 

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং ব্যারিস্টার আবদুর রসুলের রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। এর মাধ্যমে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। তিনি ১৯০৭ সালে ‘ত্রিপুরা হিতসাধনী সভা’র সচিব নির্বাচিত হন এবং ১৯১৫ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কাজে অংশগ্রহণ করেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ অনুসরণে তিনি ‘মুক্তি সংঘ’ নামে একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা গঠন করেন। কুমিল্লার সুপরিচিত জাতীয়তাবাদী সংগঠন অভয় আশ্রম -এর কর্মকাণ্ডের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন। ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ শহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। 

১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে তিনি তিন মাসের জন্য আইন ব্যাবসা স্থগিত রাখেন। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে লবণ আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নেন। তিনি ১৯৩৬ সালে ত্রিপুরা (বর্তমানে কুমিল্লা) জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য হন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাসের সাথে ধীরেন দত্ত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়; আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৩০, ১৯৪০ ও ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণের ও ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন কারাগারে বিনাশ্রম ও সশ্রম দণ্ড ভোগ করেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ত্রাণসামগ্রী বিতরণে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের সদস্য হিসেবে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি পাকিস্তান গণ-পরিষদের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি ভাষা প্রশ্নে সংশোধনী এনে অধিবেশনের সকল কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাতেও রাখার দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানে যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যাই বেশি এবং তারা বাঙালি, সেহেতু অবশ্যই বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সকল কার্যাবলির জন্য ব্যবহার করা উচিত এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

কিন্তু লিয়াকত আলী খান সাম্প্রাদায়িক বক্তব্যের ভিত্তিতে এই দাবি নাকচ করে দেন। পাকিস্তানের উভয় অংশের মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের বিরোধিতা ও অসহযোগিতার কারণে গণ-পরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা মর্যাদাদান সম্পর্কিত আনিত প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়। এ সম্পর্কে লিখেছেন ড. রফিকুল ইসলাম : ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ করাচিতে পাকিস্তান গণ-পরিষদে বাংলা ভাষা ব্যবহারে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব গৃহীত হয়নি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ব্যবধান চার বছরের, কিন্তু এই চার বছরেও পাকিস্তানের অদূরদর্শী শাসক সম্প্রদায় বাংলা ভাষার দাবি মেনে নেয়নি। সেদিন যদি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা সম্পর্কিত সংশোধনী ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রস্তাব উত্থাপন না করতেন, তাহলে আমাদের ইতিহাস কি হত কে জানে? 

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে তিনি ‘জনসমিতি দলের’ প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের জুন মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন প্রবর্তনের বিরুদ্ধে একটি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের নতুন শাসনতন্ত্র চালু হয়। এই শাসনতন্ত্র অনুসারে ১৯৫৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত পূর্ব পাকিস্তানের নতুন মন্ত্রিসভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। তাঁকে চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের সামরিক আইন জারি হলে অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও দেশপ্রেমিকদের মতো তাঁর উপর নানা নির্যাতন চলে। 

১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করে। পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’ প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয় এবং তখন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। এতৎসত্ত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতেন। 

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে তিনি ব্যালট বিপ্লব বলে অভিহিত করেন। তিনি আশাবাদী হন যে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, জনগণ মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু পাকিস্তানি সিভিল-মিলিটারীচক্রের ষড়যন্ত্রের ফলে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্যে স্থগিত হয়ে যায়। এই ঘোষণার প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় গণ— আন্দোলন। বাঙালিরা স্বাধিকারের পরিবর্তে স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে সংকল্পবদ্ধ হয়। পাকিস্তানের শাসকবর্গ গণ-আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার মতলব নিয়ে একদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে। অন্যদিকে গোপনে অস্ত্র ও সৈন্য আনতে থাকে। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কুমিল্লার বাসা ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি দেশ ত্যাগ করবো না। মরতে হয় জন্ম ভূমিতেই মরবো।’

এরপর আসে ২৫ মার্চের কালো রাত। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকাসহ সারাদেশে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে পরিকল্পিতভাবে শুরু করে বাঙালি হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। আর এদিকে ২৬ মার্চ ঘোষিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এর তিন দিন পর ২৯ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর কনিষ্ঠপুত্র দিলীপ দত্তকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আইনজীবী আবদুল করিমের তত্ত্বাবধানে ছোট ছেলে দিলীপ কুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাদেরকে ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে নির্যাতন করে শহীদ করা হয়।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯০৬ সালে ছাত্রজীবনে তৎকালীন কুমিল্লা মহকুমার মুরাদনগর থানার পূর্বধইর গ্রামের কৃষ্ণকমল দাসমুন্সীর কন্যা সুরবালা দাসকে বিয়ে করেন। কৃষ্ণকমল দাসমুন্সী পেশায় আইনজীবী ছিলেন। বিয়ের সময় ধীরেন্দ্রনাথের বয়স ছিল ২১ বছর এবং সুরবালার ১৪ বছর। দীর্ঘ ৪৩ বছর দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে ১২ আগস্ট ১৯৪৯ সালে সুরবালার মৃত্যুতে। তাদের সাত মেয়ে ও দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। বড় ছেলে সঞ্জীব দত্ত লেখক ও সাংবাদিক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ২৭ এপ্রিল ১৯৯১ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। ছোট ছেলে দীলিপ দত্ত ১৯৭১-এর মার্চ মাসে পাকহানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। তাঁর নাতি অ্যারোমা দত্ত (সঞ্জীব দত্তের কন্যা) বাংলাদেশের একজন সমাজসেবী, নারী নেত্রী, মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনীতিবিদ।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের রাজনীতি, আইন, পেশা, সমাজসেবা, সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মৌলিক অধিকার, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা ও ইতিহাসের অংশ। তাঁর মহান কর্ম ও আত্মত্যাগ আমাদের নিজস্ব ভাষায় কথার বলার অধিকার অর্জনসহ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দিয়েছে। দিয়েছে বিশ্ব দরবারে সমুন্নত করেছে উড্ডয়ীমান লাখো শহীদের রক্তে রাঙা লাল সবুজ পতাক।

১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তাঁর প্রতিকৃতি সম্বলিত একটি ডাক টিকিট প্রকাশ করে। ১৯৯৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সভায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে দেশের “সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিসাবে তাকে “ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতি সরুপ ‘স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয়। যা ১৯৯৮ সালের ২৬ মার্চ প্রদান করা হয়। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পক্ষে তার নাতনি আরমা দত্ত পুরস্কারটি গ্রহণ করেন। 

কুমিল্লা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক, বিশিষ্ট সংসদ সদস্য ও আইনজীবী হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নামে রাস্তার নামকরণ করে। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে খাজা নিজাম উদ্দিন সড়ক পর্যন্ত রাস্তাটি এখন থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক নামে পরিচিত। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐবছরই ছাত্রদের জন্য ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল’ নামে একটি আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে কুমিল্লা স্টেডিয়াম এর নামকরণ করা হয় ‘ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম’। ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর জগন্নাথ হলে তার নামে একটি ই-লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হয়। 

শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার রামরাইল গ্রামে। সেখানে তাঁর তার পূর্বপুরুষের ভিটায় তাঁর নামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের প্রাণকেন্দ্র, জেলার সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার পাদপীঠ বলে পরিচিত ইন্ডাস্ট্রিয়ালে স্কুল চত্তরটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁর নামে ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বর’ নামে একই বছর ১৬ ডিসেম্বর সেখানে থাকা মঞ্চটিকে ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা মঞ্চ’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। এই চত্বরে আরো আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পাঠাগার’। এ ছাড়াও কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের রামরাইল বাস স্ট্যান্ড এর দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ‘শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তোরণ” নামে একটি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল, যা চার লেন সড়ক নির্মাণের কারণে ভেঙে ফেলা হয়। 

দেশের অন্যতম একজন ভাষাসংগ্রামী এবং একজন শহিদ বুদ্ধিজীবী নামে এসব যথেষ্ট নয় সম্প্রতি দাবি উঠেছে বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ভাষাসংগ্রামী ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী, আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃতীসন্তান শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার। সংগত কারণেই দাবিটি যৌক্তিক। আমি এই দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করছি। উল্লেখ্য, আমার নিজের বাড়ি একই ইউনিয়নে হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই গুণী ব্যক্তি নিয়ে আমি বিশেষভাবে গৌরব বোধ করি।

তথ্যসূত্র ও প্রতিলিপি :

* শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মকথা, বাংলা একাডেমি, আনিসুজ্জামান, রশীদ হায়দার ও মিনার মনসুর সম্পাদিত (১৯৯৫)। 

* ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত : জীবন ও কর্ম। বাংলা একাডেমি, মিনার মনসুর (১৯৯৬)।

* স্মৃতি : ৭১, রশীদ হায়দার সম্পাদিত

* একাত্তরের মার্চে কুমিল্লায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, দৈনিক ইত্তেফাক। ২৯ মার্চ ২০১৪।

* শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত : বিডিনিউজ ২৪. কম, ২০ অক্টোবর ২০১৪।

* পনের শহীদের নামে কুমিল্লার ১২ সড়ক, দৈনিক ইত্তেফাক। 

* সঞ্জীব দত্ত : অনুপম হায়াৎ, বাংলা একাডেমি, জানুয়ারি ২০০০।

* উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য অনলাইন মাধ্যম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ