Ticker

6/recent/ticker-posts

রায়হানের মৃত্যু

ট্যাংকেরপাড় মসজিদের পাশে ফুচকা বিক্রেতা শাহজাহান মিয়ার বড় ছেলের রায়হান তালুকদার। বাড়ি সরাইল উপজেলার প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে। বাবার সাথে সেও ফুচকার দোকান চালাত এখানে। বেশ ভালো ছেলে। শান্ত-শিষ্ট নরম স্বভাবের। কর্মঠ, গলায় নেই উচ্চ স্বর। কোনো বদঅভ্যাস ছিল না। বদ সঙ্গ ছিল না। ২০/২২ বছরের তরতাজা এই ছেলেটি আজ দুপুরে মৃত্যুবরণ করল। এক সপ্তাহ যাবৎ অসুস্থ ছিল। ডাক্তার বলেছেন টাইফয়েড জ্বর। চিকিৎসা চলছিল। 

গতকাল রাতেও সদর হাসপাতালে তার সাথে আমার দেখা। তখনও তো এতটা অসুস্থ মনে হয়নি। হাঁটাচলা ও কথাবার্তা স্বাভাবিক। তাসফিয়ার মাকে ইমারজেন্সি ডাক্তার দেখার জন্য সন্ধ্যার পর আমি সদর হাসপাতালে গিয়েছিলাম। হাসপাতালের বারান্দায় ঢুকতেই তাসফিয়ার মা বলল, আমাদের রায়হান অসুস্থ। কিন্তু চিকিৎসা করাতে পারছে না। 

আমি তাসফিয়ার মার চিকিৎসা আগে না করে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, কী সমস্যা হয়েছে? তার বাবা বলল, ডাক্তার প্রেসার মাইপ্পা আনতে বলছে। পাশের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, হেরা ৫০০ টাকা চাইছে। তার বাবা আরো বললো, আমি তো ট্যাংকেরপাড়ে মাগনা করাইতে পারব। টাকা লাগলেও বড় জোর, ২০-৩০ টাকা লাগব। কিন্তু ঐ হাসপাতালে হুদা পেশার মাপার লাইগ্গা ৫০০ টাকা কেন চাইলো? 

তখন আমি বললাম, প্রেশার মাপার জন্য প্রাইভেট হাসপাতালে গেলেন কেন, সদর হাসপাতালেই তো বিনা পয়সায় পেশার মাপার সুযোগ আছে। বলে আমি রায়হানকে ইমারজেন্সি রুমে নিয়ে গেলাম। পেশার মাপার ব্যবস্থা করলাম। ওর জন্য নিজে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকার ব্যবস্থা করলাম। কে জানতো গতকাল রাতের দেখাই হবে তার সাথে আমার শেষ দেখা! 

আজ সকালে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থা আরো বেশি খারাপ হলে তাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড যানজটের কারণে আশুগঞ্জ যাওয়ার আগেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এই অবস্থায় ঢাকা নিয়ে গিয়ে রোগী বাঁচানো সম্ভব হবে না। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে তাকে নিয়ে আসা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে।

ওদের দোকান থেকে আমার পরিবারের সবাই ফুচকা খেতো। আশেপাশের আট/দশটি স্কুলের শত শত ছেলে মেয়ে তাদের ফুচকার কাস্টমার। অনেক অভিভাবক ও দূর দূরান্তের মানুষও তাদের কাছে ফুচকা খেতে আসতো। বাপ-বেটার ফুচকা বা আচার ব্যবহার নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ কখনো শুনিনি।

আমাকে মামা ডাকতো। আমি মাঝে মাঝে বাসা থেকে টাকা আনতে ভুলে গেলে কিংবা আমার কাছে টাকা না থাকলে তার কাছ থেকে ১০/২০ টাকা, কখনো ১০০/২০০ টাকা নিয়ে উপস্থিত কাজ সারতাম। পরে আবার শোধ দিতাম। এই শহরে আমার পরিচিত কত মানুষ। কিন্তু ২০/৫০ টাকা ধার করার মতো মানুষের বেশ অভাব। রায়হান ছিল আমার সেই অভাব পূরণ করার উপস্থিত মাধ্যম। এখনো সে আমার কাছে ১২০ টাকা পাবে। টাকাটা শোধ করার আগেই সে চলে গেল।

রায়হানের বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে বিদেশ পাঠাবে। সপ্তাহ দুই পাসপোর্ট করে আসলো। কে জানতো মহান আল্লাহ তার ভিসা-পাসপোর্ট রেডি করে রেখেছে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য।

আচ্ছা, টাইফয়েড জ্বর হলে কি মানুষ মারা যায়। জানি না তো। আমার তো এই শহরের রাস্তার দুপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়েওঠা হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনা আর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বরাবরই সন্দেহ হয়? 

সবাই রায়হানের জন্য দোয়া করবেন। পরিবারের বড় ছেলেকে অকালে হারিয়ে তার বাবাও এখন ভীষণ শোকাহত। তার বাবার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ তায়ালা যেন তাদেরকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দান করেন।

-----
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২৯ আগস্ট ২০২৬

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ