Ticker

6/recent/ticker-posts

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৌকাবাইচ


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে নৌকাবাইচের ইতিহাস কয়েক শত বছরের পুরোনো। শুরুতে ধর্মীয় বা লোকবিশ্বাস ইত্যাদি নানা কারণে নৌকাবাইচ শুরু হলেও ব্রিটিশ শাসন আমলে ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি ব্যাপক গতি লাভ করে। তখনকার সময়ে আয়োজিত নৌকা বাইচে ইংরেজ প্রশাসক/ম্যাজিস্ট্রেট, ত্রিপুরা রাজ্যের রাজাগণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া নৌকাবাইচে অতিথি হয়ে আসতেন, বিজয়ীদের পুরস্কৃত করতেন।

তখন থেকেই স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সাহেব-সর্দার, জেলে-কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল এসব নৌকাবাইচে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে নৌকাবাইচ আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। বাৎসরিক নৌকা বাইচ ঘিরে প্রত্যেক এলাকায় প্রত্যেকে এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করত। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে নায়র আসার প্রচলন ছিল সে সময়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী এসব নৌকাবাইচের নানা তথ্য পাওয়া যায় বিভিন্ন সরকারি কাগজপত্র ও লেখক-গবেষকদের বিবরণীতে। সর্বপ্রথম লিখিত ডকুমেন্ট পাওয়া যায় ১৯১০ সালে প্রকাশিত ত্রিপুরা গেজেট থেকে। ‘ত্রিপুরা গেজেটীয়ার’ থেকে জানা যায়, ১৯০৮ সালে তিতাস নদীতে এক বিরাট নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা। সে সময় আখাউড়া, চান্দুরা, কুটি এবং আশুগঞ্জে ইংরেজ ব্যবসায়ীদের বিরাট বিরাট পাটের গুদাম ছিল। ঐ প্রতিযোগিতায় ইংরেজ পাট ব্যবসায়ীরা বহু সোনার মেডেল দিয়ে নৌকা বাইচ প্রতিযোগীদের পুরস্কৃত করেছিলেন। তাতে এমন ভীষণ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল যে, পুলিশকে বহু কষ্টে শান্তি রক্ষা করতে হয়েছিল।


ত্রিশের দশকেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর সংলগ্ন তিতাসের বুকে অতি জাঁকজমকের সাথে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হতো। বিজয়ী নৌকাকে মেডেল, কাপ, শীল্ড, রুপা, পিতলের কলস, পাঁঠা ইত্যাদি ট্রফি হিসেবে দেয়া হতো। নৌকা বাইচ উপলক্ষ্যে দেখতে আসা লঞ্চ, বিভিন্ন ধরনের নৌকা, কোষা, কলাগাছের ভেলা, এমন কি মাটির গামলাকে পর্যন্ত রং-বেরঙের কাগজের ফুল ইত্যাদি দিয়ে বিচিত্র সাজে সজ্জিত করা হতো।  

১১ আগস্ট ১৯২৫ সালের আনন্দবাজার পত্রিকার একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ছিল এরকম “ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সংবাদ : বাৎসরিক নৌকা দৌড়ে এবার রূপার কলসী উপহার দেবার ব্যবস্থা হইয়াছে। সরাইল পরগনার জমিদার কুমার কমল রঞ্জন, বিভাগীয় কমিশনার, জিলার ম্যাজিষ্টেট নৌকা দৌড়ে উপস্থিত থাকার কথা আছে। নতুন কমিটি হইয়া চাঁদা আদায়ের ব্যবস্থাও হইয়াছে”। 

উল্লেখ্য যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৌকাবাইচের দীর্ঘ ইতিহাস ও অনান্য বিষয়ে নিয়ে ইতঃপূর্বে যারা লেখালেখি করেছেন, গবেষণা করেছেন, যেমন : ইংরেজ লেখক ওয়েস্টবার, ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, গবেষক মুহম্মদ মুসা, সাংবাদিক লুৎফর রহমান, কবি জয়দুল হোসেন, কবি মুহিবুর রহমান এবং ড. মাহবুব পিয়াল।

ডঃ মাহবুব পিয়াল ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে নৌকাবাইচের গান সংগ্রহ করেছেন, সুর সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলো নিজ কণ্ঠে রেকর্ড করেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেয়েছেন। নৌকা বাইচ নিয়ে তাঁর লেখা একটি গ্রন্থ ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে।বাংলা একাডেমি প্রণীত বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অংশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৌকাবাইচের নানা তথ্য উল্লেখ আছে। ২০১৪ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটির প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশিষ্ট কবি ও গবেষক জয়দুল হোসেন।                      

উল্লেখ্য, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত প্রফেসর ডঃ মাহবুবুর রহমান সম্পাদিত ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা জার্নাল ‘স্থানীয় ইতিহাস’ এর ৩০তম সংখ্যায় ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৌকাবাইচ’ নিয়ে আমার লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১০ হাজার শব্দের এই প্রবন্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নৌকাবাইচের খুঁটিনাটি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রবন্ধে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৌকা বাইচ শুরুর ইতিহাস, বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচের সংক্ষিপ্ত বা বিস্তারিত তথ্য।

আছে নৌকা বাইচের নিয়মাবলি, বাইচের নৌকার নাম ও নকশা।  আছে নৌকাবাইচ নিয়ে লোককথা, কুসংস্কার। নৌকাবাইচ নিয়ে নানা সময়ে ঘটা বিভিন্ন মারামারি তথ্য এখানে সংযোজন করা হয়েছে। তাছাড়া, প্রায় ৩৮টি নৌকা বাইচের গান, যা ‘হায়রগান’ নামে পরিচিত,- এই প্রবন্ধের সংযোজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় যারা নৌকাবাইচ আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন, তাদের নামও এই প্রবন্ধ রয়েছে

গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবন্ধ লিখতে আমাকে উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং দিক নির্দেশনা দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শ্রদ্ধেয় কবি এবং গবেষক জয়দুল হোসেন। তিনি নির্দেশনা না দিলে এত বড় একটি প্রবন্ধ লেখার সাহস আমার হতো না। তাঁর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।


তিতাস নদীর নাব্যতা আর আগের মতো নেই। দখল দূষণে হারিয়ে গেছে-এর প্রবহমান স্রোত? নদীর স্রোতের মতোই হারিয়ে গেছে এর নৌকা বাইচের জৌলুশসময় ঐতিহ্য। নানা সময় নানা কারণে বন্ধ থাকলেও আবার কারো কারো প্রচেষ্টায় বাইচের নৌকা, অলস নৌকাগুলো বছর বছর ঘুমের অবসান ঘটিয়ে আবার জলের বুকে সাঁতার কেটেছে। শত শত, মাঝে মাঝের লগি-বইঠার আঘাতে স্পন্দিত হয়েছে তিতাসের জল।

সেই স্পন্দন আগামীকাল আবার ফিরে আসছে। দুই বছর বন্ধ থাকার পর আগামীকাল আবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী এই নৌকা বাইচ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী এই নৌকাবাইচ দেখতে আসতে পারেন আপনিও। ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে আসুন সপরিবারে।

                 

বিশেষ দ্রষ্টব্য : আগামীকালের নৌকাবাইচের যারা ছবি, ভিডিও তুলবেন, অনুগ্রহপূর্বক আপনাদের ছবি, ভিডিওগুলো (what'sapp 01717-095751) নাম্বারের এ পাঠানোর জন্য অনুরোধ রইল। প্রতিযোগিতার ছবি ছাড়াও, নৌকা বাইচে অংশগ্রহণকারী নৌকা ও মাঝিদের ছবি, অনুষ্ঠানের অতিথিগণের ছবি, পুরস্কার বিতরণের ছবি, দর্শকদের ভিড়ের ছবি, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ-এর লিংকও পাঠাতে পারেন। এই তথ্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নৌকা বাইচ নিয়ে গবেষণার জন্য আপনাদের নামসহ সংরক্ষণ করা হবে।

 

-----

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

১১ সেপ্টেম্বর ২৬


                                     


                                  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ