Ticker

6/recent/ticker-posts

অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হিরন্ময় তারকা অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ : ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ :

‘জন্মিলে মরিতে হইবে’ চিরন্তন এই কথাটিকে সত্য করে পৃথিবীর সব মানুষকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হয়। তবে কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মৃত্যু শুধু দেহের অন্তর্ধান। কর্মগুণে তারা মানুষের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। মৃত্যু মানুষকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু কারো মহৎ কর্ম ও সৃষ্টিশীলতা তাঁকে মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখে।  রত্নগর্ভা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতী ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক একেএম হারুনুর রশীদ। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। তিনি একাধারে একজন কবি, গীতিকার, সুরকার, নাট্যনির্মাতা, নাট্য অভিনেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর সেনানী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে রয়েছে তাঁর বিরাট অবদান। তাঁর লেখা অসংখ্য কবিতা, গান ও নাটক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অসংখ্য কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যাভিনেতা অধ্যাপক হারুনুর রশীদ-এঁর হাতে গড়া। 

জন্ম, শিক্ষা ও কর্মজীবন :

অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদের পিতার নাম মৌলভি আবদুল আজিজ এবং মাতা রেজিয়া বেগম। নানা বাড়ি কুমিল্লা জেলার পালপাড়া, সাহেববাড়িতে তাঁর জন্ম। একাডেমিক সার্টিফিকেট অনুযায়ী তাঁর জন্মতারিখ ১ জুন, ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ। তবে তাঁর সহধর্মিণী বেগম দিলারা হারুনের ভাষ্য অনুযায়ী প্রকৃত জন্মতারিখ ১ জুন, ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ। তাঁর বাবার বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার খাড়েড়া গ্রামে। অধ্যাপক হারুনুর রশিদের বাবা পূর্ব বাংলার রেলওয়ে ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তার দাদা হাজী আব্দুল করিম সরকার, যিনি অল্প বয়সে হজ করার জন্য এলাকায় বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর নানা আব্দুল লতিফ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে একটানা বাইশ বছর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নানার ভাই ইস্কান্দার আলী ছিলেন একজন ডেপুটি কমিশনার।

অধ্যাপক হারুনুর রশীদছোটবেলায় থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি.এ. (অনার্স) ও এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করে তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৬ সালে অধ্যাপনা পেশায় যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করার আগেই তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে একজন গুণী শিক্ষক হিসেবে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য। সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। ‘শ্রীকান্ত’, ‘রাজলক্ষ্মী’ প্রভৃতি উপন্যাস পড়ানোয় তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল যা, এখনো তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মুখে মুখে ফেরে।

সরকারি কলেজে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০০০ সালের ১ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালের ১ মার্চ সদর উপজেলার সুলতানপুরস্থ লায়ন ফিরোজুর রহমান ওলিও রেসিডেন্সিয়াল একাডেমিতে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। এবং আমৃত্যু এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর পাঠদান, ব্যক্তিত্ব, সাহিত্যবোধ ও জীবনদর্শন শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করত। শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। 

অধ্যাপক হারুনুর রশীদ ১৯৬৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন দিলারা বেগমের সাথে। যিনি ছিলেন তুখোড় রাজনৈতিক কর্মী, একজন কণ্ঠশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী। পরবর্তীতে তিনি সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। এই দম্পতির ঘরে ১ ছেলে ২ কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। এবং তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। 

সাহিত্যচর্চায় বহুমাত্রিক প্রতিভা :

অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ ছিলেন একাধারে কবি, ছড়াকার, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তাঁর রচনায় যেমন ছিল কাব্যিক অনুভূতি ও সৌন্দর্যবোধ, তেমনি ছিল দেশ, মানুষ, সমাজ ও জীবনের প্রতি গভীর অনুরাগ। 

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছেÑ ‘তিয়াসা’ (গীতি-নৃত্য-নাট্য), ‘সাগরে ঠিকানা শিশিরে শয্যা’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘আমাকে ক্ষমা করো’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘পালা বদলের পালা’ (কাব্য নাটক), ‘আমার ইসলামী ছড়া’ (ছড়াগ্রন্থ) এবং ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ (প্রবন্ধ)। 

এ ছাড়াও তাঁর প্রকাশিতব্য গ্রন্থের তালিকায় ছিল ‘কৃষ্ণরমণী ও স্বদেশ’ (সনেট), ‘তবুও আকাশ নীল’, ‘সুবর্ণ সংকেত’ (নাটক), ‘আউটার সিগন্যাল’ এবং ‘আবার স্লোগান আবার যুদ্ধ’ (নাটক), ‘আমার লেখা গানের কথা’ (গীতিকবিতা) ইত্যাদি। তাঁর সাহিত্যকর্মের এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো একটি সাহিত্যধারায় আবদ্ধ ছিলেন না; বরং সৃজনশীলতার নানা মাধ্যমে নিজের চিন্তা ও অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এখানে একথা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, তাঁর অনেক রচনা সংরক্ষণের অভাবে এখন আর পাওয়া যায় না।

সংগীত ও নাট্যাঙ্গনে অবদান :

সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীতেও ছিল তাঁর অসাধারণ দক্ষতা। কবিতা, গান, সুর, অভিনয় ও নাট্যনির্মাণÑ সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর। ১৯৬২ সাল থেকে তিনি চট্টগ্রাম ও ঢাকা বেতারের নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৬৫ সাল থেকে আমৃত্যু ছিলেন বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বেতারে অভিনয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর প্রতিভার বিস্তৃতি কেবল বেতারে সীমাবদ্ধ ছিল না। মঞ্চ নাটকেও তাঁর অবদান ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক ও অভিনেতা। নিজের লেখা তিনটি নাটক নিজেরই নির্দেশনায় সফলভাবে মঞ্চায়ন করেন তিনি। 

বাংলাদেশ টেলিভিশনের কণ্ঠশিল্পী ও উপস্থাপক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। ডিএসপির কাহিনিকার ও ডিএসপি নির্মিত ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র ‘আমার দেশ’ এ অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৮০ সালে কবি, গীতিকার, নাট্যকার, অভিনেতা ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত জাতীয় লোকসংগীত সম্মেলনেও অংশগ্রহণ করেন তিনি।

সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অবদান :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অধ্যাপক হারুনুর রশীদের বিচরণ ছিল প্রায় সর্বত্র। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংস্কৃতিক সংগঠক। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘সুর সম্রাট দি আলাউদ্দীন সংগীতাঙ্গন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। 

অধ্যাপক হারুনুর রশীদ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাট্যসংস্থার (ব্রানাস) অন্যতম নাট্যনির্দেশক হিসেবেও কাজ করেছেন। উল্লেখ্য তাঁর সময়ে ‘ব্রানাস’ ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাট্যাঙ্গনে এক  বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছিল। মাসব্যাপী নাট্যউৎসব আয়োজনসহ তিনশোরও অধিক মঞ্চ শো করেছিল ব্রানাস। যা এই এলাকায় একটি বিরল রেকর্ড ও মাইল ফলক বটে।

এ ছাড়া শিল্পসাহিত্য চক্র, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহ-সভাপতি এবং সূর্যমুখী কিন্ডারগার্টেনের উপদেষ্টা হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। ‘তিতাস একাডেমি’র নাট্য ও নৃত্য বিভাগের পরিচালক ছিলেন। কচিকাচারমেলার জেলা সংগঠক, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা-সংগঠক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।

তাঁর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী ও নাট্যকর্মী তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুপ্রেরণায় নিজেদের সৃজনশীলতার পথ খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক কর্মীদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। এভাবেই তিনি নিজের প্রতিভাকে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তৈরি করে গেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক :

অধ্যাপক হারুনুর রশীদের জীবনের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি কেবল একজন সংস্কৃতিকর্মী বা শিক্ষক হিসেবেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ষাটের দশক থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বক্তৃতা প্রদান, কবিতা আবৃত্তি ও গান গেয়ে তিনি ও তাঁর সাথীরা জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতেন। 

মুক্তযুদ্ধের পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টর (২ ও ৩ নং সেক্টরে) তিনি পলিটিক্যাল মোটিভেটরের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। হাঁপানিয়া ক্যাম্পেও তিনি ছিলেন রাজনৈতিক প্রবক্তা। এছাড়াও তিনি কসবা-আখাউড়ার বিভিন্ন রণাঙ্গনে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আগরতলার ‘আকাশবাণী’ রেডিও স্টেশন থেকে বাংলাদেশের অতিথিশিল্পী হিসেবে উদ্দীপনামূলক সংগীত পরিবেশন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ২নং সেক্টরে নিয়ে গঠিত ‘বাংলাদেশ শিল্পী সংস্থার’ জন্য গান রচনা ও সুরারোপ করাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে দলবলে গান করেছেন তিনি। দিলারা বেগম, ছবিপাল, ফিরোজ আহমেদ, সুমিত্রা ভট্টাচার্য প্রমুখ গুণী শিল্পরা ছিলেন এই দলে।

১৯৭১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একমাত্র অস্থায়ী বেতার কেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘাটুরায় ১নং গ্যাস ফিল্ডে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক শামসুদ্দিন আহমেদের কারিগরি নির্দেশনায় এই বেতার কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়েছিল। এটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক একেএম হারুনুর রশীদ। যদিও বেতার কেন্দ্রটির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র তিন দিন। কেননা বেতার কেন্দ্রটি চালু হওয়ার তিনদিন পর পাকিস্তান বাহিনীর বিমান হামলায় এটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। 

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর এই সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকার জন্য তাঁকে একাত্তরের শব্দসৈনিক হিসেবে অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। তাঁর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ প্রবন্ধটি মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ ও তাঁর পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা কবিতা ও গান মানুষের মাঝে দেশপ্রেমের চেতনা জুগিয়েছে। অস্ত্রের পাশাপাশি কবিতা শব্দ, গানের সুর ও সাংস্কৃতিক চেতনা যে মুক্তির সংগ্রামে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে, তা তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা :

সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নানা সময় অনেক পুরস্কার ও সম্মানায় ভূষিত হয়েছেন। তিনি ১৯৭৭ সালে ‘স্বাধীনতা দিবস জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার’ প্রতিযোগিতায় কবি ও গীতিকার হিসেবে দুটি বিভাগেই প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনুষ্ঠিত মাসব্যাপী নাট্য-প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে তিনটি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকর্মীর সম্মান লাভ করেন। ১৯৮০ সালে শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে লাভ করেন ‘ফজল মাহমুদ সাহিত্য পুরস্কার’। 

২০০৫ সালের নভেম্বরে তিনি এছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি স্বর্ণপদক, তিতাস সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, তিতাস সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ সম্মাননা, দেওড়া, অগ্রদূত গুণিজন পুরস্কার, কবি ও গীতিকার হিসেবে স্বাধীনতা দিবস সাহিত্য পুরস্কার লাভ, গীতিকার হিসেবে এফ এম ফাউন্ডেশন কর্তৃক স্বর্ণপদক এবং শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পদক প্রাপ্ত হন তিনি। 

তবে আমি মনে করি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আপামর মানুষের ভালোবাসা অর্জন আর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মাননা হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষদের কাছে একজন ‘বটবৃক্ষ’ হিসেবে খ্যাতি ও শ্রদ্ধা পাওয়া।

মৃত্যু-জানাজা ও দাফন :

অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ ২০০৫ সালের ৮ নভেম্বর রাত সোয়া ৯ টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌলভীপাড়ার নিজ বাসভবন ‘কবিতাঙ্গনে’ তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন ৯ নভেম্বর, জাতীয় বীর আব্দুল কুদ্দুস মাখন পৌর মুক্ত মঞ্চে জানাজা নামাজ শেষে তাঁকে শেরপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তাঁর প্রয়াণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হারায় একজন গুণী শিক্ষক, সৃজনশীল লেখক, সংগীতজ্ঞ, নাট্যব্যক্তিত্ব ও নিবেদিতপ্রাণ সাংস্কৃতিক সংগঠককে। সেমসয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন  ব্যক্তি সংগঠন/প্রতিষ্ঠান থেকে শোক বিবৃতি ও শোকসভার আয়োজন করা হয়। প্রতিবছর আয়োজন করা হয় স্মরণসভা। যার ধারাবাহিকতা আজও বর্তমান রয়েছে।

গুণমুগ্ধ মানুষের স্মৃতিতে অমলিন :

অধ্যাপক হারুনুর রশীদের মৃত্যুর চার বছর পর ২০০৯ সালে ‘অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ স্মৃতি পরিষদ’ সংগঠনের ব্যানারে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদের গুণমুগ্ধ সহকর্মী, ছাত্র এবং সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সহযোদ্ধাদের পরিশ্রমে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও বাংলাদেশের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। তারা তাঁর জীবন ও কর্মের উপর আলোকপাত করেন। স্মৃতিচারণ ছাড়াও অনেক নিবেদিত কবিতাও স্থান পেয়েছে এই স্মারকগ্রন্থে। 

উক্ত স্মারক গ্রন্থের সম্পাদক কবি-গবেষক জয়দুল হোসেন তাঁর সম্পাদকীয়তে বলেন, “পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা নিজেদের কর্মে, প্রজ্ঞায়, কৃতিত্বে ও সিদ্ধিতে ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ ছিলেন এমনি এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ছিলেন না, ছিলেন সকলের। আর সকলের হতে গিয়েই অনেক সময় তিনি কারোরই হতে পারেননি। এমন ঘটনাও ঘটেছে তাঁর জীবনে। তবে হালকা, ছিপছিপে গড়নের শ্যামলকান্তি এই মানুষটির সর্বাঙ্গ ঘিরে ছিল সুর আর সংগীতের মূর্ছনা এবং সাংস্কৃতিক দ্যুতি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অবস্থান ছিল প্রায় সর্বত্র পরিব্যপ্ত। ত্যাগে, তিতীক্ষায়, সহনশীলতা ও অপরিমেয় মহানুভবতায়- তাঁর তুলনা ছিলেন তিনি নিজেই। শিক্ষাঙ্গণ ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এবং সামাজিক পরিমণ্ডলেও তাঁর অবস্থান ছিল প্রায় অনুরূপ। তাঁর চাল-চলন, কথাবার্তা ও ব্যক্তিত্বে একটা দুর্লভ আকর্ষণ ছিল। সহাস্য ও নমনীয়কান্তি তাঁর মুখায়বকে প্রায় সব সময় উজ্জ্বল করে রাখতো। শিক্ষক হিসেবে মহৎ গুণাবলির সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর চরিত্রে।

ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষক। তাঁর চরিত্রে কোমলতা, নমনীয়তা ও বিনয়ের পাশাপাশি দ্রোহ এবং দাহও দুর্লক্ষ্য ছিল না। একই সঙ্গে কোমল ও কঠিন চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি। অন্যায় ও অনিয়মের সাথে তিনি কখনো আপোশ করেননি। স্বভাবের এই আপাত-বৈপরীত্য তাঁর চরিত্রকে করে তুলেছিল আরও পূর্ণায়ত ও সমুজ্জ্বল।”

শেষ কথা:

অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদের জীবন ছিল বহুমাত্রিক কর্মময়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শিক্ষকতা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, মুক্তিযুদ্ধ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড- প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন স্মরণীয় অবদান। তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল উদারতা, সহিষ্ণুতা ও সবার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার মানসিকতা। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজে আলোকিত হয়েছেন এবং অন্যদেরও আলোকিত করার চেষ্টা করেছেন।

মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর কর্মে, তাঁর সৃষ্টিতে এবং মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া স্মৃতিতে। সেই বিচারে অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর সৃষ্টি, সাধনা, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অধ্যাপক এ কে এম হারুনুর রশীদ তেমনই এক হিরন্ময় তারকা, যাঁর আলো কখনো ম্লান হওয়ার নয়। 

তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

৮ নভেম্বর ২০২৫


তথ্যসূত্র : 

*  এ কে এম হারুনুর রশীদ স্মারকগ্রন্থ। সম্পাদনা: জয়দুল হোসেন (প্রকাশ কাল : জুন ২০০৯) 

*  কবি ও জয়দুল হোসেন-এর সাথে কথোপকথন এবং বিভিন্ন স্মরণ অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্য

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ