Ticker

6/recent/ticker-posts

শহিদ ওবায়দুর রউফ পলু: তারুণ্য, বীরত্ব ও আত্মত্যাগ দিয়ে লিখেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আন্দোলনের ইতিহাস।


বাংলাদেশের প্রথম জেলা চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৬৬ সালে। এর ১০০ বছর পর দ্বিতীয় জেলা হিসেবে ১৭৬৫ সালে রংপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৭৭২ সালে ঢাকা, রাজশাহী, ১৭৮৬ সালে সিলেট, ১৭৮৭ সালে ময়মনসিংহ, ১৭৯০ সালে কুমিল্লা, ১৭৯৭ বরিশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮২১ সালে বগুড়া ও নোয়াখালী, ১৮২৮ সালে পাবনা, ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা, ১৮৮১ সালে যশোর, ১৮৮২ সালে খুলনা, ১৮৮৬ সালে ফরিদপুর ও দিনাজপুর এবং ১৯৪৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। 


দেখা যায় ১৬৬৬ থেকে পরবর্তী ৩০৮ বছরে অর্থাৎ ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠালগ্নে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের জেলার সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭টি। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে ১৯৬৯ সালে পটুয়াখালী ও টাঙ্গাইল জেলা প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৭১-এ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকালে জেলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯টিতে। ১৯৭৮ সালে জামালপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে জেলা সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২০টিতে। 


১৯৭৫ সালে সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) চালু হয়। এর সঙ্গে মহকুমা প্রথা বিলুপ্ত করে ৬০টি জেলা সৃষ্টি হয়। তবে এ ব্যবস্থার আওতায় প্রতি জেলায় একজন করে গভর্নর নিয়োগ করা হয়। এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ কার্যকর করার আগেই ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে দেশে সামরিক শাসনব্যবস্থা চালু হয়। 


কিন্তু ১৯৮৪ সালে দেশে এমন কিছু ঘটে যাতে বাংলাদেশের জেলার সংখ্যা পূর্বোক্ত ২০টি থেকে এক লাফে এগিয়ে দাঁড়ায় ৬৪টিতে। কি এমন ঘটনা ঘটলো- যার কারণে দেশের ৪৪টি মহকুমা একসঙ্গে জেলায় পরিণত হলো! এর পেছনে রয়েছে একটি জনপদের মানুষের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। আছে একজন তরুণের আত্মত্যাগের ইতিহাস। তাঁর কথাই বলব আজ।


আশিক দশকের গোড়ার কথা। বাংলাদেশের বয়স তখন ১০ বছর। নানা রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন স্বাধীন হওয়ার দেশে নতুন করে প্রশাসনিক বিন্যাস তখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান গড়ে ওঠা প্রশাসনিক ব্যবস্থাই দেশ চলছিল। কিন্তু স্বাধীন দেশে জন মানুষের স্বাধীনচেতা মনোভাব ও উন্নত জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। 


লাখো শহিদের রক্তে কেনা বাংলাদেশের গণমানুষের দাবিও ছিল এটি। ফলে একদিকে যেমন অফিস আদালতের চাহিদা বাড়ে, অন্যদিকে দূরদূরান্তে অফিসগুলোতে যাতায়াত ব্যবস্থা কঠিন হওয়ায় ব্যক্তিগত ও অফিসিয়াল কাজ করাও দুরূহ হয়ে ওঠে। এমন বাস্তবতায় দেশের বিভিন্ন মহকুমাগুলোকে জেলা হিসেবে গড়ে তোড়া দাবি উঠছিল রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা থেকে শুরু করে সচেতন সাধারণ জনতার মাঝে।


তিতাস বিধৌত শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। মুঘল আমল থেকেই এই অঞ্চলটির পরিচিত ছিল একটি সমৃদ্ধ জনপথ হিসেবে। কৃষি, ব্যাবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় এর সুনাম ছিল বিশ্বজুড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃতীসন্তানদের নাম তখন পুরো উপমহাদেশের মানুষের মুখে মুখে। এসব বিবেচনায় একদিকে যেমন জেলার মানুষের আত্মিক উন্নতি ঘটে, অন্যদিকে আত্মসামাজিক উন্নতিও ঘটতে শুরু করে। ১৮৬৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা গঠিত হয়। ১৮৪২ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে অবিভক্ত বাংলার প্রায় সব কয়টি মহকুমা সৃষ্টি করা হয়। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু জেলা হওয়ার দৌড়ে অন্যান্য জেলার মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়াও পিছিয়ে ছিল অনেক দূর।


১৯৮২ সালের গোড়ার দিক থেকে নানান বাস্তবতায়, বাংলাদেশের তৎকালীন উল্লেখযোগ্য মহকুমা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে জেলা ঘোষণার দাবিতে জনমত গড়ে উঠতে থাকে। ১৯৮৩ সালের দিকে এই জনমত প্রবল আকার ধারণ করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মহকুমা থেকে জেলায় রূপান্তরের লক্ষ্যে ১৯৮৩ সালের শেষ দিকে তৎকালীন সরকারের নিকট আনুষ্ঠানিক ভাবে দাবি জানানো হয়। 


এসময় জেলা আন্দোলনকে সফল ও বাস্তবিক রূপ দিতে সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। শহরের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাও এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। একের পর এক কার্যক্রমে বিরক্ত হয়ে তৎকালীন সরকার ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মহকুমাকে থানায় অবনমিত করে। এতে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। দেওয়া হয় কঠোর কর্মসূচি।


১৯৮৩ সালের নভেম্বর মাসে দিনরাত একটানা হরতালে অচল হয়ে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া। দিনরাত সড়কজুড়ে অবস্থান নেয় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা। বন্ধ থাকে প্রায় সব সরকারি অফিস। ব্যাবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। এসময় স্থানীয় পত্রপত্রিকাসহ জাতীয় দৈনিকগুলোতেও গুরুত্বসহকারে ছাপা হতে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা আন্দোলনের নানা কর্মসূচির খবর। 


২৭ নভেম্বর অহুত হরতাল সফল করতে ছাত্র জনতার ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় অবস্থান নিয়ে যানচলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাথে ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রামসহ সারাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হরতাল চলাকালে সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিল। সকালে রেলওয়ে স্টেশনে এলাকায় আন্দোলনকারীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।


এক পর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের ওভার ব্রিজের ওপর অবস্থান নয়ে একদল আন্দোলনকারী। তারা স্লোগানের স্লোগানে মুখরিত করে রেখেছিল রেলওয়ে স্টেশন এলাকাটি। জানা যায় জেলার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকা এক তরুণের ছবি তোলেন একজন সাংবাদিক। তার কিছুক্ষণ পরেই সেই তরুণের দিকে ছুটে আসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীর ঘাতক বুলেট। মুহূর্তেই ব্রিজের পাটাতনে লুটিয়ে পড়েন সেই তরুণ। উপস্থিত লোকজনেরা তাকে ধরাধরি করে তাৎক্ষণিক নিয়ে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে। এ সময় কর্তব্যরত ডাক্তার তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। 


সেই তরুণের নাম ছিল পলু। পুরো নাম ওবায়দুর রউফ পলু। পলু সে সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি সবার মাঝে মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। ১৮/১৯ বছরের তগবগে তরুণ পলু। ততদিনে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আঠারাে বছর বয়স কী দুঃসহ/ স্পর্ধায় নেয় মাথা তােলবার ঝুঁকি,/আঠারাে বছর বয়সেই অহরহ/বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি। আঠারাে বছর বয়সের নেই ভয়/ পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,/ এ বয়সে কেউ মাথা নােয়াবার নয়/আঠারাে বছয় বয়স জানে না কাঁদা।/এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য/বাষ্পের বেগে ষ্টীমারের মতাে চলে,/প্রাণ, দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য/সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে। কবিতাটা তাঁর পড়া হয়েছে বোধহয়।


পলু ৬ ভাই, ৫ বোনের মধ্যে ষষ্ঠ এবং ভাইদের মাঝে চতুর্থ। শহরের টেংকেরপাড় নিবাসী তাঁর বাবা এ এস এম আবদুর রউফ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। একজন সৎ নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে চট্টগ্রাম ডিএসবি-র ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সৎ ও আদর্শ বাবার সন্তান হিসেবে তাদের পরিবারের সকল ভাই বোনরাই ছিল অত্যন্ত মেধাবী এবং প্রতিষ্ঠিত। মেধাবী ছাত্র পলুকে নিয়ে ছিল তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন থেমে গেল পুলিশের গুলিতে। কিন্তু আন্দোলন থামলো না একচুলও।


যুগে যুগে অত্যাচারী শাসকরা বারবার ভুলে যায় মানুষের ন্যায়সংগত দাবি কখনো বন্দুকের গুলিতে থামানো যায়নি, যায় না। পলু নিহত হবার খবর মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়লো পুরো শহরে। আন্দোলনকারী জনতা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন, সিও অফিসসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে হামলা করে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ এসময় ওবায়দুর রউফ পলুর লাশ নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। জনতা শহিদ পলুর লাশ পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মিছিল বের করে। এদিন শহিদ পলু রক্ত সুধায় জ্বালিয়েছে যে প্রদীপ, সেই দীপ প্রজ্বলিত রাখার দৃপ্ত শপথ নেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী। 


শহিদ পলুর বড় ভাই কৃষিবিদ ও প্রাণিবিজ্ঞানী একিউএম সফিকুর রউফ তাঁর এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় বলেন : “(পরপর তিনটি গুলির শব্দ! ভিতরটা কেন জানি না ফাঁকা ফাঁকা মনে হলো। দাঁড়িয়ে ছিলাম কালিবাড়ি মোড়। শুনলাম মিছিলটি স্টেশনে দিকে গেছে। ১৯৮৩ সালের ২৭ নভেম্বরের কথা। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবের আমল। তিনটি গুলির শব্দে আমার ভিতরটা কেঁপে উঠলো। কালিবাড়ি মোড়ে দেখলাম কেমন জানি হতাশা সবার মাঝে। সবারই দৃষ্টি রেল ক্রসিং-এর দিকে। কিছুক্ষণ আগে ওই দিকেই মিছিলটি গেছে। পরে শুনলাম মিছিলটি রেল স্টেশনের দিকে রওনা দিয়েছে।


থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আমিও আর এগোতে চাইনি। থেমে গেলাম কালীবাড়ি মোড়ে। হঠাৎ খবর এলো- একটি ছেলেকে পুলিশ গুলি করেছে, ছেলেটা সম্ভবত মারাও যেতে পারে। হঠাৎ দেখলাম আমার ছোট ভাই মুজিবুর রউফের স্কুল জীবনের বন্ধু রফিক দৌড়ে আসছে এবং কাঁদছে আর বলছে, মাইরা ফালাইছেরে, মাইরা ফালাইছে। টেনশন নিয়ে একটু এগিয়ে গেলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো – দাদা পলুর গুলি গায়ে লাগছে, আল্লাহ কইতে পারে কী অইছে !!! 


আমার শরীর যেন অবশ প্রায়। আমি যেন পড়ে যাচ্ছি। কি হলো আমার! আপন ভাই বলেই হয়তো আত্মিক টানে ভিতরটা পুড়ে উঠছিলো বারবার। এর কিছুক্ষণের মধ্যে আহত কি না নিহত (তখনও বোঝা যায়নি তার অবস্থা) পলুকে নিয়ে অনেকেই হাসপাতালের দিকে ছুটছে। রিকশায় দুজনের কোলে পলু। এগিয়ে গেলাম দেখতে। উত্তেজিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনগণ এমনই ভাবে ঘিরে ধরে চলছিল আমি আর পারলাম না কাছে ভিড়তে। 


আমার মনে হচ্ছিলো পড়ে যাচ্ছি। সে (রফিক) আমাকে ডান হাতটা কাঁধে তুলে তার বা হাতটাকে আমার কাঁধে তুলে দিয়ে একরকম টেনে টেনে হাসপাতালের দিকে রওনা দেয়। পৌঁছে দেখি পলুকে ইমারজেন্সি বিভাগের ট্রেচারে শুইয়ে দিয়ে ডাক্তার খুঁজছে। আমাকে এরকম চেপে ধরে চেয়াওে বসানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে অনেকেই, কাউকেই আমি মনে রাখতে পারিনি। তারা সবাই আমাদের পরিবারকে করে রাখলো চিরঋণী। 


ডাক্তার এসে তার পালস চেক করে যখন বললো পলু আর নেই, সবাই সমস্বরে বলে উঠলো- ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তখন যেন আমার মাথায় বাজ পড়লো, থ হয়ে রইলাম। কথা যেন বেড় হচ্ছে না, হয়ে রইলাম স্তব্ধ, মুক। উত্তেজিত জনগণের চোখে যেন আগুন ছিটকে বেড় হতে লাগলো। কি করবে! তখন যেন তাদের দিশা নেই। উত্তেজনা যেন বেড়ে গেল আরো অধিকতর হারে। এক পর্যায়ে ট্রেচারসহ লাশ নিয়ে মিছিলে বেড়িয়ে পড়লো উপস্থিত জনতা। আমি আমার শরীরকে শরীরের মধ্যে পাচ্ছিলাম না। চোখ দিয়ে অজোর ধারায় যেন বন্যার পানি বের হতে লাগলো। শরীরটা সত্যিকারভাবেই অবশ হয়ে আসছিলো। পড়েই যাচ্ছিলাম। 


একটু রেস্ট নিয়ে রফিকদের হাত ধরে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। পথে আব্বাকে দেখলাম উদ্‌ভ্রান্তের মতোন ছুটে যাচ্ছেন হাসপাতালের দিকে। হয়তো খবর পেয়েছেন কারো কাছে, তখনতো আর মোবাইল ছিলো না। কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলাম আব্বাকে। আব্বার মুখে কোনো কথা নেই, ভিতরটাতে যে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাচ্ছে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। উনার বুকে যখন মাথা রেখে কাঁদতে থাকলাম। অধিক শোকে যে পাথর হয় বলে যে কথা প্রচলিত আছে তা তখনকার আব্বার অবস্থা দেখে বুঝতে পারলাম। ফিরে এলাম আব্বাকে নিয়ে বাড়িতে। তখনও লাশ পৌঁছেনি বাড়িতে। অপেক্ষার পালা। লাশ বাড়িতে এলো ঘন্টা দেড়েক পর। শুনলাম লাশ নিয়ে ব্যাপক মিছিল হয়েছে, হয়েছে মিটিং, আর লাশের মিছিল থেকে ঘটেছিলো উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। 


তখন স্থানকাল পাত্রভেদে সবাই আমাদের বাড়িতে এলো আমাদের সান্ত্বনা দিতে। আমার যতদূর মনে পড়ে কোনো পার্টিরও বাছবিচার ছিল না। দেখলাম দিলারা হারুন আপাকে, মাহবুবুল হুদা ভাইকে, জোবায়ের ভাইকে, বাক্কী ভাই ও তার দলবলকে দেখলাম। দেখলাম আরো নাম না জানা অনেক ভাইকে যারা আমাদের পরিবারকে আজীবন ঋণী করে রেখেছেন। কৃতজ্ঞ আমরা সবার কাছে যারা এসে আমাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন, আমাদের সহমর্মিতায় একাত্ম হয়েছেন।”)


--------------

এদিন (দুপুরে/বিকেলে) শোকাবহ পরিবেশে নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শহিদ পলুর জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশগ্রহণ করে কয়েক হাজার হাজার মানুষ। সকলের চোখে মুখে শোক-ক্ষোভ আর প্রতিজ্ঞার আভাস। তারা আন্দোলন থামবে না। যে মহৎ উদ্দেশ্যে জীবন দিল একজন তরুণ, সে উদ্দেশ্য সফল না করে তারা ঘরে ফিরে যাবে না। জানাজার শেষে শহরতলির শেরপুর কবরস্থানে শহিদ পলুকে দাফন করা হয়। 


পলুর মৃত্যুতে প্রশাসন আরও বেশি তৎপর হয়ে ওঠে। তারা শহরে কারফিউ জারি করে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনীকে নিয়ে আসে। সন্ধ্যা হতে না হতেই পুরো শহরের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়াযান অবস্থান নেয়। রাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিলে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে জেলা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অনেক রাজনৈতিক নেতা এবং সাধারণ জনতাকে। ব্যাপক ধরপাকরের কারণে পরের দিন ২৮ নভেম্বর সড়ক ও রেলপথে যান চলাচল শুরু হয়। পাশাপাশি চলতে থাকে জেলাবাসীর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন।


অব্যাহত আন্দোলনের মধ্যেই পরের বছর ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সফর করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। কাউতলীতে অবস্থিত নিয়াজ মোহাম্মদ স্টেডিয়ামে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন তিনি। বক্তব্য তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে জেলা হিসেবে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। বলতে হয়— ঘোষণা দিতে বাধ্য হন তিনি। 


এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৪ সালে দেশের প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ সচিবালয়ের সংস্থাপন মন্ত্রণালয় (জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের) মাধ্যমে দেশের মহকুমা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে জেলা সৃষ্টি করা হয় এবং উপজেলা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এসময় দেশে বিদ্যমান ৪৪টি মহকুমাকে জেলা হিসেবে উন্নীত করা হয় এবং বিদ্যমান ৪৬০টি থানাকে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। 


শহিদ পলুর আত্মত্যাগ সফল হয় হয়। সফল হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাবাসীর এক গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবজনক আন্দোলনের। আজকের বাংলাদেশের ৪৪টি জেলা কোনোরকম আন্দোলন সংগ্রাম এবং রক্তপাতহীনভাবে মহকুমা থেকে জেলা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে একজন শহিদ পলুর আত্মত্যাগের কারণে, ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর আন্দোলনের কারণে। এসব ভাবতেই মন গৌরবে গৌরবান্বিত বোধ করে।


২৭ নভেম্বর ওবায়দুর রউফ পলুর শাহাদতবার্ষিকী। প্রতিবছর এই দিনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাবাসী ‘জেলা আন্দোলন দিবস ও শহিদ পলুর শাহাদতবার্ষিকী’ হিসেবে পালন করে থাকে। ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ এই দিনটি তার এবছর ৪২ বছর অতিক্রম করছে। ৪২ বছর ধরে শহিদ পলু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে রয়েছেন তারুণ্য, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের প্রতীক হিসেবে। এবং যুগ যুগ ধরে তা অব্যাহত থাকবে। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।


নোট: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও লোক সংস্কৃতি চর্চার অংশ হিসেবে এই লেখাটি লিখতে চেষ্টা করেছি। এটি লিখতে গিয়ে শহিদ পলু ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা আন্দোলন বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যের অপ্রতুলতায় ভুগেছি। আমার কাছে রক্ষিত বিভিন্ন গ্রন্থেও এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আর্টিকেল বা তথ্য খুঁজে পেলাম না। ফলে কিছু জায়গায় তথ্য বিভ্রাট থাকতে পারে, যা আমারই অদক্ষতা ও অযোগ্যতা। এর জন্য পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। 


লেখাটি লিখতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া টুয়েন্টিফোর ডটকমের দুটি, উইকিপিডিয়া, কালেরকন্ঠ, যায়যায়দিনসহ কয়েকটি পত্রিকার নিউজ এবং দু-একজনের সাথে কথোপকথনে সহযোগিতা নিয়েছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের উৎস থেকে হুবহু তুলে ধরা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন, পরিমার্জন ও বানান সংশোধন করা হয়েছে।


এবং আজকেই আমি একটি তথ্য জানতে পেরেছি যে, আমি বর্তমানে যে বাসাতে বসবাস করছি এর পাশের বাসাটিই শহিদ পলুর বাড়ি- যা আমাকে আলোড়িত করেছে। আগামী বছর এই লেখাটি আরো তথ্যসমৃদ্ধ ও পরিমার্জিত হয়ে অনলাইন ও প্রিন্ট মাধ্যমে প্রকাশ করার আশাবাদ ব্যক্ত করছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করছি।


------------

শহিদ ওবায়দুর রউফ পলু:

তারুণ্য, বীরত্ব ও আত্মত্যাগ দিয়ে লিখেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আন্দোলনের ইতিহাস।


মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

২৭ নভেম্বর ২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ