আসুন, আসুন, হে মাননীয় আসামি! আপনার জন্যইতো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আমরা। প্রথমে আপনার চরণ যুগল এগিয়ে দিন। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পবিত্র পানি দিয়ে আপনার পা দুটো ধুয়ে দিই। আপনি আসুন, তাড়াতাড়ি আসুন। আপনার জন্য বিছিয়ে রেখেছি লাল গালিচা। আচ্ছা, আপনি কি মহান কর্ম করছেন? শিশু ধর্ষণ- হত্যা? সমস্যা নেই, একদম চিন্তা করবেন না। আপনাকে আইনি সুরক্ষা দিতে তৈরি আছি আমরা। আপনার জন্য পুলিশ রেডি আছে। তারা আপনাকে হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পড়িয়ে উদ্ধার করে নিয়ে আসবে। যেন উত্তেজিত জনতা আপনার কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
তারপর আপনাকে পুলিশের গাড়িতে করেই পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা দিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়া। আপনাকে জামিন দিতে বিচারক আসনে বসে আছেন বিলেত থেকে আইনশাস্ত্র পড়ে আসা বিজ্ঞ ম্যাজিস্টেট। প্রথম প্রথম তিনি হয়ত জামিন দেবেন না। কিন্তু কয়েকমাস পরে ঠিকই দেবেন। কেনো দেবে না বলেন? নামি-দামি উকিলরা সবাই এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন আপনার জামিন করানোর জন্য। আইনি কিতাব খুলে তারা এমন সব যুক্তি তর্ক করবেন যে, আপনার জামিন না হয়ে পারেই না। তারা প্রমাণ করে ছাড়বে আপনি নির্দোষ। শুধু নির্দোষ তা নয়, ঘটনার সময় আপনি ঘটনা স্থলে ছিলেনই না। কয়েক বছর মামলা চললে এটাও প্রমাণ করা যাবে যে, ঘটনা সময় আপনার জন্মই হয়নি। শুধু শুধু তো তারা কালো কোট পরে না। তাদের আছে কালোজাদু করার বিস্ময়কর ক্ষমতা!
শুধু হে মাননীয় আসামি, আপনাকে যা করতে হবে, তা হলো, তাদের ফিসটা একটু বাড়িয়ে দেবেন। বোঝেনই তো জিনিসপত্রের যে দাম! তাছাড়া আইনের বইপত্রের দাম তো একবারে সপ্ত আকাশ ছোঁয়া। আবার আপনি করেছেন শিশু হত্যা, সাথে ধর্ষণও। একটু তো হাতের মুঠি খুলতেই হবে স্যার। না না, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমাদের বিজ্ঞ আইনজীবীগণ গ্যারান্টি দিয়ে এসব মামলা থেকে শুধু জামিনই নয়। একেবারে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে মামলা থেকে নিষ্কৃতি করে দিতে পারেন।
কী ভাবছেন জনাব? কয়েকমাস আপনি জেলে থাকতে চান। যেন বাহিরের উত্তেজিত জনতার রাগ-ক্ষোভ অরেকটু প্রশমিত হয়। ঠিক আছে, ঠিক আছে। জেলজীবন নিয়েও কোনো ভাবনা নয়। আপনি হচ্ছেন আমাদের মহান অতিথি। আপনি করেছেন একটি মহান কাজ। কী যেন করেছেন? কী যেন করেছেন? ও মনে পড়েছে, খুন-ধর্ষণ? দেখুনতো, কী ভুলো মন আমার! আপনার মহান কর্মের কথাই ভুলে গেছি। জ্বি জ্বি, আমার মতোই ঐ নির্বোধ জনতাও কিছুদিন পরে ভুলে যাবে আপনার সব অপকর্ম। ও সরি, মুখ ফসকে অপকর্ম বলে ফেলেছি। বলতে চেয়েছিলাম, আপনার মহান কর্ম। তো যে কথা বলছিলাম, জনতার উত্তেজনা থামার আগ পর্যন্ত আপনি বরং জেলেই থাকুন। সেটাই হবে আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। জানেনতো কারাগারের ফটকে বড় বড় অক্ষরে লেখা খাকে ‘রাখি নিরাপদ-দেখাব আলো পথ।
আপনি অবশ্য দেশের কোথাও আত্মগোপন করেও থাকতে পারেন। তবে তা ঠিক হবে না। আপনাকে গ্রেফতারের জন্য বিক্ষুব্ধ জনতা কয়েকদিন পর মিছিল-মিটিং করবে। ফেসবুক, পত্রিকা গরম করে ফেলবে। এর মধ্যে আপনাকে কোথাও পেলে গণপিটুনি দিয়ে মেরেও ফেলবে। তারচেয়ে আপনি কিছুদিন কারাগারেই থাকুন। সেটা একেবারেই নিরাপদ।
টেনশন করবেন না হে মাননীয় আসামি। সেখানে আপনি ভালোই থাকবেন। আমরা আপনার জন্য মেডিক্যাল সিটের ব্যবস্থা করে দেবো। আপনি সেখানে আরামদায়ক বিছানায় ঘুমাবেন, ফ্যানের বাতাস খাবেন, ফিজের ঠান্ডা পানি খাবেন। কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না। আমাদের সব ব্যস্ত করা আছে আপনি শুধু আপনার হাতের আশীর্বাদ দিয়ে আমাদের পকেটটা ভরে দেবেন।
কি বললেন? আমরা আপনার জন্য এত কিছু কেন করছি। না মানে….অমুক লিডার ফোন করেছিলেন। বলেছেন, আপনি তাদের দলের লোক, আপনাকে একটু যেন দেখে রাখি। বলুন, নেতার কথা আমরা কি ফেলতে পারি?
ছি! ছি! ওভাবে বলবেন না স্যার। আপনাদের মতো মহান আসামি দিয়েইতো আমাদের জীবন-জীবিকা। আপনারা একেকজন এরকম মহান কর্ম করেন বলেইতো আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারি। তাদের নামি স্কুল পড়াই। দামি বাসায় রাখি। বৌ-বাচ্চাদের নিয়ে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে পারি আপনাদের মহান কর্মের কারণে। কী যেন মহান কর্ম আপনি করেছেন! ও.. মনে পড়েছে শিশু হত্যা। হত্যার আগে বাচ্চাটাকে ধর্ষণও করেছেন।
কী যে বলেন, আজ কাল এটা আবার বড় কোনো অপরাধ হলো নাকি? শুনছেন না, সারা দেশে প্রায়ই এসব হচ্ছে। বরং গুরু-ছাগল চুরি কম হচ্ছে। খুন-ধর্ষণ বেশি হচ্ছে। আপনি তো আর কারো গরু-ছাগল চুরি করেননি। কারো পকেট মারেননি। আপনি এত টেনশন কেনো করছেন স্যার। একদম দুশ্চিন্তা করবেন না স্যার। আপনি কি জানেন না। আপনাকে নিরাপত্তা, আরাম-আয়েশ ও আইনি সহায়তা দিতেই আমাদের শত আয়োজন- শত ব্যবস্থাপনা। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমার তো আছিই। আপনি নিশ্চিত মুক্ত হয়ে যেতে পারবেন। মুক্ত হয়েই আপনি পরবর্তী খুন-ধর্ষণের জন্য প্রস্তৃতি নিতে পারবেন স্যার।
হে মহান আসামি
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২০ মে ২০২৬

0 মন্তব্যসমূহ