Ticker

6/recent/ticker-posts

যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট : প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির শূন্যতা, পূরণ হোক

     

             যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট : প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির শূন্যতা, পূরণ হোক

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ইউনিটের কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও লোকনাথ দিঘি ময়দানে আজ ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচনে পাঁচটি পদের বিপরীতে ৪৫ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩ জন, সেক্রেটারি পদে ৫ জন ও ৫টি সদস্য পদে মোট ৩৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

আন্তর্জাতিক সেবামূলক এই সংগঠনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনিটে আজীবন সদস্য তথা ভোটার সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। এত সংখ্যক ভোটার দেশের আর কোনো জেলায় আছে বলে জানা নেই। খবরে প্রকাশ, সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৪১৬২ জন সদস্য তাদের মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রার্থী, তাদের কর্মী-সমর্থক এবং ভোটারদের উপস্থিতিতে কয়েক হাজার মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় নির্বাচন কেন্দ্র ও এর আশেপাশের এলাকা।

বলাবাহুল্য, এই সংগঠনের ভোটার যারা, তারা সমাজের সচেতন, শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি হিসেবে পরিচিত। সমাজের একটি সচেতন ও শিক্ষিত শ্রেণি ভোটার হওয়ায় এই নির্বাচনে বিজয়ীরা স্বভাবতই নগরবাসীর কাছে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেন। এসব কারণেই রেড ক্রিসেন্ট-এর কমিটিতে স্থান পাওয়া কিংবা নির্বাচন করা নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। তবে রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট শুধু সম্মান বা মর্যাদা প্রাপ্তির জায়গা নয়। আর্তমানবতার সেবায় মানব সমাজের বৃহৎ কল্যাণে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘মানবতা, পক্ষপাতহীনতা, নিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা, স্বেচ্ছামূলক সেবা, একতা এবং সার্বজনীনতা’- এই সাতটি মূলনীতির ওপর কাজ করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই সংগঠন।

পীড়িত মানুষের প্রতি পক্ষপাতহীন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ হিসেবে কাজ করে এই সংগঠন। প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্যোগে দ্রুত এগিয়ে আসে এর নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। সারা বিশ্বে প্রায় সকল দেশে একই ফর্মুলায় কাজ করে এই প্রতিষ্ঠান। তবে বাংলাদেশে রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট এবং তার সহযোগী সংগঠন ‘যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট’ মানুষের কাছে পরিচিত ‘রক্তদান’ এবং ‘কম্বল বিতরণকারী’ সংগঠন হিসেবে। এটি রেড ক্রিসেন্ট-এর বৃহৎ অর্জন, সুনাম ও মর্যাদার পরিপন্থী একটি ভাবনা। নেতিবাচক এই ভাবনার পিছনে আছে রেড ক্রিসেন্ট-এর কাজের পরিধি সম্পর্কে যথাযথ না জানা এবং এর রিসোর্সগুলো পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার না করা। বিশেষ করে যুব রেড ক্রিসেন্টকে।


যুব রেড ক্রিসেন্ট, রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের মূল চালিকাশক্তি। রেড ক্রিসেন্টের প্রায় যাবতীয় কাজকে মাঠ পর্যায়ে সচল ও সক্রিয় রাখে এই ইউনিট। এর আছে নিজস্ব গঠনতন্ত্র, কর্মপন্থা এবং পর্যাপ্ত বাজেট। যা পুরোপুরি সদ্‌ব্যবহার করতে পারি না আমরা। যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটকে একটি দক্ষ এবং শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে পরিণত করা গেলে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ তথা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ‘ক্রাইসিস মোমেন্ট’ পাশে পাবে একদল প্রকৃত সাহায্যকারীকে।

অতীতের মতো বর্তমান পৃথিবীও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভরপুর। যুদ্ধ, লড়াই-সংঘাতসহ, সড়ক এবং নৌ দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস ইত্যাদি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ছাড়াও বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোতে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানো এবং আহত মানুষদের সেবা দান করার জন্য যুব রেড ক্রিসেন্টকে গড়ে তুলতে হবে। এবং এই কার্যক্রম শুধু জেলা ইউনিটের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা নয় বরং জেলার প্রতিটি যুবক-যুবততিকেই সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।


এর জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নয়টি উপজেলার প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘যুব রেড ক্রিসেন্ট’-এর শাখা গড়ে তুলতে হবে। বলাবাহুল্য সহপাঠ হিসেবে ‘যুব রেড ক্রিসেন্ট’ বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত। জেলার প্রতিটি স্কুলে ‘যুব রেড ক্রিসেন্ট’ এর কমিটি তৈরি করা গেলে, এর মাধ্যমে একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

আমরা জানি, ‘যুব রেড ক্রিসেন্ট’ সদস্যদের জন্য নানা ধাপে বিভিন্ন ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা আছে।

প্রথমত—জীবন রক্ষাকারী প্রশিক্ষণ : First Aid, CPR, Search and Rescue ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত—দুর্যোগ মোকাবিলা: DMER, Fire Safety, PSS ইত্যাদি।

তৃতীয়ত—নেতৃত্ব ও মানবিক সেবা : RFL, ToT, Leadership Training নামে পরিচিতি।


এই প্রশিক্ষণগুলোর মাধ্যমে একজন যুব সদস্য শিখতে পারে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের পরিচিতি, এর ইতিহাস এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে। জানতে পারে, রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্টের সাতটি মৌলিক নীতি। শিখতে পারে, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ। রক্তক্ষরণ বন্ধ করা, ক্ষত ব্যান্ডেজ করা, ফ্র্যাকচার বা হাড় ভাঙা, পোড়া এবং সাপে কাটার প্রাথমিক চিকিৎসা ও রোগীর স্থানান্তরের মতো ইত্যাদি বিষয়গুলো শিখতে পারে এই প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।

তারা শিখতে পারে আপৎকালীন উদ্ধার পদ্ধতি তথা রশি ও গিঁটের ব্যবহার, স্ট্রেচার তৈরি, এবং উঁচু স্থান বা পানি থেকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার প্রশিক্ষণ। তারা শিখতে পারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সাড়াদান পদ্ধতি। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রস্তুতি এবং সাড়াদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এর দক্ষ যুব সদস্যরা।


এছাড়া ভূমিকম্পকালীন প্রস্তুতি এবং অগ্নিকাণ্ড রোধে ফায়ার ড্রিল, ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহারসহ তারা আগুন নেভানো ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ শিখতে পারে। দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মানসিক সান্ত্বনা ও সহায়তা প্রদান করার জন্য মনোসামাজিক সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারে তারা।

“যুদ্ধ, দুর্যোগ বা অভিবাসনের কারণে বিচ্ছিন্ন পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করা এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করাও যুব রেড ক্রিসেন্টের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।


নিরাপদ অভিবাসন এবং অবৈধ অভিবাসন রোধে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যুব স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সেশন পরিচালনা করাও যুব রেড ক্রিসেন্টের কাজ। এছাড়াও রয়েছে দক্ষ যুব স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্য থেকে নতুন স্বেচ্ছাসেবক তৈরির জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান। এসব কাজে ইন্টারনাশনাল প্রশিক্ষণ ও বৃত্তিও পাওয়া যায়। যার মাধ্যমে তৈরি হয় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ।

একবার ভাবুন তো, আপনার সন্তানরা যদি যুব রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে এই সকল প্রশিক্ষণগুলোর এক বা একাধিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারে, “তাহলে তারা বিরূপ পরিস্থিতিতে নিজের জীবন রক্ষা করতে পারবে,পাশাপাশি বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সহজে ও সঠিক উপায়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারবে।” বিষয়টি আপনার জন্য কত ফলপ্রসূ হবে।


এসব ছাড়াও যুব রেড ক্রিসেন্ট সদস্যদের জন্য শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক কার্যক্রম প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজের সুকুমার বৃত্তি তথা কবিতা আবৃত্তি, গল্প বলা, উপস্থিত বক্তৃতা, উপস্থাপনা, ছবি আঁকা, অভিনয়, নাচ ও সংগীত শিখতে এবং পরিবেশন করতে পারে। “এসবের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের জেলা ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগও রয়েছে।”  নানা ধরনেরও খেলাধুলাও যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রমের অংশ। কিন্তু আমরা কি যুব রেড ক্রিসেন্ট-কে এইভাবে চিন্তা করি? সম্ভবত করি না।  

কাজেই যুব রেড ক্রিসেন্ট যতই শক্তিশালী হবে, ততই শক্তিশালী হবে জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটগুলো। এর মাধ্যমে আমাদের দেশ ও সমাজ পাবে একটি দক্ষ জনগোষ্ঠী, যারা বিপদে-আপদে আমাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের নবনির্বাচিত কমিটির কাছে জেলাবাসী সকলের প্রত্যাশা এমনই।


ব্রাহ্মণবাড়িয়া যুবরেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের আছে এক সোনালি অধ্যায়। আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেক ব্যক্তিবর্গই অতীতের যুব ক্রিসেন্ট ইউনিট থেকে তৈরি হয়ে এসেছেন এবং বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভবিষ্যতের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নেতৃত্ব তৈরি করার মতো ‘যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট’ কি আমাদের তৈরি আছে?

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেড ক্রিসেন্ট ও যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মাঝে যে শূন্যতা, সেটা নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে পূরণ হোক। নবনির্বাচিত সকলের জন্য শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানাচ্ছি।


পরিশেষে ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা, মহান মানবআত্মা জ্বীন হেনরি ডুনান্ট-এর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের লেখা এখানেই শেষ করছি।

শুভেচ্ছাসহ

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংযুক্ত ছবিগুলো ২০১১-১২ সালে উপ যুবপ্রধান -০১ হিসেবে আমার যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রমের কিছু অংশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ