আমার ছোটোবেলার আরেকটি স্কুলের নাম ‘ফুলছড়ি ১ নং মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এই স্কুল ছিল আমার দ্বিতীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাবার পোস্টিং ছিল তখন বাংলাদেশ রেলওয়ের গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি থানার অন্তর্গত ফুলছড়ি ঘাটে। সেই সূত্রে ১৯৯৪ থেকে ৯৬ (তৃতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি) পর্যন্ত তিন বছর এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি। বিদ্যালয়ের পশ্চিমপাশে একটি অ্যালুমিনিয়াম শেডের লম্বা ঘর ছিল। এই অ্যালুমিনিয়াম শেডের শেষের একটি কক্ষের আগের কক্ষটি ছিল তৃতীয় শ্রেণির। দক্ষিণ পাশে ছিল একটি একতলা বিল্ডিং। অ্যালুমিনিয়াম শেডের সামনে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর রাস্তা চলে গেছে ফুলছড়ি বাজারের দিকে। রাস্তার প্রান্ত থেকে কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। তার সামনে ছোটোখাটো একটা মাঠ। এই মাঠে খেলেছি কত খেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা, বৌছি, পাতা লুকানো আর দৌড়াদৌড়ি খেলা।
এই মাঠের উত্তর দিকে ফুলছড়ির থানা। আমার সহপাঠী দুই বন্ধুর বাবা ছিল পুলিশ। তারা আবার আমাদের প্রতিবেশী। স্কুল মাঠের উত্তরপূর্ব কোণে একটি শেডে পুলিশ আঙ্কেলদের বাইসাইকেল থাকতো। বন্ধুদের সাথে তাদের বাবাদের সাইকেল নিয়ে এই মাঠেই সাইকেল চালানো শিখেছিলাম। ছোট ছিলাম বলে সিটে বসে প্যাডেলের নাগাল পেতাম না। তাই মাঝের অংশে বসে বিশেষভাবে আমাদের সাইকেল চালাতে হতো। এই সাইকেল রাখার ছাউনির পরেই ছিল দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বসবাসের মেসের মতো জায়গা। মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ছিল থানার ওসি সাহেবের বাড়ি। আমাদের সময় ওসি সাহেবের স্ত্রী সীমা লাহিরি ম্যাডামও ছিলেন আমাদের শ্রেণি শিক্ষক। তাদের এক কন্যাও ছিল আমাদের সহপাঠী। স্কুলটির দুইটি ঘরের এর পেছনে কদম, নারিকেলসহ নানা রকম গাছ ছিল। কত বছর আগের স্মৃতি। প্রায় ত্রিশ বছর। এখনো ঝকঝকে। স্মৃতির রঙিন ফ্রেমে বাঁধা এক ছবি। হয়ত কখনো পুরোনো হবে না।
এই স্কুল, স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, মাঠ, গাছগুলো মিশে আছে আমার শৈশবের স্মৃতির ক্যানভাস জুড়ে। ভীষণভাবে অনুভব করি এগুলোকে। অনুভব করি সহপাঠী আর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের। এখনো বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, র্যালিগুলোর স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই। ইলিয়াছ সার, আলম স্যার, জব্বার স্যার, সীমা লাহিড়ী ম্যাডামের কথা মনে পড়ে। প্রধান শিক্ষক স্যারের নাম, চেহারা মনে নেই। তবে তিনি কিছুটা বয়স্ক আর গুরুগম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন বলে মনে পড়ে। দক্ষিণ পাশের বিল্ডিং ঘরের একেবারে পূর্ব পাশে ছিল অফিস কক্ষ। প্রধান শিক্ষক স্যার সেখানে বসতেন।
মনে পড়ে, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে এখানে অনেকগুলো শিশুতোষ বই নিয়ে আসা হয়। বইগুলো স্টিলের আলমারিতে তালাবদ্ধ করে রাখা হতো। প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরে ছুটির পরে রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে আমরা সেসব বই বাড়িতে এনে পড়ার সুযোগ পেতাম। ছোট ছোট গল্পের রঙিন ছবিযুক্ত মজার মজার সব বই। বাড়িতে নিয়ে এক বসাতেই পড়া শেষ। তারপর পালা করে একজনের বই অন্যজনের আনা বই পড়তাম। বাড়ির পাশে পাশে যারা আছে তাদের কাছ থেকে যেমন বই পল্টাতাম, তেমনি স্কুলে গিয়ে দূরের বন্ধুদের কাছ থেকেও বই বদলিয়ে আনতাম। পরের সপ্তাহ বই ফেরত দেওয়ার সময় কোন বই আমি এনেছিলাম, আর সেই বই এখন কার কাছে তার খোঁজ মেলে না। রেজিস্টারের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক যখন আমাদের বই পড়ার এই আগ্রহ দেখলেন, তখন তিনিও আমাদের বকাঝকা না করে কষ্ট করে বইয়ের নাম মেলাতেন অথবা শুধু সংখ্যা মেলাতেন। আমার আজকের সাহিত্যকর্মে সেই বইগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। সোনার হরিণ, পশুদের বউ, দৈত্য-দানব, পাতালপুরীর রাজকন্যা, পরীর গল্প, গোপাল ভাঁড়ের গল্পসহ নানা রূপকথার গল্প, জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা আর বিভিন্ন মনীষীদের জীবনী সাহিত্য পাঠের সূচনা হয়েছিল সেই সমস্ত বইয়ের মাধ্যমে। সেই মুগ্ধ দুপুর, দুরন্ত বিকেল কিংবা ক্লান্ত সন্ধ্যা- এসব কিছু এখনো তরতাজা স্মৃতির মতো চোখের সামনে ভাসে। আমার ছেলেবেলার সেই গ্রাম : কী চমৎকার নাম ‘ফুলছড়ি’। কত দূরের পথ! যাব যাব করে আর যাওয়া হয় না।
বন্ধুদের মধ্যে লিটন, বুলেট, সাজু, লিটন-২, বিপ্লব, বাঁধন আমরা ছিলাম এক ব্যাচ। আমরা প্রথম বেঞ্চে বসতাম। মেয়েদের মধ্যে, কাজলী, সোমা, শাওন, ঊর্মি এদের নাম মনে আছে। পড়ালেখা, দুষ্টুমি, হইহুল্লোড় করে শ্রেণিকক্ষ আর স্কুল মাতিয়ে রাখতাম। স্কুলের দক্ষিণ পাশে দুই একটি দোকান ছিল; যেখান থেকে আমরা খাতা-কলম কিনতাম। ইকোনো, রাইটার কলম কিনতাম। এক কলমে তিন কালারের কালি পাওয়া যেত- এই কলমগুলো খুব উৎসাহ নিয়ে কিনতাম। এছাড়া নানা রঙের সাইনপেন দিয়ে ছবি আঁকতাম। স্কুলের সামনে ঝাল মুড়ি, বাদাম আর চালতার আচার বিক্রি করা হতো। মনে পড়ে সেসবও। কেনো মনে পড়ে জানি না। মানুষের জীবনে ভালো-মন্দ কত কিছু ঘটে যায়। কত কিছু মনে থাকে, আর কত কিছু ভুলে যাই। কিন্তু শৈশবের স্মৃতিগুলো আমরা কেনো ভুলি না; জানি না। স্কুলের আশেপাশের বাড়িতে পরিচিত অথবা বন্ধুদের বাড়ি ছিল। তাদের নাম মনে নেই। আমাদের স্কুল ও বাসাবাড়ি (হিমু ভাই-শাওন-শর্মীদের বাড়ি) ও আশেপাশের বেশ কিছু বাড়িতে হিন্দু বসতি ছিল। ‘হিন্দুরা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, তারা আমাদের পর’— এমন মনোভাব তখন আমাদের কেউ শেখায়নি। আমার একসাথে লেখাপড়া করে, খেলাধুলা করে বড় হয়েছি। আমাদের ঈদ আর ওদের পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করে বড় হয়েছি।
সম্প্রতি আমাদের সহপাঠী কাজলী রায় আমার অনুরোধে সেই স্কুলের কিছু ছবিগুলো তুলে পাঠায়। যা দেখে আমি যেন আমার ছেলেবেলায় ফিরে যাই। স্মৃতির ছবির সাথে বাস্তবের ছবির মিল খুঁজি। না, সব ঠিক আছে। কোথাও জং ধরেনি, শেওলা পড়েনি স্মৃতির ফ্রেমে। কাজলী বর্তমানে এই স্কুলের সহকারী শিক্ষক। ক্লাসে বরাবরই সে ভালো ছাত্রী ছিল। সব সময় তার রোল ক্রমিক ১ থাকত। এই নিয়ে আমরা ছেলেরা ওকে হিংসা করতাম। কিন্তু কাজলীর রোল প্লেস ছিনিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আমাদের কারো ছিল না। শহিদুল আসার পর আমরা একটু ভরসা পেলাম। কারণ সেও ভালো ছাত্র ছিল। ক্লাস ফোর বা ফাইভে শহিদুলের রোল দু-একবার ১ হয়েছিল। শহিদুল ভালো গান গাইতে পারতো ‘তোমার ভুলে গেছো মল্লিকাদের নাম’ দরদমাখা সুরে এই গানটি সে প্রায়ই গাইত। শহিদুলের নানা বাড়ি ছিল ফুলছড়ি। তাঁর নানা ছিলেন ফুলছড়ি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের হেড মাওলানা। তিনি আমাদের শ্রেণি শিক্ষক ছিলেন। অত্যন্ত কড়া মেজাজের হওয়ায় আমরা তাকে ভয় পেতাম। (হাইস্কুল জীবন পর্বে তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত কথা আসবে।)
আমার ছেলেবেলায় আরেকজন বন্ধু ছিল, আমি ওর নাম ভুলে গেছি। আমরা যে বছর (১৯৯৮ সাল) আমরা ফুলছড়ি ছেড়ে আসি তার আগে সে আমাকে একটি বন্ধুত্বের উপহার সরূপ একটি চিঠি দিয়ে ছিল। চিঠিতে একটি গানের কয়েকটি কলি লেখা ছিল। সম্ভবত ‘ভুল বুঝে চলে যাও, যতখুশি ব্যথা দাও’ এই গানটি। অনেকদিন এই চিঠিটি আমার সংরক্ষণে ছিল। পরে হারিয়ে গেছে। সে বন্ধু নিয়ে অনেকবার ফুলছড়ি বাজারে গিয়েছি হাটবারে সেখানে লোকশিল্পীদের গানের আসর বসত। আমরা সেসব লোকগান শুনতাম। পাটি বিছিয়ে কেউ কেউ ছোট ছোট চটি বই বিক্রি করত। ধাঁধার বই, কৌতুকের বই, বাংলা ছায়াছবির গানের বই, নায়ক নায়িকাদের ছবির পোস্টার, নামাজ শিক্ষা, দোয়ার বই, কি করিলে কি হয় ইত্যাদি বই কিনতাম। জাদুর আসর বসত এসব হাটে। একদিন এক জাদুকর তার জাদু দেখানোর আগে বলেছিল, জাদু দেখানোর সময় সবাই নিজের এক হাত দিয়ে আরেক হাত শক্ত করে ধরে রাখতে হবে। আর যারা বসে আসে তারা দুই হাত রাখতে হবে হাঁটুর উপর। তারপর সেই জাদুকর একটা মানুষকে একটা বাক্সে ভরে সেই বাক্সে অনেকগুলো ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিলো। আমরা পিচ্ছিরা ছিলাম নিচে বসা। এসব দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে হাঁটু ধরে নুয়ে নুয়ে ভিড় ঠেলে বেড়িয়ে এলাম। বলতে গেলে আমরা সেখান থেকে একরকম পালিয়ে এলাম। কারণ জাদুকরের নিষধ ছিল কেউ নড়তে পারবে না। কিন্তু সেখানে বসে জ্যান্ত মানুষের শরীরে ধারালো ছুরি ঢোকানো দেখা সাহস আমাদের ছিল না। সেই রাতে ঘুমানোর সময় আমার সে কী ভয়? (চলবে...)
ছেলেবেলার সাতকাহন (পর্ব-২)
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
০৩ ডিসেম্বর ২৩
(এই লেখাটির পরিমার্জিত রূপ নব ভাবনা স্কুল বেলায় সংখ্যা ২০২৫ এ প্রকাশিত হয়)
প্রথম পর্ব পড়ার লিংক
https://www.facebook.com/share/p/1DMQcKbfzw




0 মন্তব্যসমূহ