কবির ছবির পাশে দিয়ে হেঁটে যেতেই ভরাট গলায় অচেনা কেউ আমাকে ডেকে উঠল। বলল- এই মনির, একটু শুনে যাও। আমি এদিক সেদিক তাকালাম। আশেপাশে যারা আছে তারা সবাই শিশু থেকে মধ্য বয়সি, ভরাট গলার, কে আমাকে ডেকেছে আন্দাজ করতে পারলাম না। আমার ইতস্তত ভাব দেখে কবি আমাকে বললেন- আরে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখছো কী বাছা, আমি কবি নজরুল ডেকেছি তোমাকে।
কবি বললেন- তুমি বাস্তবেই আছো, তবে আমি যে তোমার সাথে কথা বলছি এটি স্বাভাবিক কথোপকথন নয়। অর্থাৎ আমার আর তোমার মাঝে বলা কথা আর কেউ শুনতে এবং বুঝতে পারছে না।
আমি ভাবলাম, এই বিশ্ব চরাচরে কত অদ্ভুত ঘটনাই না ঘটে, হয়ত এই মুহূর্তে আমার সাথে এরকমই অদ্ভুত কোনো ঘটনা ঘটছে, কিংবা আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। সে যাই হোক, জাতীয় কবির সাথে কথোপকথনের এই সুবর্ণ সুযোগ আমি হাতছাড়া করতে চাইলাম না। আমি বললাম- প্রিয় কবি, এত মানুষ থাকতে আপনি আমাকে কেন ডাকলেন?
কবি বললেন- আজকে আমার মন ভালো না, তাই ভাবলাম কারো সাথে দুটো কথা বলে মনটাকে একটু হালকা করে নিই। কিন্তু আশেপাশে তেমন কাউকে পেলাম না, তোমাকে দেখে কেন যেন একটু আপন মনে হলো। তাই তোমাকে ডাক দিলাম।
আমি বললাম, হে কবি-এ তো আমার পরম সৌভাগ্য। কেন ডেকেছেন, বলুন, আমি আপনার জন্য কী করতে পারি? আর কী কারণে আপনার মন খারাপ জানতে চাই।
কবি নজরুল বললেন- খুব ভয় আছিরে ছোট, আমার জাতীয় কবি পদবিটা বুঝি আর থাকবে না। আমি অবাক হয়ে বললাম,- কী যে বলেন কবি, এটা অসম্ভব! সারা দেশের মানুষ আপনাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, আপনার চেতনা এবং আদর্শকে লালন করে। আপনাকে জাতীয় কবি থেকে বাদ দেবে, এমন দুঃসাহস বাঙালির নেই।
কবি বললেন- এতদিন পর্যন্ত আমিওতো তাই জানতাম। কিন্তু কাল যে এক ছেলে এসে বলে গেল আমার মেয়াদ নাকি আর বেশিদিন নাই।
আমি বললাম- কার এত বড়ো দুঃসাহস? আপনাকে জাতীয় কবি থেকে বাদ দিতে চেষ্টা করবে। এমন কলিজা এ দেশের কারো নেই। কিন্তু সে এমন কথা বলার কোনো কারণ বলেছে কি?
কবি বললেন- বলেছে বইকি কী, সে বলেছে, এই দেশে কোনো ভারতীয় লেখককে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া যাবে না। সে বলেছে, আমরা এখন আরেক ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাতীয় সংগীত বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছি। এই দাবি সফল হলেই জাতীয় কবি বদলানোর দাবিও তুলবো।
আমি বললাম- এসব নিয়ে আপনি শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্ম ও নাগরিকতা সূত্রে ভারতীয়। আপনার জন্ম ভারতে হলেও আপনি তো আমাদের দেশেরই নাগরিক।
কবি বললেন- নারে বাছা, মুখে মুখে আমাকে নাগরিক বললেই তো আর হবে না। তোদের কাছে কি আমার নাগরিকতার কোনো সনদ/সার্টিফিকেট আছে। (ততক্ষণে তিনি আমাকে তুমি থেকে তুই সম্বোধন করছেন।)
আমি বললাম- তা নেই, কিন্তু তাতে কী হয়েছে! আপনাকে বাংলাদেশে এনেছেন এবং বাংলাদেশের নাগরিকতা দিয়েছেন স্বয়ং জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ কথা তো মিথ্যা নয়, সবাই তা জানে।
কবি বললেন- ওইখানেই তো ভয় রে, ব্যাটা ওইখানেই তো ভয়! প্রথমতো খোকারে তখন তোরা জাতির পিতা মানতি, এখনতো মানিস না। তাছাড়া যে ছেলে আমার কাছে এসেছিল সে বলে গিয়েছে, দেশের এক নাম্বার ফ্যাসিস্ট, স্বৈরশাসক, তাদের পেয়ারে পাকিস্তান ভাঙার মহা কারিগর, ভারতের দালাল মুজিব আপনাকে এই দেশে এনেছে। মুজিবের আনা কোনো কিছু আমরা এই দেশে রাখবো না। সব দিল্লি পাঠাইয়া দিবো।
আমি বললাম- কবি আপনি তাকে কিছু বলেন না?
কবি বললেন- আমি বললেই কি আর সে আমার কথা শুনতো? সে আরো বলেছে- ফ্যাসিস্টের লিডারের সাথে আমার ছবি আছে। কাজেই আমিও নাকি একজন ফ্যাসিস্টের দোসর, আমার জাতীয় কবির পদটা বুঝি আর থাকবে নারে।
আমি বললাম- কেউ বললেই হলো! এই দেশের মানুষ আপনাকে আপন করে নিয়েছে। আপনি আর ভারতীয় নন। আপনার লেখালেখিতে এই দেশের পরিবেশ, প্রকৃতি ও মানুষের কথা বারবার এসেছে। আপনি নিজেও এই দেশের অনেক জায়গায় এসেছেন। আপনি আমাদেরই আপন। কেউ আপনার বিরুদ্ধাচরণ করলেই আপনি আমাদের পর হয়ে যাবেন না।
কবি বললেন- কিন্তু তোদের বাঙালিদের তো বিশ্বাস করা দায়। সিরাজউদ্দৌলা বাঙালিকে বিশ্বাস করে ব্রিটিশদের হাতে পরাজিত হলো। ২০০ বছর আমরা ব্রিটিশদের গোলামি করলাম। সেই গোলামির বিরুদ্ধে আমাকে কত লেখালেখি করতে হলো। সেই লেখালেখির জন্যও আবার জেলও খাটতে হলো। অবশ্য একটা লাভ হয়েছে তোরা সবাই আমাকে ‘বিদ্রোহী কবির’ মর্যাদা দিয়েছিস। কিন্তু আমার জাতীয় কবির পদটা যদি চলে যায়?
আমি বললাম- কবি আপনি শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করছেন, কেউ যদি এমন দাবি করে, এ দেশের লক্ষ কোটি মানুষ তার জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। এমন দুঃসাহস বাংলার বুকে কেউ করতে পারবে না।
কবি বললেন- আরে শোন শোন, এত বড়ো বড়ো কথা বলিস না। এই দেশ হলো জোয়ার ভাটার দেশ। তোরা যে কখন কার গলায় ফুলের মালা আর কখন কার গলায় জুতার মালা দিস, তা বুঝে উঠতে পারি না। ব্রিটিশদের তোরাই ডেকে আনলি, আবার তোরাই লড়াই-সংগ্রাম করে তাদের খেদাইলি। তোরাই শখ কইরা পাকিস্তান বানাইলি। আবার সেই পাকিস্তানিদের তাড়ানোর জন্য যুদ্ধে জড়াইলি, নিজেদের রক্ত দিলি। মুজিবকে জাতির পিতা বানালি তোরাই, আবার সেই মুজিবকে তোরাই তো মেরে ফেললি। তোরাইতো মুজিবের ভাস্কর্য বানিয়ে, ছবি টানিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালি আবার মুজিবের ভাস্কর্য ভেঙে, ছবি পুড়িয়ে তার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দিলি। তোদের কখন কী মতি-গতি হয় তা বোঝা যায় না।
আমি বললাম- এসবতো রাজনৈতিক কারণে। আপনি তো আর রাজনীতি করেন না। তাছাড়া আপনি ‘ব্রিট্রিশ খেদাও’ আন্দোলন করলেও ভারত বিভক্তির আন্দোলন করেননি। পাকিস্তান বানানোর আন্দোলন করেননি, পাকিস্তান ভাঙার আন্দোলনও করেননি। বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন করেননি, মুক্তিযুদ্ধও করেননি। এই সকল বিষয় নিয়েই তো বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ গরম থাকে। আপনি তো এসবের ঊর্ধ্বে। সবচেয়ে বড় কথা আপনি একজন কবি, আপনি তো সবার। বিশেষ করে এদেশের মুসলমানদের কাছে আপনিতো নয়নের মনি। আপনার কবরও এই দেশে। কাজেই আপনি আমাদেরই মাটির মানুষ।
কবি বললেন- রবি ঠাকুর বঙ্গভঙ্গের বিরোধী ছিলেন বলে তোরা তাকে বাংলাদেশের বলে মানতে চাস না। আমিও কি চেয়েছিলাম যে ভারত ভাঙুক? তোরাইতো ভারত ভাইঙ্গা খান খান করলি। এখন আবার মাজার ভাঙ্গা, কবরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া শিখেছিস? আমার মাজার যে একদিন ভাঙবি না, তার গ্যারান্টি কী? একদিন দল বেঁধে এসে একদল আমার মাজার ভেঙ্গে যাবে। তারা হয়তো জানবেও না এখানে ওদেরই জাতীয় কবি শুয়ে আছে।
আমি বললাম- এটা একটা দুশ্চিন্তার বিষয়। মবের দেশে যে কেউ মব করে এসে যদি আপনার কবর ভেঙে ফেলে সেটা রোধ করা তো আসলেই দুষ্কর। তবে এমনটা হবে বলে আমার মনে হয় না। ছোট বেলা থেকে আমরা সবাই আপনার ছড়া-কবিতা শিখে বড় হয়েছি। সবাইকে আপনাকে চিনে।
কবি বললেন- হ হ আর কথা কইসা না। তোরাই একদিন কইবি বইয়ে লেখা আমার সব কবিতা ৮০/৯০ পারসেন্টেই মিথ্যা। অন্য কারো লেখা চুরি কেউ আমার নামে চালাই দিসে।
আমি বললাম- আপনার লেখা আমরা দেখলেই বুঝি।
কবি বললেন- কীভাবে বুঝলি। তোরা কি স্বচক্ষে নিজে হাতে আমাকে ঐসব কবিতা লিখতে দেখেছিস। কোনো তথ্য-প্রমাণ আছে তোদের কাছে? ছবি-ভিডিও আছে? তোরাতো আবার প্রমাণ ছাড়া ৩০ লাখ শহিদ মানিস না। আমার লেখা যে আমারই লেখা, সেটা মানবী কেনো?
আমি একটু অভিমান করে বললাম- দেখুন কবি, আপনি কীসের মধ্যে কী লাগাইতেছেন। আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
কবি বললেন- মাথাতো আমারও তখন থেকে ঠিক নাইরে, যখন থেকে সে আমারে কাফের বললো?
আমি বললাম, কী বললেন, আপনাকে কাফেরও বলেছে, কত বড় স্পর্ধা।
কবি বললেন, আমি হিন্দু নারীকে বিয়ে করেছি, ছেলের নাম রেখেছি কৃষ্ণ মোহাম্মদ। এই কারণে নাকি আমি কাফের হয়ে গিয়েছি। সেই ছেলে বলেছে, একজন কাফেরকে নাকি বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া যাবে না। এসব শুনলে কার মাথা ঠিক থাকে বল?
আমি বললাম- কবি, আপনাকে তো কাফের অনেক আগেও একবার বলা হয়েছিল। আপনি হিন্দুদের, হিন্দু দেব-দেবীর জন্য গান লিখেছেন, আপনার কবিতায় অসংখ্য হিন্দুয়ানি শব্দ ব্যবহার করেছেন, বিয়ে-নাম রাখার ব্যাপার ছাড়াও এসব নানা কারণে আপনাকে তৎকালীন সময়ের মোল্লা-মুন্সিরা কাফের বলেছিল। কিন্তু এখন তো তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে সে ফতুয়া থেকে সরে এসেছে। এখন কোনো মোল্লা-মুন্সী আপনাকে কাফের বলে না। একজন মুসলিম কবি হিসেবে আপনাকে মানে এবং সম্মান করে। আপনার লেখা গজল গায়। কবিতা আবৃত্তি করে। তারা কখনো আপনার কবর ভাঙতে আসবে না। কাজেই আপনার জাতীয় কবির পদ ছিনিয়ে নেওয়ার ভয় নাই।
কবি বললেন- তুই এ কথা একা বললেই তো হবে না রে পাগলা। ওই ছেলেটা যে এসেছিল সে বলে গেছে তারা আরেকজন কবিকে জাতীয় কবি হিসেবে ঠিক করে রেখেছে। তাকেই জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করবে।
আমি বললাম- কার কথা বলেছে তারা।
কবি বললেন, তার নাম বলেনি। তবে বলেছে তারা ক্ষমতায় গেলেই তাদের পছন্দের কবিকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করবে।
আমি বললাম, তারা কি কবি আল্লামা ইকবালের কথা বলেছে নাকি অন্য কেউ। আরে না না, ইকবালের কথা বলেনি। সে তো আমারও প্রিয় মানুষ, পাকিস্তানের। বলেছে এই দেশেরই এক কবির কথা। তাকেই নাকি জাতীয় কবি ঘোষণা করার পরিকল্পনা আছে তাদের। শুধু নাকি সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
আমি বললাম, কবি যে যাই বলুক, আপনি আমাদের ছিলেন, আছেন, থাকবেন। যারা আপনাকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইবে, একদিন তারাই এদেশ থেকে উৎখাত হয়ে যাবে। আরেকটি কথা কবি, এই দেশের যা কিছু আমাদের তা পুরো পুরোই আমাদেরই। আবার ভারতের এমন অনেক কিছু আছে তা শুধু ভারতের একার নয়, সেখানে আমাদেরও ন্যায্য হিস্যা আছে। সেখানের মাটি, পানি, হাওয়ায়, মানুষে- আমাদেরও প্রাপ্য অংশ আছে। সেই হিসাবেই আপনি যেমন আমাদের, রবীন্দ্রনাথও আমাদেরই।
কবি বললেন, আমরাও তো মিলেমিশে সাহিত্যচর্চা করেছি- ভিনদেশি শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। আর আমিতো রবি ঠাকুরকে আমার গুরু মানি, তোরা আমাকে মানস- তাহলে আমার গুরুকে মানবি না কেনো? তোরাও সবাই আমাদের মতো মিলেমিশে থাকবি।
আমি কিছু বলতে যাবো ইতোমধ্যে আমার হ্যালুসিনেশনের প্রভাব কেটে গেলো। অমার মনে পড়ল—
কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা আমাদের চেতনার কবি, প্রেরণার কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
জাতীয় কবির সাথে কথোপকথন
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২৯ আগস্ট ২৫

0 মন্তব্যসমূহ