জান্নাতের বর্ণনায় জানা যায়, বেহেশতে চার ধরনের নদী থাকবে। নদীগুলো যথাক্রমে সুস্বাদু পানি, সরাব, দুধ ও মধু দ্বারা প্রবাহিত হবে। মহিউদ্দিন আহমেদ মূলত বলতে চেয়েছেন, তার সোনার দেশ পাকিস্তান আসলে একটি বেহেশততম স্থান। যেখানে দুধ ও মধুর নদী প্রবাহিত হতো। বাংলাদেশ হওয়ায় সেই সোনার দেশ ভেঙে এই অঞ্চল মাটির দেশ হয়ে গেছে, অর্থাৎ তাদের কাছে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ মূলত একটি দোজখ। আর ৫৫ বছর ধরে সেই দোজখে বসবাস করছেন মহিউদ্দিন আহমেদ। গত দুই বছরে এটা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়েছে যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছরও পরও এ দেশে এখনো অনেক পাকিস্তানপন্থি রয়েছে। যারা বাংলাদেশকে মনে প্রাণে মেনে নেয়নি। এবং তারা কেউ নির্দিষ্ট দলের ধর্মের গোষ্ঠী নয়। বরং গত পঞ্চান্ন বছরে রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে তারা প্রকাশ্য বা গোপনে নিজেদের অবস্থান খুব দৃঢ় করেছে। মহিউদ্দিন আহমেদ তাদেরই একজন।
তো মহিউদ্দিন আহমেদের মতো আরো যারা রয়েছেন, যারা মনে করেন পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ায় তারা দুধ ও মধু খাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, তারা আসলে গত পঞ্চান্ন বছরে বছর কী খেয়ে এই দেশে বসবাস করছেন।–আমরা তো মাটির দেশে উৎপাদিত ফুল, ফসল, ফলমূল, শাকসবজি মাছ-মাংস খেয়েছি। তাদের ভাষায় এই দোজখ দেশে তারা কী খেয়েছে? দোজখবাসী খাবারতো ভয়ানক কাঁটাযুক্ত গাছ, দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ, রক্ত এবং পচা চামড়ার তরল মিশ্রণ। মহিউদ্দিন আহমেদ ও তার বন্ধুরা কি এতদিন তাই খেয়েছেন? এবং এসব খাওয়া থেকে নিষ্কৃতি পেতেই কী তারা বাংলাদেশকে এখন পাকিস্তান মডেলের একটি রাষ্ট্র বানাতে চাইছেন?
উনার আজকের কলামটি পুরোটাই পড়েছি। কলামে থাকা সব কথার সাথে একমত বা দ্বিমত পোষণ করছি না। তবে তিনি যে, বাংলাদেশপন্থার পক্ষে কথা বলেননি একথা স্পষ্ট। তার আর অন্য অনেক লেখার মতোই তিনি ঘুরে ফিরে তার পাকিস্তানপন্থার কথায় তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। উনারা অনেক কথা বলেন, কিন্তু বারবার ঘুরেফিরে এটা ভুলে যান যে, ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। বাংলাদেশ তার জন্মের আগে বৈষম্যের শিকার হয়ে ন্যায্য অধিকার চেয়েছে, অধিকার না পেয়ে স্বাধিকার চেয়েছে। স্বাধিকার না পেয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই যুদ্ধ কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না। বাঙালিরা নিজেরা আগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ পরিচালনা করেছে।
বাংলাদেশ নিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধ করেছে, রীতিমতো-আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েই। যুদ্ধে নিজেরা প্রাণ দিয়েছে, শত্রু বধ করেছে। শরণার্থী হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়েছে। আর এতসব হওয়ার জন্য দীর্ঘদিনের একটি আন্দোলন, লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশিদের আছে। তাই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। লড়াই করেই জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা। তাইতো শিল্পী বলেছেন ‘আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়ায় নয়।’ দানে জন্ম হয়েছে পাকিস্তানের, ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো- শাসন করো’ তত্ত্ব বা জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বই মূলত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এরকম আরো অনেক ষড়্যন্ত্র তত্ত্বেই পাকিস্তান নামক উদ্ভূত রাষ্ট্রের জন্ম।
মহিউদ্দিন আহমেদ অনেক বই লিখেছেন, অনেক পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু তিনি সম্ভবত রজনিকান্ত সেনের ‘পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা, নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”--লাইনটি পড়েননি। তিনি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘মধুর চেয়ে আছে মধুর/সে এই আমার দেশের মাটি/ আমার দেশের পথের ধূলা/ খাঁটি সোনার চাইতে খাঁটি/কোল ভরা তার কনক ধানে/আটটি শীষে বাঁধা আঁটি।/মধুর চেয়ে আছে মধুর/সে এই আমার দেশের মাটি।—--বাক্যগুলো পড়েননি।
তিনি আব্দুল লতিফ-এর ‘সোনা সোনা সোনা/লোকে বলে সোনা/সোনা নয় তত খাঁটি/বলো যত খাঁটি/তার চেয়ে খাঁটি বাংলাদেশের মাটি রে/আমার জন্মভূমির মাটি। জনপ্রিয় এই গানটি শোনেনি। তিনি হয়ত কাজী নজরুল ইসলামের ‘খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি/ আমার দেশের মাটি/ এই দেশেরই মাটি জলে/এই দেশেরই ফুলে ফলে/ তৃষ্ণা মিটাই মিটাই ক্ষুধা/পিয়ে এরি দুধের বাটি॥ এই গানটি পড়েননি বা শোনেননি। পড়ে থাকলেও তিনি এর মর্মার্থ বুঝতে পারেননি। এই জন্যই তিনি তার লেখায় ‘পাকিস্তানকে সোনার দেশ’ বলে উল্লেখ করেছেন।-
আচ্ছা, বাংলাদেশেতো দুধ ও মধুর নহর বহে না, পাকিস্তানে এখন দুধ-মধুর নহর বহে কিনা কেউ কি জানেন? আমরাতো জানি ঐ দেশে হাঁট-বাজার, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসায় কিছুদিন বোমা ফুটে মানুষের রক্তের নহর বয়ে যায়।
আরে ভাই, ভারতের বিরোধিতা করেন ভালো কথা। নিজ দেশের কোনো দল, সরকার বা মতাদর্শের বিরোধিতা করেন তাওতো গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ বলে মেনে নেয়া যায়। তাই বলে নিজের মাতৃভূমিকে এমন এক দেশের সাথে তুলনা করবেন, যাকে আমরা পরাজিত করেছি, বিতাড়িত করেছি লাখো মানুষের জীবন, রক্ত ও সম্ভ্রমের দামে? যে রাষ্ট্রকে আমরা পরাজিত করে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সে রাষ্ট্র যত ভালোই, উন্নতই হোক না কেন, মর্যাদায় তা আমাদের জুতার সমতুল্য নয় কি? নিজেদের দেশের মানুষকে হত্যা করেছে যারা- তাদের শ্রেষ্ঠ মনে করে, নিজের মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে যারা, তাদের সম্মানের চোখে দেখে- এ কেমন দেশপ্রেমিক, এ কেমন সন্তান?
কবি আবদুল হাকিম কী তাদের উদ্দেশ্য করেই বলেছেন, ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি, হিংসে বঙ্গবাণী। সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’।
—-------
‘দুধ-মধুর নহর চাই না, ওসব ছলাকল। চাই শুধু মায়ের আঁচল ধোয়া পানি, নদীর ঘোলা জল”
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
৩ জুলাই ২০২৬

0 মন্তব্যসমূহ