১৯৩৫ সালে বিশ্ব সফরে বের হোন বিশ্ববিখ্যাত সংগীতজ্ঞ, সুর সম্রাট, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। তখন তাঁর বয়স ৬৭ বছর। হাঙ্গেরির সফরকালে রাজধানী বুদাপেস্টে অবস্থানকালে সেখানকার কয়েকজন পাশ্চাত্য সংগীতবোদ্ধা আসেন তাঁর সাথে দেখা করতে। এসময় তাঁরা তাঁর বিখ্যাত সরোদ-বাদন শোনার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তখন পড়ন্ত বিকেল, ঘরোয়া আয়োজন। আলাউদ্দিন খাঁ বাজালেন ভৈরবী রাগ, যেটি মূলত ছিল সকাল বেলা বাজানোর রাগ। বাজনা শেষ করে খাঁ সাহেব তাঁর বাজনা সম্পর্কে তিনি তাঁদের অভিমত জানতে চাইলেন।
বিস্ময়ে বিমুগ্ধ একজন বললেন, আমরা যেন গির্জায় বসে প্রার্থনা করছি। আরেকজন বললেন, ভোরবেলা একলা বসে আছি, যার উপাসনা করছি সে এলো না। শেষজন বললেন, আপনাদের সংগীতের সুরে বড় কান্না আসে।
একটি রাগ শুনে তিনজনের তিনরকম বিশ্লেষণ থেকে অনুমান করা যায়, কত বড় মাপের শিল্পী হলে এক সুরে তিনটি মাত্রা সংযোজন করতে পারেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন তেমনি এক বিস্ময়কর প্রতিভা, যাঁর সুরে তিনি একাধিক ভাব সৃষ্টি করতে পারতেন।
ইউরোপে ভ্রমণ নিয়ে স্মৃতি কথা তিনি বলেন, “ইউরোপে অনেক কিছু দেখলাম। তখন জার্মানিতে হিটলার, ইতালিতে মুসোলিনি। চারিদিকে যুদ্ধের হুমকি। আমি রাজনীতি বুঝি না। কিন্তু আরব প্যালেস্টাইন থেকে শুরু করে ইউরোপের সর্বত্র দেখলাম আধুনিক সভ্যতার পরিচয়। আমাদের দেশ তখন দারিদ্র্যে, অশিক্ষায় কত পিছিয়ে ছিল। হিন্দু মুসলমানে ঝগড়া, ব্রাহ্মণ শূদ্রে ছোঁয়াছুঁয়ির মানা, এমন অন্ধতা। আর পশ্চিম তখন সভ্যতায়, শিক্ষায়, জ্ঞানে কত এগিয়ে গেছে। কে বলে ইউরোপ যন্ত্রসভ্যতার দাস, জড়বাদী। তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাহায্যে মানুষের আধ্যাত্মিক শক্তিও তারা বাড়িয়ে তুলেছে। সেখানে মানুষ মানুষের মত বাঁচতে শিখেছে আর আমরা নির্জীব তামসিকতায় আচ্ছন্ন!”
—
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ভারতীয় সংগীত ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি অনেক রাগরাগিণী সৃষ্টি করেছেন, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন, বিশ্ববিখ্যাত শাগরেদ তৈরি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন সেনী-মাইহার ঘরানা সংগীত। বর্তমানে সারা বিশ্বে তার সাগরেদরা সেনী-মাইহার ঘরানা সংগীত পরিবেশন ভারতীয় ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতকে উজ্জীবিত করে রেখেছেন।
তিনি জন্মেছিলেন তিতাস বিধৌত এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া। নবীনগরের প্রত্যন্ত অঞ্চল শিবপুরে। খাঁ বাড়ির দুরন্ত বালক আলম। মা বাবা তাকে বিদ্যা শিক্ষার জন্য স্কুলে পাঠায়। কিন্তু স্কুলে তাঁর মন বসে না তিনি ছুটে যান গান-বাজনার আসরে। একদিন ধরা পড়লেন। বাবা-মা শাসন করলেন। বালক আলম বুঝলেন, বাড়িতে থাকলে তার গান শেখা হবে না। তিনি বাড়ি ছেড়ে পালালেন।
তারপর কত কথা, কত ইতিহাস। তাঁর আলম থেকে আলাউদ্দিন খাঁ হয়ে ওঠার সেই ইতিহাস যত রোমাঞ্চকর, ততই বিস্ময়কর, ততই প্রেরণাদায়ক। আলাউদ্দিন খাঁ থেকে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বিশ্বখ্যাত সংগীতজ্ঞ এবং সুর সম্রাট হওয়ার সেই ইতিহাস যত শুনি, পড়ি, ততই মুগ্ধ হই, ততই আপ্লুত হই। ততই গৌরব অনুভব করি যে, তাঁর জন্ম জেলায় আমার জন্ম এবং বসবাস।
আবার এই জন্য লজ্জিত হই যে, একদল মানুষ যখন তাঁকে ভক্তি-শ্রদ্ধায় ‘বাবা আলাউদ্দিন’ নামে সম্বোধন করে। তখন তাঁর নিজের জেলার মানুষ হয়ে আমরা তাঁর স্মৃতিধন্য বাড়ি পুড়িয়ে দেই, তাঁর ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রসহ ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট পুড়িয়ে দিই।
আজ তার মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ভারতের মাইহারে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই বিশ্ববরেণ্য সংগীতসাধক, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। একজন সাধক ও সুরস্রষ্টা হিসাবে তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে। এই মহান শিল্পীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
---
শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
লেখা : সংগৃহীত ও পরিমার্জিত

0 মন্তব্যসমূহ