কখনো কোথাও ট্রান্সফরমার পুড়ে যাচ্ছে, কোথাও খুঁটি পড়ে যাচ্ছে, কোথাওবা শর্ট সার্কিট হয়েছে। কোথাও আগুন লেগে গেছে, কোথাও বজ্রপাত, কোথাও ঝড়-বৃষ্টিতে ছিঁড়ে পড়ে গেছে সঞ্চালন লাইন। কখনো গাছের ডালপালা কাটা, কখনো খুঁটি স্থানান্তর। কখনো এলএনজি আমদানিতে জটিলতা, কখনো কয়লা ফুরিয়ে গেছে। একে তো চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন নেই। তার ওপর আবার এত সব সমস্যায় তুমি কোথাও কখনো স্থির হতে পারছো না। আজ আমার বাড়িতে আসো, কাল অন্যের বাড়িতে যাও, পরশু অন্য কারো বাড়িতে। তারপর দিন আবার কারো বাড়িতেই থাকো না।
প্রিয় বিদ্যুৎ, জানতো, ছোটবেলা থেকেই তোমার লুকোচুরি দেখে আসছি। সেই যে বাংলা সিনেমা দেখতে বসেছি, ঘোষক ঘোষণা করল এখন শুরু হচ্ছে বাংলা ছায়াছবি…। তারপরে অভিনয় শিল্পীদের নাম দেখানো শুরু হলো। হঠাৎ তুমি চলে গেলে! তারপর আসার আর খোঁজ নেই। আসলে তো আসলে, একেবারে শেষ সময়ে। যখন নায়ক-নায়িকা এবং তার পরিবারের সবাই মিলেমিশে হাসাহাসি করছে। তারপরে টিভির পর্দা জুড়ে লেখা ‘সমাপ্ত’।
সন্ধ্যার আগে কুপি বাতি, হারিকেন নিয়ে দৌড়াদৌড়ি। ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে তেল-সলতে ভরে রেডি রাখতে হতো। কারণ নিশ্চিত! তুমি সন্ধ্যার পরে চল যাবে এবং গিয়েছোও। আলিফ লায়লা দেখব বলে টিভির সামনে বসেছি। হঠাৎ তুমি চলে গেলে। আসলে যখন ততক্ষণে নাটক শেষ কিংবা সজাগ থাকতে থাকতে আমরা ঘুমের ঘোরে ঢুলে পড়েছি।
তোমার এসব কারিশমা দেখে দেখে বড় হয়েছি আমরা। কিন্তু তখন তুমি আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন ছিল না। ‘শুধু গাছ থেকে আসা অক্সিজেনই ছিল আমাদের বেঁচে থাকার, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার ভরসা। কিন্তু যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে তুমি আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে গেছো। তাই তুমি বিহনে আমরা এখন মৃত প্রায়।
আচ্ছা বিদ্যুৎ ভাই,
এতই
যখন তোমার সমস্যা, তাহলে এক কাজ করলে হয় না। সারাদিন আসো আর না আসো। রাতের বেলা তো
অন্তত আসতে পারো। সারারাত আসতে পারো আর না পারো, অন্তত ভোর রাতে পাঁচ/ছয় ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন
থাকতে পারো। যাতে আমরা শান্তিতে কয়েকঘণ্টা ঘুমাতে পারি।
এই দেখো, তোমার অভাবে দেশের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটায়। নির্ঘুম রাত কাটে কাটিয়ে কাটিয়ে এখন আমাদের অনেকেই মানসিক অবসাদে ভুগছে। তাইতো অল্পতেই মানুষ রেগে যাচ্ছে। ধৈর্য হারাচ্ছে। সামান্য বিষয়েই তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দিচ্ছে। সরকারের সাথে জনতার, নেতার সাথে কর্মীর, কর্মকর্তার সাথে কর্মচারীর, ড্রাইভার এর সাথে যাত্রীর সম্পর্কে খারাপ হচ্ছে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে বাড়ছে অভিমান। রাস্তায় চলতে চলতে দুজন পথিকের মধ্যেও ঝগড়া লেগে যাচ্ছে সামান্য বিষয়ে। সেই ঝগড়া কখনো এক বাড়ি থেকে দুই বাড়ি, দুই বাড়ি থেকে চার, তারপর এক গোষ্ঠী থেকে আরেক গোষ্ঠী, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছড়িয়ে যাচ্ছে। নির্ঘুম চালক সকালবেলা আধো ঘুমে গাড়ি চালাতে চালাতে ঘটিয়ে চলছে মারাত্মক দুর্ঘটনা।
শেনো ভাই,
যখন
তুমি ছিলে না, তখন তোমাকে ছাড়াই চলতে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। এখন তোমাতে অভ্যস্ত হয়ে
গেছি। তুমি না আসলে ঘরের লাইট জ্বলে না, ফ্যান চলে না, টেলিভিশন-কম্পিউটার সব বন্ধ।
কলকারখানার উৎপাদন বন্ধ। ওয়াইফাই বন্ধ, মোবাইলেও থাকে না চার্জ। আর মোবাইল ছাড়া আমরা
তো এক মুহূর্ত থাকতে পারি না। কোথাও কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারি না। মনে হয় বিচ্ছিন্ন
এক দ্বীপে বসবাস করছি।
জানো, তুমি না থাকলে বড়লোকদের তো তেমন চিন্তা নেই। বাসায় এসি আছে, আইপিএস আছে, চার্জার ফ্যান আছে। তোমার শূন্যতা তারা ঠিক ততটা অনুভব করে না, যতটা আমরা করি। তাদের তোমাকে নিয়ে দুঃচিন্তা নেই। অতিরিক্ত বিল নিয়ে টেনশন নেই। আবার যারা গরিব, নিম্নবিত্ত তাদেরেও তোমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। কারণ তাদের বাসায় ফ্রিজ-টিভি-এসি নেই, আইপিএস, কম্পিউটার নেই। আছে এক লাইট আর ফ্যান। সেটা না ঘুরলেও কোনো ক্ষতি নেই। বাঁশ-টিনের ঘরে হাতপাখার বাতাস খেয়ে দিন-রাত পার করে দেয়। আর মনে মনে আগামী মাসে বিদ্যুৎ বিল কম আসবে ভেবে খুশি হয়।
কিন্তু আমরা যারা মধ্যবিত্ত, আমাদের যাদের ঘরে এসি-আইপিএস নেই, তারা গরমটাকে ভালোভাবে ফিল করি। এত লম্বা সময় ধরে তুমি লোডশেডিং দাও, আমাদের যাদের ঘরের চার্জার ফ্যান যেগুলো আছে সেগুলোর চার্জ শেষ ফুরিয়ে যায়। তারপরে হাতপাখা দিয়ে বাতাস কতক্ষণই বা করা যায়? আর করলেই ইট-সিমেন্টের ভাড়া বাসার দেয়াল কি হাত পাখার বাতাসে ঠান্ডা হয়? দক্ষিণা রোদে চলন্ত ফ্যানের নিচেও আমরা ঘেমে উঠি।তুমি কি জানো, যাদের বাসা টপ ফ্লোরে, কিংবা যাদের বাসায় দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের রোদ পড়ে, তাদের রুম ঠাণ্ড হতে রাত একটা দুটো বেজে যায়। আর এই দীর্ঘ সময় মনে হয় একটি হিটার রুমে তারা বসাবস করছে।
জানো বিদ্যুৎ,
আমি মাঝে মাঝে ভীষণ অবাক হই। তোমাকে নিয়ে তেলেসমাতি কাজ কারবার হয়, অথচ তোমাকে ব্যবহারের আমাদের কোনো নীতিমালা নেই। যখন তুমি থাকো, তখন আমরা ঘরের ভিতর অতিরিক্ত লাইট ফ্যান জ্বালিয়ে রাখি। অযথা আলোকসজ্জা করে তোমার অপচয় করি। অথচ যে মুহূর্তে তুমি আমার ঘরে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যবহার হচ্ছো। ঠিক সেই মুহূর্তে অন্য কেনো অঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎটুকু পাচ্ছে না।
আবার অন্যরা যখন অপ্রয়োজনে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, মানে তোমাকে ব্যবহার করছে। তখন এই দিক দিয়ে আমি বঞ্চিত হচ্ছি প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ থেকে। আমাদের কলকারখানা, মার্কেট, রাস্তার দোকানপাট, সব জায়গায় এত বেশি অতিরিক্ত লাইট ব্যবহার করি যে, আমরা ভুলে যাই দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। এবং তা ব্যবহারে আমাদের সচেতন হবে হবে।
দেশের মানুষের হাতে এত এত মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং ইলেকট্রিক যানবাহন তৈরি হওয়াতেও তোমার বিদ্যুতের ওপর চাহিদা ও নির্ভরতা বেড়েছে। ওসব ব্যবাহা্র নিয়েও কোনো নীতিমালা নেই। থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। নেই আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতা আর দেশপ্রেম। এগুলোর অভাবে তোমার সমস্যা, আমরা আরো প্রকট করে তুলছি।
ক্লাইমেট চেঞ্জ তথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে গ্রীষ্ম ঋতু দীর্ঘায়িত হয়েছে। গরমকালে গরম তো পড়ছেই, শীত-শরৎ-হেমন্ত ঋতুতেও ঢুকে গেছে গরমের প্রভাব। অথচ প্রায় সব ঋতুতেই তুমি আমাদের সাথে নিত্য লুকোচুরি খেলা খেলছো। আর আমরাও প্রতিনিয়ত গরম করে ফেলছি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। গাছ কেটে উজাড় করে শহর বানাতে গিয়ে দিন দিন মরুভূমির দিকে ধাবিত হচ্ছি আমরা।
তুমি
চলে গেলেই সরকার বা বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা- কর্মচারিদের গালিগালাজ-তুলোধুনো করে
ফেলি। কিন্তু তুমি থাকতে নিজেরা মিতব্যয়ী হই না। সাশ্রয়ী হই না।
শোন হে প্রিয় বন্ধু, তোমার সমস্যার কথা অনেকে বলতে-লিখতে ভয় পায়। আমিও পাই। সরকার আর সরকারি দলের নেতাদের রোশনালে পড়ার ভয়। এটা সব সরকারের আমলেই হয়। অথচ তুমি আমাদের মৌলিক চাহিদার একটি। আর আমাদের মৌলিক চাহিদা ব্যাহত হলে তা পূরণ করার জন্য আমাদের কথাতো বলতে-লিখতে হবেই। এই বলা-লেখার মানে যে, সরকারের বিরুদ্ধাচরণ নয়, সমস্যা সমাধানের আর্জি- এটিও অনেকে বুঝতে চায় না। তারপরেও কেউ না কেউ তো বলে, লিখে। তাইতো আমি তোমার কাছে চিঠি লিখলাম। তুমি না হয় যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বলে দিও।
পরিশেষে একটা কথাই বলি,
হে
বিদ্যুৎ—
তুমি
চলে যাচ্ছে যেও,
যাবার
আগে হারিকেনকে
খুঁজে
বের করার সময়টুকু দিও।
---
ইতি
তোমার বিরহে কাতর
মনিরুল
ইসলাম শ্রাবণ
০১ সেপ্টেম্বর ২৬
(চিঠি দিবসে বিদ্যুতের কাছে খোলা চিঠি । ফটোকার্ড এ আই নির্মিত)

0 মন্তব্যসমূহ