হতাম যদি পাখি
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
প্রিয় ছোট্ট বন্ধুরা- তোমরা কি জানো, পাখিদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কী? উত্তরে তোমরা হয়ত বলবে ‘পাখিরা উড়তে পারে’। হ্যাঁ ঠিক ধরেছো ‘পাখিরা উড়তে পারে’ এটা তাদের একটি প্রধানতম শারীরিক বৈশিষ্ট্য, যা পাখিদের মানুষ ও অন্যান্য জীব-জন্তু থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু উড়তে পারা ছাড়াও পাখিদের আরো অনেক স্বভাবগত গুণ বা বৈশিষ্ট্য আছে, যা থেকে আমরা মানুষরা অনেক কিছু শিখতে পারি। যেমন ধরো, পাখিদের অন্যতম একটি গুণ হলো ‘পাখিরা খাদ্য সঞ্চয় করে না’। আমি প্রথমেই তোমাদের বলবো পাখিদের খাদ্য সঞ্চয় না করার এই গুণটি নিয়ে। তোমরা কী জানো? খাদ্য সঞ্চয় না করার এই গুণটির জন্য পাখিদের জীবন ব্যবস্থায় মানুষের জীবন-ব্যবস্থার তুলনায় অনেকগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যেমন :
খাদ্য সঞ্চয় না করার কারণে পাখিরা যথেষ্ট পরিশ্রমী হয়। প্রতিদিন ভোরে উঠতে হয় তাদের, কারণ তারা শেষ খাবার খেয়েছিলো সেই সন্ধ্যার আগে। তাই অভুক্ত পেট ভরাতে সূর্য উঠার আগেই তাদের ঘুম থেকে উঠতে হয়। খাদ্যের সন্ধানে তারা সারা দিন এখান থেকে সেখানে, এ গাছ থেকে ঐ গাছে উড়াউড়ি করে। পরিশ্রমী হওয়ার কারণে তাদের দিনের বেলা খাদ্যের অভাব হয় না। খাদ্য সঞ্চয় করে না বলে ওদের ফ্রিজের দরকার হয় না, প্রতিদিন টাটকা খাবার খায়। কিন্তু পাখিরা যদি আগের রাতে খাদ্য সঞ্চয় করে রাখতো, তাহলে তারা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠত না। প্রতিদিন নিয়মিত পরিশ্রম করত না। ফলে তাদের শরীরে নানান রোগ-বালাই বাসা বাঁধতো। খাদ্য সঞ্চয় না করার এই গুণটি তাদের রোগের হাত থেকে বাঁচায়। তাই তাদের ডাক্তার-কবিরাজের দরকার হয় না। হাসপাতালের দরকার হয় না। ‘খুব মজা, তাই না।’
খাদ্য সঞ্চয় না করার কারণে পাখিদের বাসা খুব বড় করার ঝামেলা থাকে না। কোনো রকমে নিজেদের শরীরটুকু রাখার মতো জায়গা তাদের বাসা। সেই ছোট্ট নীড়েই তাদের সুখের সংসার। মৃত্যু ছাড়া সে সুখ কেউ কেড়ে নিতে পারে না। খাদ্য সঞ্চয় করে না বলে তাদের বাসায় অন্য পাখি খাদ্য চুরি করতে আসে না। সামাজিক অপরাধ নেই তাদের। তাই একে অন্যের সাথে তাদের যথেষ্ট মিল। জোট বেঁধে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ায়, গাছে গাছে ঘুরে বেড়ায়। আর আমরা মানুষ দেখো, ক্রমাগত শুধু বিভক্ত হই। খাদ্য সঞ্চয় করে না বলে পাখিরা একে অন্যের উপর নির্ভরশীল নয়। উড়তে শেখার পরপরই তারা নিজেদের খাদ্য নিজেরাই জোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
পরিশ্রমী হওয়ার কারণে খাদ্যের জন্য চাকরিবাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য করার দরকার হয় না। যেহেতু চাকরি বা ব্যাবসা করতে হয় না, তাই তাদের লেখাপড়া করারও দরকার হয় না। ফলে অফিস-আদালত, স্কুলকলেজ কোনটিই নেই তাদের। সারাদিন তাদের কাজ আর কাজ। কাজ করতে ভালো না লাগলে উড়াউড়ি, খেলা, আর মনের সুখে গান গেয়ে (শিষ দিয়ে) দিন কাটানো, আহা কত শান্তি! আর আমরা মানুষ, মায়ের বুকে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিকে জাগিয়ে তুলি তাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য। ঘুম, খেলাধুলা আর গান গাওয়ার চেয়ে বিদ্যার্জন করা বেশি প্রয়োজনীয় আমাদের কাছে। মানুষের সুখের দিনতো বিসর্জন দিতে হয় সেই ছোট বেলাতেই। (বলে রাখা ভালো, আমাদের অবশ্যই লেখাপড়া করতে হবে, বিদ্যা অর্জন করতে হবে, তবে তার সাথে সাথে কায়িক শ্রমও কিন্তু করতে হবে।)
পাখিরা যেমন আমরা ঠিক তার উলটো। আমরা খাদ্য সংগ্রহ করি আজকের জন্য এবং আগামী অনেক দিনের জন্য (ততদিন আমরা বাঁচবো কি‘না তার ঠিক নেই জেনেও।)। আমরা খাদ্য সংগ্রহ করি নিজের জন্য এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। খাদ্য সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া আমাদের স্বস্তিদায়ক জীবনকে নষ্ট করে দিয়েছে। সকালে আমরা কী খাবো এটা আমাদের রাত্রেই জোগাড় থাকে, সে জন্য আমরা ভোরে ঘুম থেকে ওঠার প্রয়োজন বোধ করি না। অথচ ভোরে ওঠা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কত উপকারী তা আমরা সকলেই জানি। আমরা নিজেদের জন্য অফুরন্ত খাদ্য সংগ্রহ করতে চাই! সেই অফুরন্ত খাদ্য জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের অনেকে অবৈধ আয়ের পথ বেছে নেয়। আবার সেই অবৈধ আয়ে যে পাহাড়সম অর্থ জোগাড় হয়, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেই অর্থ ব্যয় করার জন্য অবৈধ পথ বেছে নেয়।
অর্থাৎ খাদ্য সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম অপরাধ স্পৃহা জন্ম দেয়। এই প্রক্রিয়ায় এক প্রজন্ম খাদ্য সংগ্রহ করতে যতটা পরিশ্রম করে, অন্য প্রজন্ম ঠিক ততটাই পরিশ্রম বিমুখ। ফলশ্রুতিতে এক প্রজন্ম অবৈধ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অসুস্থ’, অন্য প্রজন্ম কাজ না করতে করতে অসুস্থ’। আবার সঞ্চিত খাদ্য সংগ্রহের জন্য আমাদের মজবুত বাড়ি বা ব্যাংকের দরকার হয়, বাড়ির জন্য জায়গা-জমি কিনতে হয়। আর এসব কিনতে যে অর্থ দরকার, সেই অর্থ জোগাড় করতে আমাদের চাকরি-ব্যাবসা করতে হয়। চাকরি বা ব্যাবসা করার যোগ্যতা অর্জন করতে আবার লেখাপড়া করতে হয়। এসব করতে করতে আমাদের জীবনের সুখ, শান্তি, আনন্দ বিসর্জন দিতে হয়।
আবার দেখো, যারা লেখাপড়া করে না বা পরিশ্রম করে না, তাদের অনেকে খাদ্য সংগ্রহের জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানারকম খারাপ কাজ করে। শুধু যে অশিক্ষিত লোকেরাই টাকা আয়ের জন্য অবৈধ পথ বেছে নেয় তা নয়, কম পরিশ্রমে অধিক লাভের আশায় শিক্ষিত ব্যক্তিরাও নানান খারাপ কাজে যুক্ত হয়, সুদ-ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে। এসবের ফলে সমাজে অপরাধ, বিশৃঙ্খলা বাড়তেই থাকে। এসব অপরাধ-বিশৃঙ্খলা দূর করতে আইন-আদালত, থানা-পুলিশ দরকার হয়। (একবার ভাবোতো, আমাদের পৃথিবীতে যদি কোনো আইন-আদালত, জেল, থানা, পুলিশ না থাকতো তাহলে কত ভালো হতো)
আমাদের লোভ তথা অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া পুরো বিশ্বের মানবজাতিকে অনেকগুলো সিস্টেমের মধ্যে যুক্ত করেছে। যে সকল সিস্টেম মানবজাতিকে অসুস্থ’, অস্থির আর অসুখী করে তুলেছে। কাজেই এ কথা প্রতীয়মান হয় যে ‘পরিশ্রমই জীবনে সুখ আনে’, ‘জীবনে সঞ্চয়ী হওয়ার চেয়ে পরিশ্রমী হওয়াটা বেশি জরুরি।’। পরিশ্রমী মানুষ সৎ হয়ে থাকে। যে পরিশ্রম করতে জানে তার খাদ্যের বা জীবন ধারণের অন্যান্য উপকরণের অভাব হয় না। সঞ্চয়টা এমনিতেই হয়ে যায়। তার হারানোর কোনো ভয় থাকে না। পরিশ্রমী মানুষের অসুখ-বিসুখ কম হয়। শরীর সুস্থ থাকলে মনও সুস্থ থাকে।
তোমরা তো জানো পৃথিবীতে কত ধরনের পাখি আছে তার ইয়ত্তা নেই! অথচ দেখো, তাদের মধ্যে ছোট-বড়, ভালো-মন্দ, উঁচু-নিচু, সাদা-কালোর দ্বন্দ্ব নেই। তাদের সম্পদের বড়াই নেই, ক্ষমতার লড়াই নেই, সৌন্দর্যের অহংকার নেই। ধর্ম, দেশ, জাতি, গোষ্ঠী বা ভাষার দ্বন্দ্ব নেই। ছোট বাসা, কম খাদ্য নিয়ে অল্পতে সন্তুষ্ট থাকাটা পাখিদের আরেকটি বড়ো গুণ। মানুষের ফেলা উচ্ছিষ্ট খেয়ে, ময়লা আবর্জনা খেয়ে, ফসলের ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে পাখিরা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে। ফুলের পরাগায়নে, বনাঞ্চল সৃষ্টিতে পাখিদের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। আর আমরা মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব হয়েও প্রতিনিয়ত পরিবেশ ধ্বংস করছি, পৃথিবী ধ্বংস করছি। রেহাই দিচ্ছি না পাখিদেরকেও ধরে ধরে তাদের খাঁচায় বন্দি রাখি, যা মোটেও ঠিক নয়।
প্রিয় বন্ধুরা, ইচ্ছে করলেই আমরা পাখি হতে পারবো না, পাখিদের মতো উড়তে পারবো না, কিন্তু আমাদের চারপাশে থাকা হাজারো পাখিদের কাছ থেকে আমরা এই গুণাগুণগুলো শিখতে পারি।
বন্ধুরা.. আর পাখিরা যেহেতু আমাদের পরিবেশের জন্য উপকারী, তাই তোমরা কখনো পাখি ধরবে না। ওদের বাসা, ডিম ভাঙবে না। সম্ভব হলে তোমাদের বাসার বারান্দা বা ছাদে ওদের জন্য কিছু খাবার ও পানি রেখে দেবে। কখনো যদি কোনো অসুস্থ পাখি পাও, তাহলে তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করবে। জানো তো আমাদের দেশে পশু-পাখির জন্যও কিন্তু হাসপাতাল রয়েছে, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রয়েছে। ফার্মেসিতেও পশু পাখির জন্য নানারকম ওষুধ পাওয়া যায়। বাসায় যে পাখি পালো তাদের যত্নের কোনো অবহেলা করবে না। ঠিক মতো তাদের খাবার পানি দেবে। কোথাও বেড়াতে গেলে বেশি করে খাবার পানি দিয়ে যাবে অথবা আশেপাশের কারো বাসায় পাখির খাঁচাটি রেখে যাবে।
মন দিয়ে শোনো বন্ধুরা, তোমরা পাখিদের মতো ভোরে ঘুম থেকে ওঠো। পরিশ্রমী হও। অল্পতে তুষ্ট থাকতে চেষ্টা করো। প্রকৃতিকে ভালোবাসো, দু-চোখ ভরে প্রকৃতির রূপ-সুধা অবলোকন করো। জীবন ছোটÑ একে উপভোগ করো। দেখবে জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে। তোমাদের সবার জীবনের প্রতিটি দিন হোক পরিশ্রমের, আনন্দের ও উপভোগের-এই প্রত্যাশা রইল।
----------
রচনা : ১১ অক্টোবর ২০১৯
সম্পাদনা : ০৫ জুলাই ২০২১






0 মন্তব্যসমূহ