
প্রত্যেক প্রাণীর একটি হৃদয় আছে এবং সেই হৃদয়ে আছে স্পন্দন। স্পন্দিত হৃদয় সচল রাখে মানুষসহ সকল প্রাণীর দেহকে। যতদিন হৃৎস্পন্দন, ততদিনই প্রাণিদেহের আয়ুষ্কাল। এই স্পন্দন যেদিন থেমে যায়, সেদিনই মৃত্যুবরণ করে মানুষসহ অন্য সব প্রাণী। প্রাণীদের হৃদয় থাকলেও এবং সে হৃদয়ের স্পন্দন থাকলেও বস্তু জগতের হৃদয় নেই, কোনো হৃৎস্পন্দন নেই। কিন্তু বস্তু জগতের হৃদয় না থাকলেও, মানুষের তৈরি নানা যন্ত্রপাতি নিত্য স্পন্দিত হয়। এসব যন্ত্রপাতি যতক্ষণ স্পন্দিত থাকে, ততক্ষণই সচল রাখে মানুষের সহায়ক নানা কাজ, জীবন-জীবিকা। সচল রাখে দেশের অর্থনীতি।

প্রাণিদেহের স্পন্দন থেমে গেলে তার যেমন কোনো মূল্য নেই, তেমনি এই সব যন্ত্রপাতির স্পন্দন থেমে গেলেও তারও কোনো মূল্য থাকে না। মূল্যবান যন্ত্রপাতি তখন পরিত্যক্ত মালামাল হিসেবে বিক্রি করা হয়। অপেক্ষাকৃত ছোট যন্ত্র, মেশিনারিজ জিনিস পরিত্যক্ত মালামাল হিসেবে বিক্রি করা হলেও যেগুলো আকারে বড়, সেগুলো হয়তো প্রদর্শনীর জন্য থেকে যায় ততদিন, যতদিন না সেগুলোও ক্ষয়ে ক্ষয়ে ভাঙারির মালামালে পরিণত হয়।
সম্প্রতি অতি দানবীয় একটি যন্ত্র অর্থাৎ ফ্যাক্টরি দেখার সুযোগ হলো আমার। অবশ্য সুযোগ না বলে সৌভাগ্য বলাই ভালো। সৌভাগ্য এই জন্য যে, আর কিছুদিন পর হয়ত তা অন্যদের দেখার সুযোগ নাও হতে পারে। কেননা উৎপাদন বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে নষ্ট হচ্ছে অতি দানবীয় এই ফ্যাক্টরির নানা মেশিনারিজ।
আজ থেকে প্রায় চার মাস আগে, ছুটির দিনের এক সকালে, কথাসাহিত্যিক আমির হোসেন স্যারকে নিয়ে উঠলাম উপকূল ট্রেনে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে হাজির হলাম আশুগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করার পর সম্পাদক-প্রকাশক কবি হেলাল উদ্দিন হৃদয় ভাই, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম ভাই আমাদের সাথে যোগ দিলেন। স্টেশনে দেখা হয়ে গেল আশুগঞ্জের কবি ও শিক্ষক, শফিক খন্দকার স্যারের সাথে।
শেষোক্ত দুইজন নিজ নিজ কাজে চলে গেলেও আমরা বাকী তিনজনের গন্তব্য দেশের অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরি ‘আশুগঞ্জ সার কারখানা’। যেটি ‘জিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি’ বা ‘জিয়া সার কারখানা’ নামেও সমধিক পরিচিত। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই কারখানা একসময় এ দেশের কৃষি বিপ্লবে যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি ভূমিকায় রেখেছে দেশের অর্থনীতি সচল রাখায় এবং অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে।
কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে বেশ কয়েক বছর যাবৎ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বন্দরনগরী খ্যাত আশুগঞ্জের মেঘনা নদীর তীরে বিশাল জায়গা জুড়ে নির্মিত, এই বিশাল স্থাপনা এখন ক্রমেই হয়ে উঠছে ভূতের বাড়ি। একসময় যে মেশিনগুলো প্রচণ্ড শব্দ তৈরি করে সচল থাকতো নানা ধরনের কলকবজা, সেখানে আজ শুনশান নিরবতা। একসময়ের স্পন্দিত মেশিনগুলো ইট-পাথরে দালানের মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে, যেন বিশাল এক স্টিল লোহা লক্করের জঞ্জাল। কেন থেমে গেল এই মেশিনের স্পন্দন ? সেসব তথ্য অনুসন্ধান করবো আমরা।

সেদিনের ভ্রমণ ছিল পূর্বপরিকল্পিত। এই কারখানাটি দেখতে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এখানকার অন্যতম একজন কর্মকর্তা জনাব পনিরুল আলম ভাই। যিনি দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে চাকরি জীবন শেষ করে সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন। অবসর নেওয়ার প্রাক্কালে প্রতিষ্ঠানটি একেবারে ছেড়ে যাওয়ার পূর্বে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, আমরা যেন এই প্রতিষ্ঠানটি একবার ঘুরে দেখি। একই ইচ্ছা আমাদেরও, বিশেষ করে আমারও প্রবল ছিল। কেননা ছোটবেলা থেকেই আমি এই প্রতিষ্ঠানের নাম শুনে এসেছি, কিন্তু কখনো এর ভেতর ঢোকা হয়নি। এতদিন আমি জানতাম না যে, আমাদের একজন প্রিয়জন এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। ফলে পনিরুল আলম ভাইয়ের এই আমন্ত্রণ আমার জন্য ছিল একটি আনন্দদায়ক ও অভিজ্ঞতাপূর্ণ স্মৃতি।

তার আগে আরেকটি কথা বলি, পনিরুল আলম ভাই হচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম বোদ্ধাজন, যিনি দীর্ঘদিন এখানকার বিভিন্ন সংগঠন, প্রকাশনা ও অনুষ্ঠান আয়োজনে নিজের সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে না থাকায়, আমার সাথে পরিচয় বা যোগাযোগ ছিল না। যে যোগাযোগটা ছিল আমির হোসেন স্যার এবং হৃদয় ভাইয়ের সাথে। আমার সাথে পরিচয় মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। সেই যোগাযোগ এবং পরিচয়ের সূত্রেই আমাদের এই টিমওয়ার্ক।
শ্রদ্ধেয় পনিরুল আলম ভাইয়ের আমন্ত্রণে গত ২৪ এপ্রিল ২০২৬ আমরা পৌঁছালাম দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। কারখানার গেট থেকেই তিনি আমাদেরকে স্বাগত জানালেন। ভেতরের অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য এক মহাবিস্ময়! একগাদা নতুন অভিজ্ঞতা আর এক বুক হতাশা। সেসব কথাই বলবো আজ।
আজকের এই কথাগুলো বেশ লম্বা হতে চলেছে, ফলে কয়েক পর্বে বিভক্ত থাকবে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার সার কারখানা ভ্রমণ বৃত্তান্ত। মোট চারটি পর্বে থাকবে এই ভ্রমণ বৃত্তান্ত। প্রথম পর্ব : সূচনা ও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার-এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। দ্বিতীয় পর্ব : দেশের কৃষি-অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই কারখারার ভূমিকা। তৃতীয় পর্ব : কারখানার কার্যপ্রণালি ও ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা। চতুর্থ পর্ব : উপসংহার ও কারখানা বন্ধের কারণ ও পুনরায় সচল করতে করণীয়। প্রতিটি পর্বে একাধিক অনুচ্ছেদ থাকবে।
—--
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
১৬ জুন ২০২৬, ভোর ৪:৪০
0 মন্তব্যসমূহ