Ticker

6/recent/ticker-posts

যেভাবে বেড়ে উঠি


 স্কুল পালিয়ে সময় কাটানোর জায়গা হিসেবে লোকনাথ পার্কের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের বিশাল দুটি কড়ইগাছের তলাকে বেছে নিলাম আমরা। আমি, রহমতউল্লাহ, জবান, চান্দ মিয়া আর আরিফ মিয়া বলে একটি দুর্দান্ত ছেলে একজোট হয়ে স্কুল পালানোর ব্যাপারে বেশ পাকা হয়ে উঠলাম। আমাদের আড্ডার একমাত্র বিষয় ছিল বালকসুলভ অ্যাডভেঞ্চারের গালগল্প। আমাদের একমাত্র পাঠ্যবিষয় ছিল দুঃসাহসিকতাপূর্ণ উপন্যাস, গোয়েন্দা গল্প ও ভ্রমণকাহিনি। আর স্বপ্ন, বাড়ি থেকে দেশ-দেশান্তরে পাড়ি জমানো। আজ স্বীকার করি, আমাদের স্বপ্ন-কল্পনা স্বাভাবিক ছিল না। আমরা ভাবতাম, আমরা একদিন জগতের অশেষ উপকার করতে নিজেদের বিলিয়ে দেব।

গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস পড়ে ভাবতাম, আমরা গোয়েন্দা হব। আবার কখনো মনে হতো, এর চেয়ে বরং দয়ালু ডাকাত হওয়াই ভালো। ধনীদের ধন কেড়ে নিয়ে গরিব নিঃস্বদের বিলিয়ে দেওয়া যাবে। কখনো ভাবছি, কোনো অগম্য পর্বত, সমুদ্র কিংবা মরুভূমিতে বেরিয়ে পড়লেই বুঝি মানবজীবনের সার্থকতার স্বাদ পাওয়া যাবে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যা কিছু আমরা পড়তাম, সবই আমাদের ভালো লাগত। শুধু স্কুলের বই পড়া ভালো লাগত না। কারণ, স্কুলের পাঠ্যবিষয়ে আমাদের জন্য কোনো স্বপ্ন ছিল না। স্কুল আমাদের শুধু মানুষ হওয়ার জন্য বেত মারত। কিন্তু 'মানুষ'-এর যে দৃষ্টান্ত, সে সময় আমাদের সামনে ছিল তা আমাদের মনঃপূত ছিল না।
ক্লাসের সবচেয়ে নীরস গোমরামুখ ছেলেটি ছিল সবচেয়ে ভালো ছাত্র। সে হাসত না। দিনরাত তার একমাত্র কাজ ছিল উবু হয়ে অঙ্ক নিয়ে পড়ে থাকা কিংবা পড়া মুখস্থ করা। তাকে সবাই ভালোবাসত। শিক্ষকগণ সবাই ছিলেন তার প্রতিই যত্নবান। তাকে সবাই ঠেলত বেশি নম্বরের দিকে। পড়তে পড়তে তার চোখ দুটি ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। বড় হয়ে সে নিশ্চয়ই মানুষ হয়েছিল। আমরা কেউ জানি না, সে কত বড় মানুষ হতে পেরেছিল। শুধু এটুকু আন্দাজ করি, অনেক মানুষের ভিড়ে সে হারিয়ে গেছে। আমরা একই ক্লাসের আরও কয়েকজন হতভাগ্য ঠিকমতো মানুষ হতে পারিনি বলে সত্যিকার মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করিনি।
মানুষ হওয়ার জন্য আমাদের যেহেতু কোনো পরিকল্পনাই ছিল না, সে কারণে বখাটেরা যেভাবে বেড়ে ওঠে তেমনি আমরাও আমাদের ইচ্ছামতো গাছের মতো আকাশের দিকে মাথা তুলে চেয়েছি। এতে যে খুব একটা খারাপ জীবন কাটিয়েছি, এটাও ঠিক নয়। মানি, আমাদের জীবনও নিরবচ্ছিন্ন সুখে কেটে যায়নি। তবে নিঃসীম দারিদ্র্যের মধ্যেও মোটামুটি স্বপ্নের মধ্যেই অতিবাহিত হয়েছে। যে-সব শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আমাদের মানুষ করতে পারেননি বলে একদা অনুতপ্ত ছিলেন, কেন জানি মনে হয়, আমরা সেই গুরুজনদের চেয়ে মন্দ জীবন কাটাইনি। আজও যখন মাঝেমধ্যে কোন শিক্ষকের সঙ্গে কালেভদ্রে কিংবা দৈবাৎ দেখা হয়ে যায়, নত হয়ে কদমবুসি করে দাঁড়ালে তিনি মাথায় হাত রেখে যে কথা বলেন, তাতে মনে হয় না যে একেবারে বয়ে গেছি।
তথ্যসূত্র : যেভাবে বেড়ে উঠি : আল মাহমুদ : প্রথমা প্রকাশন : সপ্তম মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর ২০২৩ : পৃষ্ঠা : ৫৮।
মৃত্যু দিবসে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি-মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২৬।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ