বিশেষ ফিচার :
ক্যাডেট শফিউল : মৈন্দ গ্রামের অবিকশিত অগ্নি কুমসুম
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
(‘পড়ি বই, মানুষ হই’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘ক্যাডেট শফিউল স্মৃতি পাঠাগার ও সমাজ বিকাশ কেন্দ্র’। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়নের মৈন্দ গ্রামের সরকার বাড়ির মেধাবী ছাত্র প্রয়াত ক্যাডেট শফিউল-এর স্মৃতি রক্ষার্থে এই পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন ক্যাডেট শফিউলের পরিবার ও এলাকাবাসী। এ উপলক্ষে গত ০২ মে ২০২৬ একটি বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। )
সব মৃত্যুই শোকের মাধ্যমে শেষ হলেও কিছু মৃত্যু প্রেরণা উৎস হয়ে থাকে। ক্যাডেট মো. শফিউল আলম (কাজল)-এর মৃত্যু ঠিক সেই রকমই কিছু। ২২ বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ বছরের দুরন্ত কিশোর শফিউলের। সিলেট ক্যাডেট কলেজের মেধাবী ছাত্র ছিল শফিউল। পড়াশোনা থেকে শুরু করে খেলাধুলা, মানবিক কাজ এবং আচার-ব্যবহারে সকলের মন জয় করা নিয়েছিল কাজল অল্প বয়সি এই তরুণ। বাবা, মা গ্রামের লোকজন, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণও স্বপ্ন দেখেছিলেন কাজলকে নিয়ে। স্বপ্ন দেখেছিল কাজল নিজেও। গায়ে সেনাবাহিনীর পোশাকে জড়িয়ে একদিন বাবা-মাকে স্যালুট করবে, দেশের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিবে- সেরকমই প্রস্তুতি ছিল তার।
১৯৮৫ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করে ক্যাডেট শফিউল। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে ভর্তি হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্বনামধন্য অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে সিলেট ক্যাডেট কলেজে চান্স পায় সে। এই কলেজের ২০০৪ সালের এইচএসসি ব্যাচের ছাত্র শফিউল। লেখাপড়ায় যেমন ভালো, খেলাধুলাতেও তেমন সেরা। দৌড়, সাঁতার, ভলিবল, কেরামসহ সব খেলাতেই নিজের পারদর্শিতা দেখিয়েছে অল্প বয়সেই। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কার্যক্রমেও যুক্ত ছিল সে। আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলে দেওয়ার চেষ্টা ছিল তার শৈশব থেকেই।
কিন্তু নিজের আর পরিবারের সবার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় আকস্মিক এক দুর্ঘটনায়। এসএসসি পরীক্ষার পর ৪০ দিনের জন্য তাবলিগে গিয়েছিল রাজশাহীতে। সেখানের এক পুকুরে সাঁতার কাটার জন্য ঝাঁপ দিতেই পানির নিচে থাকা পুরাতন সিঁড়ির সাথে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে তার। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রথমে রাজশাহী হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে তাকে ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ৯ দিন এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালের ৪ মে মাত্র ১৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে এই মেধাবী শিক্ষার্থী।
শফিউলের মৃত্যুতে তার বাবা-মা, ভাই-বোন শোকাহত হলেও ভেঙে পড়েননি। তারা তাকে চোখের আড়াল হলেও মনের আড়াল হতে দেননি। শফিউলের মৃত্যুর কিছুদিন পরেই তার স্মৃতিকে ধারণ করে রাখার জন্য একটি পাঠাগার গড়ার উদ্যোগ নেন তারা। কিন্তু নানা কারণে তা আলোর মুখ না দেখলেও নিরাশ হননি তার পরিবারের সদস্যরা। বিশেষ করে শফিউলের বড় ভাই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন এন্ড প্র্যাকটিসেস (সিদীপ)-এর গবেষণা ও প্রকাশনা কর্মকর্তা মো. মাহবুব-উল-আলম এই বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব সহকারে দেখেন। ভাই হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার স্বপ্ন নিয়ে পাঠাগারটির হাল ধরেন তিনি। সম্প্রতি বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হলো এই পাঠাগারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।

এ উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান তথা আলোচনা সভা ও আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় প্রায় ১৫জন শিশুর চমৎকার কবিতা পাঠে মুখরিত আয়োজনে এ অংশগ্রহণ করেন এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও দেশবরেণ্য গুণিজন। পাঠাগারের প্রধান উদ্যোক্তা ক্যাডেট শফিউল-এর বড় মাহবুব উল আলম ভাইয়ের আমন্ত্রণে গিয়ে মৈন্দ গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যেমন মুগ্ধ হয়েছি, তেমনই মুগ্ধ হয়েছি পাঠাগারটির নান্দনিকতায়, আয়োজনের পরিপাট্যে এবং এলাকাবাসীর আথিতিয়েতায়।
শনিবার (২ মে ২০২৬) পাঁচজনের ছোটোখাটো একটি দলে হাজির আমার হই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের উত্তরের গ্রাম মৈন্দ-এ। পূর্বে এই গ্রামের নাম অনেকবার শুনলেও এবারই প্রথম যাওয়া হচ্ছে সেখানে। সিএনজি যোগে নন্দনপুর নেমে মজলিশপুর পার হয়ে যেতে হয় মৈন্দ গ্রাম। মজলিশপুরের কাছে আসতেই আমার মনে পড়ল বছর দশেক আগে এই গ্রামে আগেও একবার এসেছিলাম।
মজলিশপুর পার হয়ে যে রাস্তা দিয়ে আমরা মৈন্দ গ্রামে যাচ্ছিলাম, সে রাস্তা আমাদের অবাক করলো। ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি রাস্তা একদম ঝকঝকে। কোথাও ভাঙাচোরা, খানাখন্দ নেই। অল্পবয়সী চালক আমাদের আটো রিকাশাটিকে এত দ্রুত গতিতে চালাচ্ছে, যেন সে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। রাস্তার দুটো পাশের দৃশ্য যথেষ্ট মনোরম, গাছগাছালির ছায়ায় ঢাকা। পুকুর, ডোবা খালগুলোও স্রোতস্বিনী। দেশের আর অনেক গ্রাম শহরের অনুকরণে তার চিরাচরিত্র রূপ হারালেও এই গ্রাম যেন তার ব্যতিক্রম। অনেক পাকা বাড়ি থাকলেও টিনশেড বাড়িগুলো একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি এই গ্রাম থেকে। রাস্তার দুপাশ জুড়ে বিস্তীর্ণ মাঠে হাওয়ায় দোলে ফসলের হাসিমাখা মুখ। আমি ও কবি হেলাল উদ্দিন হৃদয় ভাই ছিলাম এক রিকশাতে। আমরা আমাদের রিকশাটি থামিয়ে কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। তারপর আর কিছুক্ষণ পথ চলতেই পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।
বাড়ি খুঁজে পেতে খুব বেশি সমস্যা হলো না। কারণ অনুষ্ঠান যেখানে হচ্ছিল সেটি বর্তমান চেয়ারম্যানের বাড়ি। ‘জনপ্রতিনিধির বাড়ি’ এই পরিচয় ছাড়াও ‘সরকার বাড়ি’ নামে এই বাড়ির নাম-ডাক আছে। আমাদের অটোরিকশা একেবারে অনুষ্ঠানস্থলের কাছে নিয়ে আসলো। কাছাকাছি আসতেই একটি মসজিদের মিনারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন পাঠাগার আর মসজিদের সামনের অংশে প্যান্ডেলের মাঝারি মানের একটি প্যান্ডেল চোখে পড়ল। রিকশা থেকে নেমে উঁকি দিয়ে দেখি অনেক লোকজন জড়ো হয়েছে সেখানে। যার উল্লেখযোগ্য অংশ ৭/৮ বছরের শিশু।
আমাদের পাঁচজনের টিমের মধ্যে তিনজনই ছিলেন অনুষ্ঠানের মূল অতিথিদের কয়েকজন। আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল আয়োজকগণ। আমার আসার কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো মূল অনুষ্ঠান, আলোচনা সভার সাথে ছোট ছোট শিশুদের কবিতা পাঠ। দুটো পর্বই একসাথে চলল। অনুষ্ঠান মঞ্চ এবং সামনে সারিতে যারা বসে ছিলেন তারা সবাই এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি। প্রথমে বুঝতে পারিনি, ভেবেছিলাম অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এলাকার লোকজন এনে বসিয়ে দিয়েছে হয়তো। কিন্তু বক্তব্য প্রদানের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য একে একে যখন তাদের পরিচয় প্রদান করা হচ্ছিল, তখন বুঝলাম আমার ধারণা ভুল। এই এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা, পরিচালনা পরিষদের বর্তমান ও সাবেক সভাপতিসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত হয়েছেন এই মহৎ আয়োজনকে উদ্দেশ্য করে। মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনসহ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ লোকের সমাবেশ ছিল অনুষ্ঠান স্থলে। তাদের প্রত্যেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে প্রয়াত শফিউলের কথা, শফিকুলের পিতা, ভাই এবং তাদের স্বপ্নের কথা। বই পড়া ও সামাজিক আন্দোলনের কথা।
আনুষ্ঠানিকতার শুরু হল ক্যাডেট শফিউলের পিতার একেএম শফিকুল ইসলামের পাঠাগার উদ্বোধন-এর ঘোষণার মাধ্যমে। একজন শোকাহত পিতা শোনালের তার সন্তান হারানোর ব্যথার কথা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা। প্রিয় সস্তান হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তরের কথা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মজলিশপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল হাসান খান। জানলাম পাঠাগার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ইতোমধ্যে বেশকিছু টাকা অনুদান হিসেবে দিয়েছেন। তাঁর দেয়া বক্তব্যে ভবিষ্যতে তিনি এই পাঠাগার পরিচলানায় নিজের সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা বললেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ। বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রাণী জগতের সব প্রাণী জন্ম হওয়ার পরে তাকে লেখাপড়া করার দরকার হয় না। লেখাপড়া ছাড়াই একটি বাঘ বাঘ হিসেবে জন্ম নেয়, হরিণ হরিণ হিসেবে জন্ম নেয়, কুকুর-বিড়াল কুকুর-বিড়াল হিসেবেই জন্ম নেয়। একমাত্র মানুষই এমন প্রাণী, যাকে মানুষ হয়ে গড়ে উঠার জন্য জ্ঞান অর্জন করতে হয়, বিদ্যালয়ে যেতে হয়, পাঠাগারে যেতে হয়, বই পড়তে হয়।
বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, এই মৈন্দ গ্রামের অবিকশিত অগ্নি কুসুম, প্রচুর সম্ভাবনাময় একটি ছেলে ছিল কাজল। তাঁর ভেতরে সম্ভাবনা ছিল আগুনের মতো, কুসুমের মতো, ফুলের মতো। সেই সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ আমরা দেখতে পাইনি। তার অকাল মৃত্যু যে সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে, এই পাঠাগারটি সেই অসম্পূর্ণ কাজটি বাস্তবায়ন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমাদের সকলের কাজ হচ্ছে সম্মিলিতভাবে এই প্রচেষ্টাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়া। নিজে আলোকিত হয়ে সমাজকে আলোকিত করার যে সম্ভাবনা শফিউলের মাঝে ছিল, সেই সম্ভাবনা এই পাঠাগারের মাধ্যমে অন্যদের মাঝে তৈরি হবে বলে আমি মনে করি। শফিউলের স্মৃতি জেগে থাকবে এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে।
অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন দেশের বিশিষ্ট কবি, গবেষক ও প্রকাশক সৈকত হাবিব। উপস্থাপক যখন বলেন যে, আজকের মুখ্য আলোচক এই পাঠাগারের জন্য ১০১টি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রদান করেছেন। তখন উপস্থিত সকলে করতালির মাধ্যমে তাকে অভিবাদন জানায়। উন্নত সমাজ গঠনে পাঠাগারের ভূমিকা শীর্ষক আলোচনায় তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাঠাগার আন্দোলন, ভিন্ন ধর্মে বই পড়ার উপর যে নির্দেশনার আছে তার কথা বলেন। বলেন পাঠাগারের মাধ্যমে একটি দেশ, একটি সমাজ, একটি প্রজন্ম কীভাবে এগিয়ে থাকে সেসব কথা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সভাপতি প্রাবন্ধিক-গবেষক, অধ্যাপক মানবর্দ্ধন পাল। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভভাবে ভঙ্গিমায় বই পড়ার উপর গুরুত্বারোপ করলেন। বললেন বিখ্যাত মনীষীদের বই পড়া নিয়ে নানা উক্তির কথা। আরেক বিশেষ অতিথি বেসরকারি গণগ্রন্থাগার পরিষদের সভাপতি, কথাসাহিত্যিক আমির হোসেন তাঁর বক্তব্যে বই পড়ার গুরুত্ব বর্ণনাসহ পাঠাগার আন্দোলনের নানা দিক বর্ণনাসহ এই পাঠাগারটি রেজিষ্ট্রেশন ও বই সংগ্রহসহ নানা ধরনের সহযোগিতার কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন, মৈন্দ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তফা মাহমুদ হায়দার, বুধল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহেদ আলী, বজলুর রহমান পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ফজিলাতুন্নাহার, বিশিষ্ট সমাজ সেবক নিয়ামত খান। গ্রামের বিশিষ্টজনদের মধ্যে কয়েকজন তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। সকলের বক্তব্যে উঠে কাজলের নানা স্মৃতি ও গুণের কথা। তারা সবাই পাঠাগারটির উন্নয়নে নিজেদের সহযোগিতার অব্যাহত থাকবে ঘোষণা দেন। অবশ্য জোহরের নামাজের সময় হওয়ায় উপস্থিত অনেককে সমাগত হওয়ায় সকেেক বক্তৃতা বা কবিতা পাঠের সুযোগ দেওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পাঠাগারের উদ্যোক্তা মো. মাহবুব উল আলম উজ্জ্বল। তিনি তাঁর হারিয়ে যাওয়া স্নেহের ছোট ভাইয়ের অসমাপ্ত জীবনী ও মৃত্যুসময়কার ঘটনা প্রবাহের লিখিত স্মৃতিগুলো পড়ে শোনান। বক্তব্যে তিনি পাঠাগার প্রতিষ্ঠায় যাদের অবদান রয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বই পড়া কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে জ্ঞানের আলো বিতরণসহ গ্রামের সকল ভালো কাজ তথা সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এই প্রতিষ্ঠানটি।
আবৃত্তিশিল্পী তাসফিয়া ইসলাম প্রমির ও মাসুম সরকারের সঞ্চালনায় প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানটিতে গ্রামের স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি করে। ছোট ছোট শিশুদের চমৎকার সব আবৃত্তিতে মুগ্ধ হন সবাই। আনুষ্ঠানে আগত অতিথরা অবাক হন গ্রামের শিশুদের এমন প্রাণবন্ত পরিবেশনা দেখে। একপর্যায়ে কথাসাহিত্যিক আমির হোসেন স্যার ও আমি পাঠাগারের জন্য আনা উপহারের বই প্রদান করি। এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা ভালো এই অনুষ্ঠানের অথিদের বরণ করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিভিন্ন লেখকের বই উপহার প্রদানে মাধ্যমে। অর্থাৎ ফুলের পরিবর্তে বই দিয়ে অতিথি বরণ। বিষয়টি নূতন, অনন্য এবং অনুকরণীয় বলে আমার মনে হলো।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিগণ ফিতা কেটে পাঠাগারে প্রবেশ করেন। তারা পাঠাগার পরিদর্শন করেন এবং পরিদর্শন রেজিস্টারে তাদের মন্তব্য লেখেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রয়ায় আমি লিখলাম- ‘আকালে ঝরে যাওয়া এক ফুল, ক্যাডেট শফিউল/তোমাকে মনে পড়ছে আজ, সবার মুখে তাই বিষাদের সাজ!/ভুলবো না তোমায়, স্মরণ রাখবো মনে,/তোমার প্রেরণায় ভূমিকা রাখবো সমাজ উন্নয়নে।’
সবশেষে পাঠাগারের আঙিনায় একটি নিমগাছ রোপণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। নিম গাছ যেমন চারপাশ থেকে দূষিত বাতাস শোষণ করে প্রকৃতিতে বিশুদ্ধ বাতাস ছড়িয়ে দেয়। একটি পাঠাগারও তেমন সমাজ থেকে দূষিত ক্রিয়াকলাপ দূরীভূত করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে। নিম গাছ যেমন শরীরের বিভিন্ন রোগ দূর করে মানবদেহকে সুস্থ-সবল করে তোলে, তেমনভাবে পাঠাগারও মানবমনের অন্ধকার/অসুখ দূর করে মানবমনকে সুস্থ ও সতেজ রাখে- এই বার্তাটিই যেন দিতে চাইলেন পাঠাগারের উদ্যোক্তাগণ।
সরকার বাড়ির জামে মসজিদের উত্তর সীমানা ঘেঁষে তৈরি পাঠাগার। দুই শতক জমির ওপর নির্মিত মাঝারি সাইজের নতুন একটি দালান ঘর। বাহিরে বড় বড় অক্ষরে লেখা পাঠাগারের নাম। ভেতরে পশ্চিম পাশের দেয়ালে পাঠাগারের লোগো। সেখানে বড় করে লেখা পাঠাগারের স্লোগান ‘পড়ি বই, মানুষ হই’। দক্ষিণের দেয়ালের পুরোটা জুড়ে দুটো বড় বড় বুক সেল্ফ। তাতে ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী বই না থাকলেও প্রায় এক হাজার বই নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে এই পাঠাগারটি। উত্তর পাশের দেয়াল জুড়ে কয়েকটি ফোল্ডিং টেবিল যুক্ত করা হয়েছে। পড়া শেষে যেন ভাঁজ করে রাখা যায়। পাঠ ছাড়াও সাহিত্য আড্ডা, ছোটোখাটো আলোচনা সভা কিংবা শিশুদের আবৃত্তি প্রশিক্ষণের জন্য এই ব্যবস্থা।
একটি টেবিল ও কয়েকটি চেয়ারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে এখানে। কিন্তু ভালো লাগলো যখন দেখলাম তিনটি শিশু পাকা ফ্লোরে বসে আপন মনে বই পড়ছে। আমি তাদের ছবি তুলতে গিয়ে দেখি দুজনের হাতে আমার দুটো শিশুতোষ বই : রাজকুমার ও তোতাপাখির গল্প এবং নদীর তীরে ভূতের নীড়ে। এই দৃশ্য দেখে আমার বেশ ভালো লাগলো। একটি শিশু মাহবুব ভাইয়ের ৮ বছর বয়সি ছেলে। পরিচয় দিয়ে তিনি জানালেন তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া এই ছেলে এখন পর্যন্ত ৩০টি বই পড়েছে। বাবার পরামর্শে তার পঠিত বইয়ের লেখকের নামসহ একটি ডাইরিতে লিখে রাখে। সে আমার পরিচয় জানতে পেরে আমার বইয়ের থাকা একটি বানান ভুল দেখিয়ে দিল। বুঝলাম, মনোযোগী পাঠকের হাতে পড়েছে আমার বই। ভবিষ্যতে আমাকে আরো সতর্ক হতে হবে!
মৈন্দ গ্রামে এসে আমরা আরেকটা জিনিস বুঝলাম। এই গ্রামের মানুষ পরিচ্ছন্নতা প্রিয় এবং গাছ প্রেমিক। রাস্তার দু’ধার ছাড়াও প্রতিটি বাড়ির উঠানে নানা রকম ফুল ফলের গাছ লাগানো আছে। যে পাঠাগারটি উদ্বোধন করা হয়েছে তার সামনে একটি ছোট কাঁঠাল গাছ দাঁড়িয়ে আছে একেবারে নাকের ডগায়। যেটি তুলে ফেললে পাঠাগারের সম্মুখ অংশটি দেখতে আরো ভালো লাগবে। অন্যরা হলেও তাই করতো, কিন্তু গাছ প্রেমিক মাহবুব ভাই জানালেন তিনি ইচ্ছা করেই গাছটিকে এখান থেকে অপসারণ করেননি। যে বাড়িতে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম, সে বাড়ির উঠোন উঠোনের মাঝ বরাবর বেশ কয়েকটি বড় বড় গাছ দাঁড়িয়ে আছে। ছোট উঠোন, গাছ কেটে ফেললে জায়গাটি আরো প্রশস্ত হতো। নড়াচড়া জায়গা পাওয়া যেত, কিন্তু তারা গাছ কাটেনি।
পাঠাগারের পাশে যে মসজিদ, তারপরে একটি কবরস্থান। যেখানে শুয়ে আছে ক্যাডেট শফিউলসহ এলাকার প্রয়াতজনরা। তারপরে হাঁটা রাস্তা পার হলেই একটি বিশাল পুকুর। সদ্য খনন করে তার পাড় বাঁধা হয়েছে। বিশাল পুকুরের এক ধারে দেখলাম ছোট একটি লতানো নয়নচারা ফুল গাছ। তুলে ফেললে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু এটি তুলে ফেলা হয়নি। এছাড়া আরো দুই একটি পুকুর দেখলাম, যেগুলোর পানিও বেশ পরিষ্কার। এলাকার মানুষ এ সকল পুকুরে গোসলসহ নানা কাজে ব্যবহার করে। প্রত্যেকটি পুকুরেই একাধিক শান বাঁধানো সিঁড়ি ঘাট রয়েছে এবং পুকুরে চারপাশে বড় বড় গাছে হাঁটার রাস্তা ও নানা ধরনের ছোট বড় ও মাঝারি সাইজের গাছ সে রাস্তায় ছায়া বিস্তার করে রেখেছে। খাবার শেষে আমরা যে বাগানে বসলাম, সেটিও যে স্থানে বসলাম সেটিও ছোটোখাটো একটি বাগান। ফলজ ও শাক-সবজির গাছে বেশ মনোরম পরিবেশ। চা-পানসহ আড্ডা আয়োজনে কাটালাম আরো ঘণ্টাখানেক। আমি ও হৃদয় ভাই ঘুরে ঘুরে নানা স্থানে ছবি তুললাম।
সত্যি বলতে খুব সহজে আমাদের সেখান থেকে আসতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। কিন্তু শহর থেকে দূরে, মেঘলা দিনে বেশিক্ষণ গ্রামে থাকা উচিত হবে না বলে, একটি অতৃপ্তি নিয়ে আমরা শহরে ফিরে আসলাম। আসার সময় বলে আসলাম আমরা আবার আসবো এই মনোরম গ্রামে, আর সাহিত্য আড্ডা জমাবো শফিউল স্মৃতি পাঠাগার ও সমাজ বিকাশ কেন্দ্রে। এখানকার সাথে কাটবো চমৎকার একটি বিকেল। শুনবো, শোনাবা শফিউলদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা। অকালে ঝড়ে যাওয়া শফিউলরা এই ভাবেই জীবিত রবে সবার স্মৃতিতে- প্রেরণার উৎসাহ হিসেবে।
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
১২ মে ২০২৬
(এই ফিচারটির পরিমার্জিত রূপ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিডীপ-এর শিক্ষা বিষয়ক বুলেটিন ‘শিক্ষালোক’-এর মে-জুলাই ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। ছবিসহ এই লেখাটি আমার ফেসবুকেও পড়তে পারবেন।)




























0 মন্তব্যসমূহ