আবেগ ভরা কণ্ঠ নিয়ে কেউ কেউ পাঠ করলেন স্বরচিত কবিতা, মোহনীয় কণ্ঠে কেউ কেউ করলেন আবৃত্তি, সুরলিত কণ্ঠে কেউ গাইলেন গান, দারাজ কণ্ঠে কেউ শোনালেন নাটকের ডায়ালগ। একজন চিৎকার করে বলে উঠলেন- ‘জাগো বাহে..., কোনঠে সবাই’। আরেকজন তো সবার থেকে ব্যতিক্রম। তিনি কি কবিতা পড়লেন, নাকি গান নাটকের ডায়ালগ শোনালেন, না গানের কলিগুলোই গুনগুন করে গেয়ে গেলেন, নাকি মন্ত্রের মতো পাঠ করে গেলেন সারাদিনের সবার কর্মকাণ্ডগুলো- তা শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেই গেলাম।
সাত পর্বে বিভক্তে অনুষ্ঠানে আলাদা আলাদা সভাপতি, অতিথি, আলোচক, প্রধান বক্তা ও উপস্থাপক। তাদের বক্তব্যে উঠে আসলো কবিতার কথা, গল্পের কথা, উপন্যাস বা প্রবন্ধের কথা। উঠে আসলো বই পড়া, বই না পড়া করার কথা। কি পড়তে হবে, কি পড়া যাবে না? কি কি লিখতে হবে, কোথায় আর কীভাবে লিখতে হবে- সেসব বললেন কেউ কেউ। পাঠাগারের কথা, পাঠাগারের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরলেন কেউ, বললেন সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায়।
বিশ্ব মঞ্চ থেকে দেশ, সমাজ-সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা রাজনীতি- সমকালীন প্রায় সকল বিষয় নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করলেন একেকজন। কারো কারো বক্তব্য আশার আলো, কারো কারো বক্তব্যে হতাশার সুর। কারো কারো বক্তব্যে সমস্যার কথা, কেউ বললেন সম্ভাবনার কথা।
এসব বলার জন্য, শোনার জন্য সারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লেখক-পাঠক ও পাঠাগার কর্মীরা একত্রিত হয়েছিলেন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভরপুর উত্তরবঙ্গের অন্যতম জেলা দিনাজপুরে।
সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের সভাপতি সাত্তার খান ভাই যখন বললেন, বই বিমুখিতা এই সমাজের সকল অন্যায়, অবিচার-অস্থিরতার কারণ। তিনি যখন বললেন, গত জুলাই আন্দোলনে প্রায় দেড়শ পাঠাগারকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে এবং তা নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। তিনি যখন বললেন, এই জেনারেশন বই পড়ছে না, কারণ আমরা তাদের লাইব্রেরি পর্যন্ত নিয়ে আসকে পাচ্ছি না। আবার যত সহজে তারে হাতে স্মমার্টফোন তাদের হাতে পৌঁছে গেছে, তত সহজে বইকে তাদের হাতে পৌঁছাতে পারছি না-- তখন অনুষ্ঠানের ভেতরে অমোনযোগী মন হঠাৎ করে সতর্ক হয়ে ওঠে।
কথাসাহিত্যিক-অধ্যাপক বিশ্বজিৎ দাস স্যার, অধ্যাপক ইব্রাহিম আজাদ, অধ্যাপক রইছুল আজম, নাসরিন সুলতানা রেখা, কবি-প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব ভাই, গষেষক-সম্পাদক কবি পুলিন রায়, কবি-প্রাবন্ধিক সৌম্য সালেক ভাই, পাঠাগার সুহৃদ আব্দুল হালিম খান, রফিকুল ইসলাম দুলালসহ অনেকের বক্তব্যই ভালো লেগেছে। নোট করতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু দীর্ঘ জার্নির ফলে মোবাইল ফোনের চার্জ না থাকা এবং ক্লান্ত শরীর সে সায় দিচ্ছিল না।
গ্লোরিয়াস লাইব্রেরি দিনাজপুর-এর আয়োজনে ও সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশের সহায়তায় ‘কবি ও পাঠক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে। এ অনুষ্ঠানে দুই শতাধিক অতিথির বেশিরভাগে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা যেমন রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, বগুড়া, নাটোর, জয়পুরহাট ও পাবনা থেকে এসেছেন। তেমনি আবার বাংলাদেশের অন্য প্রান্ত খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, অঞ্চল থেকেও এসেছেন। এসেছেন সুদূর কক্সবাজার-চট্টগ্রাম থেকে। এসেছেন সিলেট-সুনামগঞ্জ-কুমিল্লা থেকেও। আর তিতাস পারের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আমরা প্রায় ছয়জন যুক্ত হয়েছিলাম কথাসাহিত্যিক আমির হোসেন স্যার আর আমার জার্নি ছিল একগাদা বিড়ম্বনায় ভরা। সে কথা এখন না হয় নাই বললাম।
ছুটির দিন তাই সমবেত হতে পেরেছিলেন বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, বিভিন্ন বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জেলার ভিন্নতা, ভাষার ভিন্নতা, যানবাহনের ভিন্নতা এবং পেশার ভিন্নতা থাকলেও সবাইকে এক করেছে একটি পরিচয়- আর তা হলো সবাই লেখক-পাঠক এবং পাঠাগার কর্মী। এই একটি পরিচয় অচেনা সব মানুষদের এক করেছে বাংলাদেশের লিচুর রাজধানী হিসেবে খ্যাত জেলা দিনাজপুরে।
অনুষ্ঠান স্থলে প্রবেশ করেই শুনি মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে এখন কারা মঞ্চে উঠবেন, কথা বলবেন, কবিতা পাঠ করবেন তাদের নাম। শুনলাম নিজেদের নাম। কিন্তু আমাদের তখন ২৪ ঘণ্টার ভ্রমণ ক্লান্তি। প্রথম পর্বে অংশগ্রহণ করার মতো শারীরিক অবস্থা নেই। তাই আগে খুঁজে নিলাম বিশ্রামের জায়গা। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই দেখি মাঠের কোণে দুটি ছোট বুকস্টল। সেখানে অল্প-স্বল্প ভিড়। রেসপন্স থেকে উপহার গ্রহণ করে এগিয়ে গেলাম মূল সভাস্থলে।
অনুষ্ঠান স্থলে প্রবেশ করার পরে কবি নুর আলম চৌধুরী ভাই ও কবি সাইদুর রহমান ভাই জানালেন - কেউ একজন সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ এবং বিভিন্ন সময় সামান্য বিষয়ের ঝগড়াঝাঁটির বিষয়ে উল্লেখ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সমালোচনা করেছেন। তারা বললেন- এই বিষয়ে যেন নিজেদের আলোচনায় আমরা কিছু বলি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মন্দভাবে যারা উপস্থাপন করে, আমরা তাদের প্রতিনিধি নই। আমরা প্রতিনিধি হয়েছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আলোকিত ভাবে যারা তুলে ধরেন তাদের- আমি ছিলাম কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ পর্বে, সুতরাং সেই দায়িত্ব বার্তায় আমির হোসেন স্যারের উপর এবং তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে খুব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন আমাদের প্রিয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে। উপস্থিত সকলে করতালির মাধ্যমে তাঁর বক্তব্যকে স্বাগত জানাই।
৫১০ টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছিলেন আয়োজক কর্তৃপক্ষ। সদস্যসচিব কবি মেহনাজ পারভিন আপা অতিথিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন শুভেচ্ছা উপহার। একটি ব্যাগ, একটি কলম আর চমৎকার একটি চাদর। নানা রঙের এই চাদরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত লেখকদের কবিতার পঙ্কিত তুলে ধরা হয়েছে, লেখকের নামসহ, দারুণ এক আইডিয়া। ভাবলাম, রেজিস্ট্রেশনের টাকা দিয়ে তো উপহারের খরচই উঠবে না। আয়োজকরা এত বড় অনুষ্ঠানের বাকি খরচ ম্যানেজ করলেন কীভাবে? সে যাই হোক।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দিনাজপুরের রানীরবন্দরের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সানলাইট স্কুল এন্ড কলেজে সমবেত হয়েছিলাম আমরা। দূরদূরান্ত থেকে আসব বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলের আবাসিক হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের তিনদিন আগেই ছুটি দিয়ে দিয়ে সেখানে আমাদের থাকার জায়গা করেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা চোখে পড়ার।
মেহনাজ আপার ছোটাছুটির শেষ নেই। তিনি কখনো অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন, তাদের হাতে উপহার তুলে দিচ্ছেন। কখনো চার তলায় উঠে অনুষ্ঠানের মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে উপস্থাপনা করছেন। আবার নিচে নেমে নতুন আসা অতিথিদের বিশ্রামের জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছেন। কখনো হাসিমুখের সবার সাথে ছবি তুলছেন। কারো কারো অন্যান্য আবদার রক্ষা করে চলছেন। শাড়ি পরে সেজেগুঁজে এসেছেন তিনি– শাড়ি পরা মেয়েদের/নারীদেরতো দেখি একটু ভাবসাব নিয়ে থাকে। কাজ করার চাইতে ফটোসেশন বেশি গুরুত্ব দেয় আর ঢং ঢং তো থাকেই।
ভাবছি, মেহেনাজ আপা ব্যতিক্রম কেন, কাজ করার এত প্রাণ শক্তি তিনি কোথায় পান? তখন জানা ছিল না, জেনেছি পরের দিন। অনুষ্ঠান আয়োজক-আহ্বায়ক যিনি, তিনি এই শক্তির মূল জোগানদাতা। রানীরবন্দর তথা দিনাজপুরের প্রথিতযশা লেখক-গবেষক ও সংগঠক শ্রদ্ধেয় লুৎফুর রহমান। তাঁর কথা এখানে বলে শেষ করা যাবে না। বলতে হবে অন্য কোনো পর্বে।
শুধু একজন লুৎফর রহমান কেন? দিনাজপুরের প্রতিটি মানুষ- অল্প সময়ে যাদের সংস্পর্শে ছিলাম, যে-সব জায়গায়, স্থাপনা ঘুরে দেখলাম- তার সব কিছুই ছিল অসাধারণ। অসাধারণ ছিল আমার প্রথম দিনাজপুর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। দেখি, আগামীতে সেসব বলতে-লিখতে পারি কিনা?
এই অনুষ্ঠানে পূর্ব থেকে পরিচয় এমন অনেকের সাথে যেমন দেখা হয়েছে, তেমনি দেখা হয়েছে ফেসবুকে পরিচয় কিন্তু কখনো সরাসরি দেখা হয়নি তাদের সাথেও। আবার নতুন অনেক লেখক-সংগঠকের সাথেও পরিচয় হতে পেরে ভালো লেগেছে। শ্রদ্ধেয় সৈকত হাবিব ভাই, কবি পুলিন রায়, সৌম্য সালেক ভাই, কবি মঞ্জুর মোহাম্মদ ভাই, কবি আনিদ্য জসিম, কবি অজয় রায় ভাই, কবি রাজ্জাক দুলাল ভাই, কবি হজরত আলী ভাই, কবি নুর আলম চৌধুরী ভাই, কবি সাইদুর রহমান ভাই, কবি এম এ মতিন সজিব ভাই, নাজমুল পলাশ ভাই- আপনাদের সঙ্গ উপভোগ করেছি। আর ভ্রমণে আসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আসতে না পারা কবি হেলাল উদ্দিন হৃদয় ভাইয়ের সঙ্গ মিস করেছি।
--------
লিচুর দেশে : দিনাজপুর ভ্রমণ
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
















0 মন্তব্যসমূহ