Ticker

6/recent/ticker-posts

আলোর উপস্থিতি না থাকলে সবকিছু আঁধারে হারিয়ে যায়


আলোর উপস্থিতি না থাকলে সবকিছু আঁধারে হারিয়ে যায়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো বা শিশু-কিশোর প্রতিভা অন্বেষ প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’ পুনরায় চালু হওয়ার পর থেকে দেশের নানা স্থানের শিশু-কিশোর এবং তাদের অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

আমাদের এই প্রজন্মের শিশুদের মধ্যেও সবাই যে মোবাইল-ইন্টারনেটে আসক্ত নয়, সবাই যে হারিয়ে যায়নি অন্ধকারের অতলান্তে- তার প্রমাণ নতুন কুঁড়ির সাম্প্রতিক এই আয়োজন। এখনকার অন্ধকার সময়েও শিশুরা কতটা মেধাবী, কতটা সৃজনশীল এবং পরিচর্যা পেলে তারা আগামীতে কতটা এগিয়ে যাবে- তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় ছোট্ট বন্ধুদের নানা রকম পারফরম্যান্স দেখলে।

আমরা সবাই জানি এবং ভুক্তভোগী যে— বিগত প্রায় দুই দশক ধরে মোবাইল এবং ইন্টারনেট শিশুদের হাতের নাগালে আসায় তারা নানা রকম কার্টুন দেখা, গেম এবং বয়সের সাথে উপযুক্ত নয়— এমন সব ভিডিও-কন্টেন্ট দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। মেধা এবং মননে ঠিক তেমনভাবে বেড়ে উঠছিল না এখনকার শিশুরা। 

তার উপর উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের রিলস, টিকটক ভিডিও বানানোর প্রতি একটি ব্যাপক ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়। এসবের অনেকগুলোই একদিকে যেমন তাদের বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়, অন্যদিকে সমাজ, রাষ্ট্র অথবা পারিবারিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে— এমন ভিডিও নয়।

অপ্রয়োজনীয় নাচ-গান, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, কথাবার্তা, গালিগরাজ— বেঙ্গাত্বক কনটেন্ট ইত্যাদি করে দ্রুত ভাইরাল এবং খ্যাতি পাওয়ার নেশা পেয়ে বসেছে অনেকেরই মাঝে। আসক্তি আছে আমাদের মতো বড়োদেরও। ফলে ব্যক্তি, পারিবারিক এবং সমাজ জীবনে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তি বিরাজ করছে সর্বত্র। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ ব্যাহত হলে অপসংস্কৃতি বেড়াজালে আবদ্ধ হবে সমাজ— শিশু— এ তো চিরন্তন সত্য।

কিন্তু ৮০/ ৯০ দশকে পরিস্থিতি এরকম ছিল না। তখনকার ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া এবং শারীরিক কসরত হয়- এমন খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। বই ছিল তাদের নিত্য সঙ্গী। পারিবারিক জীবন ছিল সুসংহত। ফলে তখনকার শিশুরা যে মেধা নিয়ে বেড়ে উঠেছে—  তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছে বর্তমানে বাংলাদেশকে। কিন্তু আগামীর বাংলাদেশ নেতৃত্ব দেওয়ার মতো শিশু বেড়ে উঠছে—  এই সময়ে?

হয়তো উঠছে, কিন্তু সেই সংখ্যাটা অনেক কম। ব্যাপক জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত আগামীর বাংলাদেশকে অল্পসংখ্যক মেধাবীরা কি পারবে সঠিক নেতৃত্ব দিতে? নিশ্চয়ই পারবে না। তার জন্যই শিশুদের বর্তমান শিশুদের শিক্ষা, দীক্ষা, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, শারীরিক, মানসিকভাবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। নতুন কুঁড়ি সেই ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি।

অনেকে হয়তো বলবেন— বিগত সময়ে বিজ্ঞানমেলা, গণিত উৎসব/অলিম্পিয়াড, স্কুলভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং নানা ধরনের খেলাধুলার আয়োজন তো হচ্ছেই। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলেও হচ্ছে নানা ধরনের রিয়েলিটি শো। কথা মিথ্যে নয়- তবে এসবকিছু নতুন কুঁড়ির ঊর্ধ্বে নয়।

সমাজের আট/দশ জন মানুষের কাছে নিজেকে/ নিজের ছেলে-মেয়ে অথবা আত্মীয়-স্বজনের কাউকে একটু মেধাবী, একটু শ্রেষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্ত। তার জন্য এবং সেটি কেবল টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। যেটি আর অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়।

আর নতুন কুঁড়ির প্রতি মানুষের আলাদা একটি আবেগ কাজ করে। কারণ এখন যারা অভিভাবক তারা সবাই বেড়ে উঠেছেন ৮০ এবং ৯০ এর দশকে। এবং সেই সময়টা ছিল নতুন কুড়ির জমজমাট সময়। তখন মোবাইল ফোনের অস্তিত্ব ছিল না। ছিল টেলিভিশন— তাও আবার সবার ঘরে ঘরে ছিল না। 

যাদের বাড়িতে ছিল তাদের বাড়ির একটি ঘর কিংবা একটি উঠান ছেলেমেয়েদের মিলন মেলায় পরিণত হতো। শুক্রবার হলেই দল বেঁধে সবাই বসে যেত টিভি সেটের সামনে। সুস্থ বিনোদন মাধ্যম হওয়ায় সৃজনশীল মনোভাব ও মেধা চর্চার প্রেরণা অর্জনের সাথে সাথে তখন পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়ে উঠতো।

দেশের কোনো সরকার পরিবর্তন হলে বিগত সময়ের মন্দ দিকগুলো পরিবর্তন হোক, বন্ধ হয়ে যাক- কিন্তু ভালো জিনিসগুলোর ধারাবাহিকতা অব্যহাত থাকুক। এমন মানসিকতা না থাকলে এই সমাজ, এ রাষ্ট্র কখনোই ভালোর দিকে, আলোর দিকে এগিয়ে যাবে না। আর আলো না থাকলে অন্ধকারে ছেয়ে যাবে চারপাশ।

আমাদের সুন্দর আগামী পিউ মল্লিকসহ নতুন কুঁড়িতে অংশগ্রহণকারী সকল ছোটবন্ধুদের জন্য শুভ কামনা রইল।


-----

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

২৫ অক্টোবর ২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ