Ticker

6/recent/ticker-posts

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম

 

তিনি জন্মেছিলেন ১৯৫২ সালের ১৫ মার্চ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার অন্তর্গত রামরাইল ইউনিয়নের ভোলাচং গ্রামে। জন্মের সারে তিন বছর পর পিতৃহারা হন। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায়, খুব বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেননি। শুনেছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তারপরই বেরিয়ে গেছেন, কাজের সন্ধানে। 


বাড়ির পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটে জানা যায়, কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি নরসিংদীর এক তাঁতমিলে কিছুদিন কাজ করেন। সেখান থেকে নরসিংদীর ডেল্টা কোম্পানির জুট মিলে আসেন এবং এখানে ইলেকট্রিক কাজ শেখেন। অল্প দিনেই তিনি ইলেকট্রিক কাজে বেশ দক্ষ হয়ে ওঠেন এবং এখানেই ‘ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটার’ হিসেবে একবছর কাজ করেন। 


পরে ১৯৬৬ সালে নরসিংদীর ইউনাইটেড জুটমিলে এসে ইলেকট্রিক ফিটার কর্মে নিযুক্ত হন এবং সেখানে প্রায় তিন বছর কাজ করেন। এরপর নারায়নগঞ্জে অবস্থিত সিদ্দিরগজ্ঞ পাওয়ার হাউজের পিইসি প্রাইভেট কম্পানীতে প্রায় একবছর ‘ইলেক্ট্রিক্যাল ফিটার’ হিসেবে চাকরিতে যুক্ত ছিলেন।


এরপর ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারিতে নারায়নগঞ্জের কাঁচপুর ব্রীজের কাছে অবস্থিত ম্যাটচুই কম্পানিতে যোগদেন। এরমাত্র তিনমাস পরেই শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। নারায়নগঞ্জের একটি ঘটনার আকস্মিকতায় যুদ্ধ অবস্থার মধ্যেই তিনি সেখান থেকে বহু কষ্টে বাড়ি ফিরে আসেন এবং কিছুদিন আত্মাগোপন করে থাকেন, পরিশেষে যোগদেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। 


যুদ্ধ শেষে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। এবং আবার জীবিকার তাগিদে কাজের সন্ধানে নেমে পড়েন। ১৯৭২ সালে ৬ জুন বাংলাদেশ রেলওয়ের মেরিন ডির্পামেন্টে চাকরিতে যোগদেন তিনি। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত তার নামের ভুলের কারনে ইলেক্ট্রনিক বিভাগের চাকরির বদলে তার চাকরি হয় রেলওয়ের জহাজের নাবিকের হিসেবে। তথাপী তিনি নিষ্ঠার সাথে দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর সেখানে চাকরি করেন ।


তার দীর্ঘ কর্মজীবনে পুরো সময় কেটেছে উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন ফেরিঘাটে। দীর্ঘ ২৭ বছর চাকরির করার পর ২০০০ সালের ২৯ জানুয়ারি স্বেচ্ছায় চুড়ান্ত অবসরগ্রহন করেন। অবসরে তিনি সপরিবারে ফিরে আসেন নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।


নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে কোনো রকম একটি থাকার ঘর নির্মাণ করেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! দীর্ঘ জীবন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাইরে থাকার পর, নিজ বাপ-মায়ের ভিটায় এসে বেশিদিন থাকতে পারলেন না। মরণব্যাধি ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। এক বছর রোগাক্রান্ত থাকার পর ২০০২ সালের ২ নভেম্বর, শনিবার বিকেলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও জীবদ্দশায় তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো সুযোগ-সুবিধা নেননি নেই। ১৯৯৮ সালে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করার কাজ শুরু হয়, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তাঁর সহযোদ্ধাদের কেউ তাঁর সাথে যোগাযোগ করা করলে, তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা তিনি নিবেন না’। 


চাকরি শেষে বাড়িতে ফিরে আসার পরও তালিকাভুক্তর জন্য অনেকের অনুরোধ তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি এমনই আত্মপ্রত্যয়ী ও কর্মঠ মানুষ ছিলেন। আত্মমর্যাদা সম্পন্ন এবং আত্মাভিমানীও। তাঁর মৃত্যুর প্রায় ১৮ বছর পর তাঁর স্ত্রী-সন্তান ও সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘ ১৫ বছরের চেষ্টার পর ২০২০ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নাম বাংলাদেশ সরকারের গেজেট ভুক্ত হয়। -----------


আমি প্রতিদিন অনেক কিছু নিয়ে লেখালেখি করি। অনেক ব্যক্তিকে নিয়ে লেখি। কিন্তু নিজের জন্মদাতা পিতাকে নিয়ে কিছু লিখতে পারি না। লিখতে গেলেই আমার হাত থেমে আসে, চোখ ভিজে আসে। তিনি মারা গেছেন, এই কথা মেনে নিতে আজও আমার বুক ভেঙে যায়। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন- এই কথাটিও আমি কোনোদিন ফেসবুকে লিখিনি। তাঁর জন্ম বা মৃত্যু দিবস নিয়েও কোনদিন পোস্ট দেইনি। আজ দিলাম। 


অনেকবার ভেবেছি বাবাকে নিয়ে স্মৃতিকথা লিখব। তিনি মারা যাওয়ার সময় আমর বয়স মাত্র ১৭ বছর। ১৭ বছর বয়সে আর কতটুকু স্মৃতিইবা ধরে রাখা যায়? যতটুকু রেখেছি, জানি না, সে কবে লিখে শেষ করতে পারবো। তাছাড়া তাঁর মুক্তিযুদ্ধের যোগদান ও যুদ্ধকালীন ঘটনাসমূহের লেখার ইচ্ছেতো অপূর্ণই থেকে গেল।


আজ তাঁর ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। 


রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।

———

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

২ নভেম্বর ২০২৬

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ