Ticker

6/recent/ticker-posts

রক্ত ঝরার দিনে : মিন্নাত আলী


রক্ত ঝরার দিনে : মিন্নাত আলী

পঁচিশে অক্টোবর— উনিশ’শ একাত্তর।

রোজার চতুর্থ দিন। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেছি, আমাদের নাইট গার্ড এসে বললে, গতরাতে নন্দনপুর থেকে পাঁচজন মুক্তিফৌজকে ধরে এনেছে। একজন হিন্দু–ওকে রাজাকার মঞ্জিলে রেখেছে, আর চারজন আছে জেলহাজতে।

খবরটায় বড় দমে গেলাম। গত ক'দিন ধরে শহরের আশপাশ গ্রাম থেকে মুক্তিদের তৎপরতার সুখবরই পাচ্ছি, এমন দুর্ঘটনার কথা তো কল্পনাও করিনি। এতদিন রোজই নতুন নতুন সাফল্যের খবর এসেছে, আর এসেছে, মনের অগোচর থেকে সুর হীন গান : জয় হবে হবে জয়- বাঙালির তরে এই দেশ, দানবের তরে নয়।

কিন্তু আজ অমনটা হলো কেমন করে?
শুনলাম কোন রাজাকার নাকি বিশ্বাসঘাতকতা করে ধরিয়ে দিয়েছে। প্রায় শ' আড়াইশ মুক্তিফৌজ ওপার থেকে ট্রেনিং শেষ করে মজলিশপুর নন্দনপুর দিয়ে পশ্চিমে ভৈরব অঞ্চলের দিকে যাচ্ছিলো। এ্যাদ্দিন যে রাজাকারটি এই পথ দিয়ে মুক্তি পারাপার করতো সে-ই গতরাতে মিলিটারিকে খবর দেয়। হিন্দু ছেলেটির পায়ে গুলি লেগেছে, মুসলমান ছেলে চারটি অক্ষত দেহে আত্মসমর্পণ করে। আর বাদবাকি সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

তক্ষুনি মনে মনে ঠিক করি এ মুক্তিফৌজটির সাথে আলাপ করবো। ওর সাথে যে আমাদের অদৃশ্য সূত্রের আন্তরিক বন্ধন রয়েছে তা জানিয়ে ওকে উৎসাহ দেবো।

সকাল আটটায় কলেজে গেলাম। পাকিস্তান নামক ইসলামী রাষ্ট্রে এবার নতুন নতুন ক'টি অদ্ভুত ফরমান জারি করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীকে পুরোপুরি মুসলমান বানাবার মহৎ উদ্দেশে স্কুলগুলোতে কোরআন শরীফ অবশ্য পাঠ্য করা হয়েছে; মুসলমান ছাত্র-শিক্ষককে জোহরের নামাজ স্কুলে-কলেজে পড়া বাধ্যতামূলক করেছে। এ হেন ইসলামের জবরদস্ত সরকার আর আর বারের মতো ‘রমজানের পবিত্রতা' রক্ষার জন্য শিক্ষায়তন বন্ধ না করে খোলা রাখার হুকুম দিলেন। আমরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে হুকুম তামিল করছি।

তিন চারজন অধ্যাপক উপস্থিত দেখলাম। ওঁদের বিষণ্ন চোখ-মুখ দেখেই আমার সন্দেহ হলো, নিশ্চয়ই ওঁরা মুক্তির দুর্ঘটনার কথা শুনেছেন।
: নন্দনপুরের ঘটনা শুনেছেন, স্যার? আমাকে বসবার সময়টুকুও দিলেন না ওঁরা।
কলেজে ছাত্রী নেই বললেই চলে। আমরা অফিসে বসে নিচু গলায় মুক্তিবাহিনীর কথাই বলাবলি করছি, এমন সময় মোটর গাড়ির হর্ন শুনে চমকে উঠলাম। মিলিটারির গাড়ি। মেজর খালেদ মাহমুদ আসেন মাঝে মাঝে। তিনিই এলেন নাকি? আমাদের আতঙ্ক ভাবের মধ্যেই মেজর খালেদ মাহমুদ মচমচ করে আমার অফিসরুমে ঢুকলেন।
আমি দাঁড়িয়ে মেজরকে অভ্যর্থনা করলাম।
মেজর চেয়ারে বসতে বসতে জানতে চাইলেন, আজ ছাত্রী কত? শতকরা মাত্র চার-পাঁচজন ছাত্রী কলেজে এসেছে শুনে তিনি গর্জে উঠলেন—
: হাউ ফানি! আপনারা সব ছাত্রী আনছেন না কেন?
: আমরা তো চেষ্টা করছি; ছাত্রীরা আসছে না যে।
: চেষ্টা করছেন না কচু? মেজর সহসা মিলিটারি মূর্তি ধারণ করলেন। আমাদের আত্মা ‘পানি-পানি’ করতে লাগলো।
: আমরা সব খবরই পাই। আসলে আপনারাই ছাত্রীদের ‘ডিসকারেজ’ করছেন। আমাকে ওদের ‘এড্রেস’ দিন। আমার সেপাই দিয়ে ওদের বাড়ি থেকে ধরে আনবো।
মিলিটারির কাছে ছাত্রীদের বাড়ির ঠিকানা দেওয়ার যে কি অর্থ তা বুঝি। তাই কাঁচুমাচু হয়ে বড় বিনীতভাবে বললাম—
: আর দু'দিন সময় দিন সাহেব, সব না পারি অর্ধেক ছাত্রীকে কলেজে হাজির করবোই, দেখবেন।
মেজর একটু দমলেন মনে হল।
হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ তুললেন। বিজ্ঞের মতন বলে চললেন, ‘জানেন, দেশে এই যে বিশৃঙ্খলা দেখছেন, সব হিন্দুদের ‘কন্সপাইরেসি'। এই ইস্ট পাকিস্তানের হিন্দুরা ইন্ডিয়ার সাথে মিলে-মিশে আমাদের পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে চাইছে। এই তো আজ রাতেই একটা হিন্দু ‘মিসক্রিয়েন্ট’কে ধরা হয়েছে। রাজাকার ক্যাম্পে দেখতে পাবেন। আমরা এ দেশে একটা হিন্দুও আস্ত রাখবো না। পাকিস্তান হবে কেবলমাত্র মুসলমানদের হোমল্যান্ড।'
আমরা চুপ করে মেজরের অমৃত বাণী নীরবে হজম করতে থাকি। মিলিটারির কথা, মানতেই হবে। যুক্তি নয়, সত্য নয়, হয় তো অর্থহীনও বটে, তবু আমাদের মেজরের কথার প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। সাহস নেই।
আমি চুপ থেকে ভাবছিলাম পশ্চিমাদের মানসিকতার কথা। এ এক অদ্ভুত ও উদ্ভট মানসিকতা। আর এই অপূর্ব মনোভাবটি কাজ করছে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট থেকে তার সামান্য পশ্চিমা সৈনিকটি পর্যন্ত। তাই তো আমাদের শহরে দেখছি, হিন্দুর ঘরবাড়ি সব নিলামে বিক্রি করছে, হিন্দু পেলেই গুলি করে মারছে, আর হিন্দুর নাম শুনেই রক্ত গরম করে বড়বড় লাফ দিচ্ছে। আর এদিকে খোদ প্রেসিডেন্ট সাহেব বেতারে ওপারের উদ্দেশ্যে বলছেন–হিন্দু মুসলমান যারা ওপারে গেছো সবাই ফিরে আস— আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম।
হায়রে রাজনীতি!
চরম অপমান আর কঠোর শাসানী দিয়ে মেজর চলে গেলেন। সে-দিনের মতো বিদায় হলেন মেজর খালেদ মাহমুদ— ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের স্কুল কলেজের ভারপ্রাপ্ত মিলিটারি অফিসার।
আমরা কলেজের অধ্যক্ষ ও অধ্যাপকবৃন্দ মিলিটারি মেজরের সব গালি ও গ্লানি মাথা হেঁট করে গ্রহণ করলাম। কলেজ শেষ করেই ছুটলাম কালীবাড়ির দিকে। অন্নদা স্কুলের সামনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিখ্যাত সেই কালীবাড়িটাকে করা হয়েছে রাজাকার ক্যাম্প। কালীবাড়ির সুদৃশ্য ফটকে আগে যেখানে পাথর খোদাই করা লেখা ছিল ‘শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি'—সে লেখা ভেঙে সমান করে ঝুলিয়েছে নতুন সাইনবোর্ড : রাজাকার মনজিল—রহমান বাড়ি। বাংলা ও উর্দু হরফে।

কালীবাড়ি রোডে মুসলমানের ভিড়। শহরে তো গত সাত মাস ধরে একটি হিন্দুও নেই। মুসলমানরা এসেছে মুক্তিফৌজটি দেখার জন্য। শহর ও আশপাশ গ্রামের ছেলে বুড়ো সবাই। দলে দলে যাচ্ছে— দল বেঁধে আবার ফিরে আসছে। সবার মুখই আবার মন্তব্যমুখর।
: এটাই মুক্তি? এ তো ছেলেমানুষ!
: কলেজের ছাত্র নাকি? কি সুন্দর চেহারা দেখেছো?
: দেখেন গিয়ে স্যার, মাটিতে পড়ে রয়েছে! ডাক্তার একবারও আসেনি।
ভিড় ঠেলে এগুতে থাকি।
কিন্তু না, সামনে এগুনো আর সম্ভব নয়। ফটকের সামনেই বেশি ভিড়। ওখানে দাঁড়িয়েই সবাই ভিতরে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। ফটকে সশস্ত্র এক রাজাকার দাঁড়িয়ে। রাজাকারটি দর্শকের ঠেলা সামলাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠেছে ঃ এই মিয়ারা, আর সামনে আগাইবেন না। এইবার যান। ‘আউশ’ মিটছে তো?
ফিরে এলা।
ভিড় কমলে বিকালের দিকে আসবো খন।
ফেরার পথে নানা মুখ থেকে ছেলেটির কিছু পরিচয় পাই। নাম তার আশু রঞ্জন দে। ভৈরব কলেজের বি.এ. ক্লাসের ছাত্র। স্পোর্টসম্যান। সব খেলাতেই ওলদ। ভৈরব বাজারে ওদের মিষ্টির দোকান আছে। রাস্তায় এসে শুনলাম, থানাতে যে চারজন মুক্তিকে আটক করেছে, তাদের একজনের বাড়ি নাকি আমাদের ভৈরব অঞ্চলে। থানাতে গিয়ে কেউ কেউ ওদের দেখেও এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের ছাত্রও আছে একজন।
থানায় যেতে আমার দস্তুরমতো লজ্জাবোধ হলো। ওরা যদি আমার চেনা লোক হয়ে থাকে আমিও তো ওদের পরিচিত হবো। আমি তো আমার বিচারে ওদের কাছে অপরাধী। ওরা, দেশের তরুণরা দেশের মুক্তির জন্যে সংগ্রাম করছে, আর আমি কিনা শহরে বসে বসে আরামসে চাকুরি করছি। এ পোড়া মুখ নিয়ে ওদের সামনে যাই কি করে?
লজ্জায় ওদের সামনে গেলাম না।
বিকালে এফতারের আগে আরেকবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না—একই অবস্থা। কালীবাড়িতে ভিড়ের কমতি নেই। সমানে দর্শনার্থী আসছে। একনজর, শুধু একনজর দেখতে চায়— মুক্তি কেমন। এ কেমন যোদ্ধা, যাদের পাকিস্তানি বীর সেনানীর মতো যোদ্ধারাও বলে— মুক্তি কোন চীজ? ইনসান, না জ্বীন?
পরের দিনও যখন আশু রঞ্জন দে কে দেখার কোন সুযোগ করতে পারলাম না, তখন মনে মনে সিদ্ধান্ত করি— পর দিন খুব ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই চলে যাবো কালীবাড়ি ‘রাজাকার মঞ্জিলে'। তখন নিশ্চয় লোকের ভিড় থাকবে না।
তা-ই করলাম।

২৭শে অক্টোবর শেষ রাতে ছেহরী খেয়ে আর ঘুমালাম না। ফজরের নামাজ পড়ে নামাজী পোশাক নিয়েই বের হয়ে পড়ি। হ্যাঁ ‘রাজাকার মঞ্জিলে' মুক্তি দর্শনার্থী নেই বললেই চলে। ফটকের সামনে যেতেই প্রহরী রাজাকারটি আমায় সালাম দিলে। বুঝলাম, আমার সাদা টুপি, দাড়ি আর সাদা পাজামা পাঞ্জাবীই ওকে নরম করেছে। আমি ভিতরে যেতে চাইলে সে কোন বাধাই দিল না।
ধীরে ধীরে মন্দিরের দিকে এগুলাম।
দু'দিন অনাদৃত অবহেলায় মাটিতে রাখার পর রাত থেকে মন্দিরের বারান্দায় রেখেছে।
কাছে, একেবারে বারান্দার উপর আশুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। সুন্দর স্বাস্থ্যবান এক তরুণ। মাথায় রুক্ষ কোঁকড়ানো চুল, পরনে শার্ট, হাঁটুর নিচে দিয়ে তখনো লাল কালো রক্ত ঝরছে। একটা পুরানো চাদর দিয়ে পা দু'খান ঢেকে আশু কোন রকমে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছে। আমি হঠাৎ যেন বোবা হয়ে গেলাম। জানি, দু'দিন ধরে কোন খাবার দেওয়া হয়নি। কোন রকম ওষুধ দেয়নি। বরের প্রতি এ চরম অবহেলা দেখে বলতে চাইলাম— আশু, তুমিতো জান, তুমি সত্যের জন্য লড়ছো। জেনো, সত্যের ক্ষয় নেই। তোমার রক্ত বৃথা যাবে না। তোমার জন্য আমরা গর্বিত, আমরা তোমার সাথেই আছি।
কিন্তু পাশেই দেখি, বারান্দার নিচে এক রাজাকার দাঁড়িয়ে। আমার মনের কথা ভাষায় প্রকাশ করার সাহস পাই না। মুক্তির সমর্থক হিসেবে যদি পাকড়াও করে।
শুধু চোখ ভরে বাঙালি বীর-যোদ্ধাকে দেখতে লাগলাম। দেখলাম বাংলাদেশকে স্বাধীন করার মন্ত্রে দীক্ষিত এক তরুণ বাঙালির অপূর্ব আত্মাহুতির করুণ মধুর দৃশ্য।
এক সময় আশুর পাশে বসে পড়লাম।
আশু তো প্রথম কোন কথাই বলতে চায় না। আমাকে ওর বিশ্বাস নেই – আমি যদি দালাল বা গুপ্তচর হয়ে থাকি। কিন্তু আমার পরিচয় দিতেই সে বিহ্বলের মতো আমার দিকে তাকালো। তারপর সজল চোখে, ক্ষীণ কণ্ঠে বললো তার কথা। তাদের ধরা পড়ার কথা।
আগরতলায় ট্রেনিং শেষ করে ওরা প্রায় আড়াইশ মুক্তিযোদ্ধা— বিএলএফ-এর ৮৮ জন ও এফএফ-এর ১৪২ জন ২১শে অক্টোবর সীমান্ত অতিক্রম করে। দিনের বেলায় লুকিয়ে থেকে রাতের অন্ধকারে রাজাকার ও দালালদের ফাঁকি দিয়ে নৌকায় করে ওরা বাসুটিয়া ইসলামপুর হয়ে মজলিশপুর পৌঁছে। এ লাইনে প্রত্যেক গ্রামেই মুক্তিফৌজের ইনফরমার ও এসকোর্ট রয়েছে। ওদের সাহায্য ও নির্দেশেই ওরা ২৫শে’র রাতে মজলিশপুর আসে। এই দলের নেতৃত্ব করছিল ভৈরবের শাহাদাত হুসেন বেণু। বেণু ছাড়া ভৈরবের আজাদ, আক্কাস, জাহের আরও ক'জন মুক্তিযোদ্ধাও ছিল আশুর সাথে।
২৫ শে'র শেষ রাতের দিকে আশুরা অস্ত্রশস্ত্র সব বোঝা করে মাথায় নিয়ে মজলিশপুর থেকে নন্দনপুরের রাস্তায় ডবল মার্চ করে দৌড়াতে দৌড়াতে সি-এন্ড-বি রোড পার হতে চায়। এই বিরাট দলটি দৌড়াতে দৌড়াতে যখন নন্দনপুর পার হয়েছে, একদল সি-এন্ড-বি সড়কও অতিক্রম করে ফেলেছে এমন সময় ‘এমবুস’ করা রাজাকার ও পুলিশ বাহিনী হঠাৎ গুলি ছুঁড়তে থাকে। এই অতর্কিত আক্রমণে মুক্তিফৌজ দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন অস্ত্রশস্ত্রের বোঝা ফেলে দিয়ে মুক্তিরা আত্মরক্ষা করে পালায়। আশুর পায়ে গুলি লাগায় সে আর দৌড়াতে পারেনি— এক ধানক্ষেতের মধ্যে পড়ে যায়।
: কি মৌলভী সাব— অত ফিসফাস কইরা কি কথা কইতেছেন অতক্ষণ? রাজাকারটি এগিয়ে এল সামনে। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
: বলছিলাম, বাঙালি হয়ে ওরা বাংলাদেশের অতো ক্ষতি করছে কেন? রাজাকারকে খুশি করার জন্য আমাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়।
রাজাকারটি এখানকার নয়—–কিশোরগঞ্জ থেকে পাঠান হয়েছিল কসবা যুদ্ধক্ষেত্রে। ও আমাকে চেনে না জানে না। ও আমার কথায় খুশি হয়ে বলে উঠলো : অতদিন পুল-রাস্তাঘাট ভাইঙ্গা দেশের ক্ষতি করছিল এখন দেখেন নিজের ক্ষতি হওন শুরু হইছে। সব শালাদের এমন কইরা ধরবাম।
রাজাকারটি সরে গেলে আশু নিচু সুরে বললো : জানেন স্যার, গতকাল একটা রাজাকার বিশ্রী গাল দিয়ে আমার চুল ধরে টান দিয়েছিল। আমি সহ্য করতে পারিনি। মাথা তুলে দেখলাম রাস্তায় বহু লোকের ভিড়। আমি স্থান কাল ভুলে চিৎকার করে উঠলাম : দেখতে পাচ্ছ, আমাকে দেখার জন্য কতশত লোক আসছে? তুমি রাজাকার, বাংলাদেশের কলঙ্ক, মরলে শিয়াল কুকুরেও খাবে না—
ততক্ষণে ফটকে দর্শনার্থীর ভিড় শুরু হয়ে গেছে। লোকজনদের কেউ কেউ ফটক পেরিয়ে মন্দিরের কাছেও আসছে। আর থাকা যায় না, আমাকে সন্দেহ করতে পারে কেউ।
: এবার আস। ভৈরব গেলে তোমার কথা বলবো সবাইকে-
আশু রঞ্জন দে, পঙ্গু, মৃতপ্রায় বীর মুক্তিফৌজ আশু ধীরে ধীরে আমার চোখে চোখ রাখলো
: মরণে আমার কোন ভয় নেই স্যার। স্বাধীনতার মন্ত্রে আমরা দীক্ষিত। আমার রক্ত যেখানে পড়েছে সে স্থান পবিত্র—সে স্থান স্বাধীন হবেই দেখবেন।
২৯শে অক্টোবর শুক্রবার খুব সকালে উঠেই ছুটলাম রাজাকার মঞ্জিলে। কালীবাড়ি রোডে ভিড় নেই, সহজেই পৌঁছলাম ফটকের কাছে। সশস্ত্র পাহারাদার দাঁড়িয়ে। রাস্তার উপর দু-একজন পথচারী।
ভিতরে উঁকি দিলাম। না, কালী মন্দিরের বারান্দায় বা কালীবাড়ির মাঠে আহত আশু নেই।
রাজাকারটির কাছ থেকে আশুর খবর সংগ্রহ করলাম। গেল রাতে পঙ্গু, মৃতপ্রায় আশুকে রাজাকার মঞ্জিল থেকে ট্রাকে করে নিয়ে গিয়ে নিয়াজ পার্কের পাশে কুড়ুলিয়া খালে গুলি করে মারা হয়েছে।
আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো আশুর রক্তাক্ত দেহটা। মুক্তিকামী বীর সন্তানের পূত রক্তে রঞ্জিত হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি। মনে পড়লো কবিগুরুর বাণী—
বীরের এ রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রু ধারা
এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা?
যখন বাড়িমুখো রওয়ানা হলাম, দেখি পূর্বাকাশে নতুন সূর্য উঠছে। লাল এক সূর্য। আমার মনে হলো, আশুর বুকের লাল রক্তে যেন সূর্যটা বেশি লাল হয়ে উঠেছে।
লালে লাল এক নতুন দিনের সূর্য।
৩০ শে অক্টোবর, ১৯৭১
( রক্ত ঝরার দিনে : মিন্নাত আলী, বই : আমি দালাল বলছি, পৃষ্ঠা ২১-২৬, চতুর্থ সংস্করণ, মিরা প্রকাশনী, প্রথম সংস্করণ, ২০০৮)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ