ইতিহাস আসলে লেখা যায় না। কেউ ইতিহাস লিখলে সে কিছু হলেও নিজের পক্ষে লিখে। আর নিজের মতের পক্ষে লিখতে গিয়ে কিছু ভুল-অসত্য ইতিহাসে লিখে রাখে। তাই কোনো বিষয়ে প্রকৃত সত্য ইতিহাস কেউ রচনা করতে পারে না। মানুষের রেখা যাওয়া কর্মগুণেই মহাকাল তার নিজের খাতায় সঠিক ইতিহাস লিখে রাখে। তাই বলা যায় যে- ইতিহাস মূলত নিজে নিজেই রচিত হয়।
সত্যিই সত্যিই ইতিহাস যদি লেখা যেত, তাহলে মানুষ যুদ্ধ না করেই যুদ্ধের ইতিহাস লিখত। বিজয়ী না হয়েও জয়ের ইতিহাস লিখত। ইতিহাস যদি লেখা যেত, তাহলে ব্রিটিশ আর মিরজাফরের উত্তরসূরিরা মিলে ২০০ বছর ধরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে যে কলঙ্ক লেপন করেছিল, তাতে সিরাজউদ্দৌলা এই ভূখণ্ডের ইতিহাসের খাতায় ভিলেন হয়ে থাকতেন।
কিন্তু মিথ্যা ইতিহাস লিখে সিরাজউদ্দৌলাকে ভিলেন বানিয়ে তারা খুব বেশি দিন রাখতে পারেনি। নিজের চরিত্রের উপর থেকে বিরুদ্ধ চারণকারীদের অর্পণ করা সকল ময়লা আবর্জনা-অপসারণ করে সিরাজউদ্দৌলা হয়েছেন নায়ক, আর যুদ্ধে জয়ী হয়েও লর্ড ক্লাইভ-মিরজাফর গংরা হয়েছে ভিলেন।
ঝরনার প্রস্রবণ যেমন আপন ছন্দে প্রবাহিত হয়, নদী যেমন আপন ধারায় বয়ে চলে- এগিয়ে যায় সাগরের দিকে। ইতিহাস তেমনই তার নিজস্ব গতিপথেই এগিয়ে চলে- স্বমহিমায়।
মহাকালের লেখা ইতিহাসে যে নায়ক, সে নায়কই থাকে। যে ভিলেন সে ভিলেনই থাকে। ভিলেনকে নায়ক আর নায়ককে ভিলেন বানিয়ে মানুষের মিথ্যা ইতিহাস রচনার চেষ্টা বরাবরই ব্যর্থ হয়। কেননা মহাকাল তার গর্ভে কখনোই মিথ্যাকে ধারণ করেন। কেটেকুটে, চেটেপুটে ঝেড়ে ফেলে। কেবল সঠিক ইতিহাসটুকুকেই সে পরম যত্নে সংরক্ষণ করে। যা কেউ গড়তেও পারে না, ভাঙতে পারে না, পোড়াতেও পারে না।
একথা ঠিক যে, ইতিহাসের মহানায়কদের চরিত্র শতভাগ নিষ্কলঙ্ক হয় না। আবার ভিলেনদের চরিত্রেও পাওয়া যায় মানবিকতার ইতিহাস। কেননা, ইতিহাসের যে নায়ক; সেতো গল্প উপন্যাসের লেখক বা নাটক সিনেমার পরিচালকের হাতে তৈরি হওয়া চরিত্র নয় যে, তাকে ছোটোবেলা থেকেই জ্ঞানী, পরিশ্রমী, বীর বা মহামানব হিসেবে গড়ে তোলা হবে! আর যে ভিলেন সে ছোট বেলা থেকেই সব দোষ-ত্রুটি নিয়ে বড় হবে?
তাই ঐতিহাসিক নায়কদের চরিত্রের খুঁত বের করে তাদের অবহেলা-অবমূল্যায়ন করা, অথবা কেউ পরাজিত হলে বা কোনো এক দিক দিয়ে খারাপ মানে সে সব দিক দিয়েই খারাপ হবে- এটা ভাবা অন্যায়। এরকম ভাবার অর্থ হলো পৃথিবীর কোনো ভালোকেই স্বীকৃতি না দেওয়া। - একমাত্র হীনম্মন্য মানুষরা অবশ্য তাই করে।
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
১৭ অক্টোবর ২৪
ছবি : আহসান মঞ্জিল, ঢাকা।



0 মন্তব্যসমূহ