Ticker

6/recent/ticker-posts

আরব জাতি এখন আদুরে বেড়াল

 

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মানুষগুলোকে আমার কেবলই জড় পদার্থ বলে মনে হয়। বিরান মরুভূমির মতোই শুষ্ক ওদের মন। গাছপালাহীন প্রান্তরের মতো সবুজহীন তাদের হৃদয়ের আঙিনা। তাদের মনের বারান্দায় বৃষ্টির শব্দ নেই, পাখির গান নেই। তাদের প্রাণেও নেই সুর আর ছন্দ। সাহিত্য-সংস্কৃতি বিহীন মানুষগুলো পাথরের মতোই অনুভূতিহীন। 

মাটির নিচের তরল সোনা তাদের জীবনের ঐশ্বর্য  আর সমৃদ্ধে এনে দিলেও কেড়ে নিয়েছে সুর-সাহিত্য। দশকের পর দশক ধরে রাজতন্ত্রের ছায়ায় তারা বাহ্যিক উন্নতি করলেও তাদের আত্মিক উন্নতি প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলশ্রুতিতে তাদের মধ্যে মানবিকতাবোধ এবং দেশপ্রেম কম বলেই মনে হয়। নয়তো নিজ বাড়ির আঙিনায় ভিনদেশীয় সৈন্যদের ঘাঁটি তারা মেনে নেয় কীভাবে। 

আমাদের দেশে এক দল লোক ভারত বিরোধী, আরেক দল পাকিস্তান বিরোধী। কেউ মিয়ানমার, কেউ আমেরিকা, চীন বা রাশিয়া বিরোধী । অর্থাৎ এদেশের মানুষ তাদের নিজ দেশের মাটিতে ভিনদেশীয় শক্তির উপস্থিতি বিশেষত রাজনৈতিক বা সামরিক উপস্থিতি সহ্য করে না । কোনো একটি দেশের পক্ষে কিছু লোক কথা বললেই অন্যরা তার বিরোধিতা করবে। এই বিষয়টিকে আমি প্রত্যেকের দেশপ্রেম হিসেবেই দেখি।

কিন্তু আরব দেশের অবস্থা ভিন্ন। তারা বছর পর বছর ধরে নিজেদের বুকের উপর ভিনদেশিদের বসিয়ে রেখেছে আনুষ্ঠানিকতা ও সমাদরের সাথেই। আবার নিজ বাড়ির আঙিনায় দশকের পরের দশক ধরে আর ফিলিস্তিন  সিরিয়া, ইয়ামেনের অসহায় শিশু, নারী-পুরুষরা নির্বিচারে মারা পড়লেও তাদের মানবিকতা বা ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত হয় না। একদিকে বিশ্বের নানা প্রান্তে মুসলিম শিশুরা যখন না খেয়ে অনাহারে অর্ধ-আহারে দিনপাত করে তখন আরব দেশের পেট মোটারা বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় করে। 

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, বিশ্বে খাদ্য অপচয়ের দিক থেকে সৌদি আরব শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে বছরে মাথাপিছু ১৮৪ কেজি খাবার অপচয় হয়, যা টাকার হিসেবে প্রায় ১৩ লাখ কোটি টাকার সমান। এক সময়ের বিশ্ব শাসন করা দুর্র্ধষ-দুর্মর আরব জাতি ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা তুলে দিয়েছে ভিনদেশিদের হাতে। আর স্বজাতির সাথে রয়েছে অন্তর্দ্বন্দ্বে । গতকালকের (২৩ জুন ২৫) আরবের বিভিন্ন দেশের আমেরিকান ঘাঁটিতে ইরানের হামলা সেই কথারই প্রমাণ বহন করে। তাই আরব দেশের মানুষগুলোকে আমার বরাবরই জড় পদার্থই মনে। 

তরবারি বন্ধক রেখে বীরের জাতি আরবীয়রা বিত্ত-বৈভব ধার নিয়েছে। আর নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত করেছে নিজেদেরই ঘাতক বাহিনীকে। নিজের শত্রুকে নিজের পাহারাদার বানানোর মতো এরকম বোকা কর্মকাণ্ড পৃথিবীর আর কোনোকালে কোনো জাতি করেছে বলে আমার জানা নাই। অবশ্য এছাড়া তাদের করারই বাকি ছিল। 

১৯৩৮ সালে দাম্মামের তেল কূপে তেল আবিষ্কৃত হয়। সৌদি আরবের সেই তেল প্রথম আবিষ্কার  ও উৎপাদন করে আমেরিকান এবং ব্রিটিশরা । আজও তাদের প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করেই আরবের বিভিন্ন দেশ থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে তাদের মহামূল্যবান সম্পদ ও শক্তি এই খনিজ তেল। সেই তেল উত্তোলনের কোনো প্রযুক্তি সে সময় তাদের কাছে ছিল না; এখনও নেই। এমনকি তাদের পায়ের নিচে যে এই অফুরন্ত ধনভাণ্ডার রয়েছে এই খবরও তাদের জানা ছিল না। তাও বের করে দিয়েছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, ভিন্ন দেশীরা। 

মহান আল্লাহ যে পবিত্র কোরআনকে ঘোষণা করেছিলেন ‘বিজ্ঞানময় কোরআন’ হিসেবে। সেই কোরআনের বর্তনের পবিত্র ভূমি ও তার ধারক হিসেবে তারা আধুনিক-বিজ্ঞান চর্চা না করে মানব জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে বানিয়েছে শুধু ইবাদতের ধর্ম হিসেবে। আন্ত-গোত্রীয় বিরোধ, সংঘর্ষ ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ের মত পার্থক্য একদিকে তাদের যেমন শক্তি খণ্ডন করে বিভক্ত করেছে, অন্যদিকে জ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চাবিহীন আরব জাতি হারিয়েছে তাদের অতীত শৌর্য, বীর্য ও মর্যাদা। 

বর্তমান সময়ে মাটির নিচের তেল বিক্রি করে তারা নিজেদের শরীরের তেল বৃদ্ধি করেছে। একেকজন আরবীয়দের দেখলে এককজন পাঠা মনে হয়। বস্তুত তাদের পায়ের তলায় সত্যিকারের মাটি নেই। বর্তমানে সুরম্য ইমারত, সুপরিকল্পিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক রাস্তা ,যানবাহন আর চাকচিক্যময় জীবন ব্যবস্থা মূলত তাদের ধার করা জীবন। নিজেদের অর্জিত বা উৎপাদিত নয়। তারা ভাবছে নবীর দেশের মানুষ বিধায় তারা বুঝি সুড়সুড়িয়ে জান্নাতে চলে যাবে। সুন্নতি পোশাক পরে জান্নাতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা আরব জাতি জানে না তাদের বৃত্ত বিলাসের মাধ্যমে অর্জিত তেল চর্বি দোযখের আগুনকে আরো প্রখরতা বৃদ্ধি করবে মাত্র।

এক্ষেত্রে ইরান ব্যতিক্রম। দশকের পর দশক ধরে জাতিসংঘ ও আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা নিজেদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতিতে সমৃদ্ধ করেছে। নিজেদের পায়ের নিচের তেলকে ওরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করেছে। আরবের অন্যান্য দেশ যেখানে তেল বিক্রি করে নিজেদের বৈভব কিনেছে। সেখানে ইরান তেলকে রকেট রূপান্তরিত করেছে। আজ ইরান থেকে উৎক্ষেপিত সেই রকেটগুলোকে আমরা ইরানীয়দের সাহসের পথিক হিসেবেই দেখি। দেখি আত্মমর্যাদা, স্বাধীনচেতা ও বীরত্ব হিসেবে।  জ্ঞানবিজ্ঞান সাহিত্য এবং সংস্কৃতি চর্চা একটি জাতির আত্মিক উন্নয়নে কতটুকু প্রয়োজন তা আমরা আরব দেশগুলোর দিকে তাকালেই বুজতে পারি। 

এই লেখা ড্রাফট করেছিলাম প্রায় আড়াই মাস আগে (২৪ জুন ২৫) । তখন ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ চলছিল। লেখাটি এডিট করতে করতে ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধটি স্থগিত হয়ে যায়। ফলে সেই সময় লেখাটি আর আপলোড করা হয়নি। অপেক্ষা করছিলাম হয়তো আবার কিছু ঘটবে, তখন আপলোড করব। এর মধ্যেই গত ৯ সেপ্টেম্বর ইসরাইল আবার করেছে কাতারে। রাজধানী দোহায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র যোদ্ধাদের সংগঠন হামাস নেতাদের কার্যালয় লক্ষ্য করে অন্তত ১২টি বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। তার পর থেকে গত দিন খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম এই লেখাটি। অন্যান্য লেখার মাঝে হারিয়ে গিয়েছিল। আজকেই খুঁজে পেলাম। 

আমাদের দেশে কোনো ভিনদেশি রাষ্ট্র এরকম হামলা করলে আমাদের সরকার কি উদ্যোগ নিতেন জানি না। তবে দেশের জনগণ যে ফুঁসে উঠতেন এ কথা নিশ্চিত । মিটিং-মিছিল, সভা-সমাবেশ, ওয়াজ-মাহফিলে থাকত প্রতিবাদ-প্রতিরোধের বন্যা। সাহিত্য সাহিত্য পাড়ায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ লেখার ধুম পড়ে যেত। সাংস্কৃতিক অঙ্গণে গান-নাটক-সিনেমা তৈরি হতো। গ্রামে-গঞ্জে হাট-বাজারে- সব জায়গায় আলোচনায় থাকতো এই হামলার বিষয়টি। থাকতো নিন্দার ঝড়। কিন্তু আরব দেশে তাকিয়ে দেখেন তাদের ভেতর কোনো ভাবান্তর নেই। কোনো অনুভূতি নেই। শত্রুর পাছায় ডান্ডা মারার পরিবর্তে তারা এখন মরুভূমির সাণ্ডা পিছনে দৌঁড়ায়। একসময় যুদ্ধের ময়দান দাঁপিয়ে বেড়ানো মরুর উটগুলোকে তারা আজ সার্কাসের বানর বানিয়েছে আর নিজেরা হয়েছে বিড়াল। বিড়ালেরতো তবুও কিছু আবেগ-অনূভুতি আছে, ওদের বুঝি তাও নেই। তাদের কাউকে সরাসরি কাছে পেলে জিজ্ঞেস করতাম ‘ওহে দিগি¦জয়ী আরব জাতি, কিসে তোমাদেও এমন আদুরে বেড়াল বানালো !

আমার এই লেখার মতো একটি লেখা আরবের কেউ লিখলে তাকে আজ জেলে থাকতে হতো। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, মত প্রকাশের স্বাধীনতা/বহুমতের সমাবেশ কিংবা সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা- একটি রাষ্ট্রের জন্য যে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা আবর জাতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আবার এ কথাও ঠিক যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছে তা বলা, লেখা বা করা নয়।

আরব জাতির অতীত গৌরবজ্জল ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেই গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরুতেই লেখেন তাঁর ‘শাৎ-ইল-আরব’ কবিতা। এই কবিতায় তিনি আরব বিশ্বের স্বাধীনতা ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ তুলে ধরেন। শাত-ইল-আরব কবিতাটি কবি নজরুলে ১৯২২ সালে প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণায় গৃহীত হয়। লেখার এই অংশ সেই কবিতা তুলে ধরা হলো।

শাৎ-ইল-আরব 

কাজী নজরুল ইসলাম


শাতিল-আরব ! শাতিল আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

শহিদের লোহু , দিলিরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর।


যুঝেছে এখানে তুর্ক-সেনানী,

য়ুনানি মিসরি আরবি কেনানি ;–

লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ বেদুইনদের চাঙ্গা-শির!

নাঙ্গা-শির –

শমশের হাতে, আঁশু-আঁখে হেথা মূর্তি দেখেছি বীর-নারীর!

শাতিল-আরব! শাতিল-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।


‘কূত-আমারা র রক্তে ভরিয়া

দজলা এনেছে লোহুর দরিয়া;

উগারি সে খুন তোমাতে দজলা নাচে ভৈরব ‘মস্তানি’র।

ত্রস্তা-নীর

গর্জে রক্ত-গঙ্গা ফোরাত , – ‘শাস্তি দিয়েছি গোস্তাখীর !’

দজলা-ফরাত-বাহিনী শাতিল! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।


বহায়ে তোমার লোহিত বন্যা

ইরাক-আজমে করেছ ধন্যা –

বীরপ্রসূ দেশ হল বরেণ্যা মরিয়া মরণ মর্দমির !

মর্দ বীর

সাহারায় এরা ধুঁকে মরে তবু পরে না শিকল পদ্ধতির।

শাতিল-আরব! শাতিল-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।


দুশমন-লোহু ঈর্ষায় নীল

তব তরঙ্গে করে ঝিল-মিল

বাঁকে বাঁকে রোষে মোচড় খেয়েছে পিয়ে নীল খুন পিণ্ডারির !

জিন্দা বীর

‘জুলফিকার আর ‘হায়দরি’ হাঁক হেথা আজও হজরত আলীর –

শাতিল-আরব! শাতিল-আরব!! জিন্দা রেখেছে তোমার তীর।


ললাটে তোমার ভাস্বর টিকা

বস্রা -গুলের বহ্নিতে লিখা;

এ যে বসোরার খুন-খারাবি গো রক্ত-গোলাব-মঞ্জরীর

খঞ্জরির!

খঞ্জরে ঝরে খর্জুর-সম হেথা লাখো দেশ-ভক্ত-শির!

শাতিল-আরব! শাতিল-আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।


ইরাক-বাহিনী! এ যে গো কাহিনি,

কে জানিত কবে বঙ্গ-বাহিনী

তোমারও দুঃখে ‘জননী আমার’! বলিয়া ফেলিবে তপ্ত নীর

রক্ত-ক্ষীর –

পরাধীনা ! একই ব্যথায় ব্যথিত ঢালিল দু-ফোঁটা ভক্ত-বীর!

শহিদের দেশ! বিদায়! বিদায়!! এ অভাগা আজ নোয়ায় শির।



----------------

মুক্তগদ্য : আরব জাতি এখন আদুরে বেড়াল

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

১২ সেপ্টেম্বর ২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ