তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুতুল নাচকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে
বাংলাদেশের আধুনিক পাপেটের জনক, বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তফা মনোয়ার মৃত্যুবরণ করলেন আজ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি করেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ, অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার, মানুষের সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
৯০ দশকের শিশু হিসেবে আমরা বিটিভিতে দেখতাম তাঁর ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠান। পারুল ও বাউলের দুষ্টুমি, বোকামি আর মজার মজার কথামালায় আমরা আনিন্দত হতাম। এ অনুষ্ঠানে নানা ধরনের পাপেট নিয়ে মজার ও শিক্ষণীয় পাপেট্রি পরিদর্শন করতেন তিনি। এছাড়াও অনুষ্ঠানে ছবি আঁকা, চারু ও কারুকলার চমৎকার সব কৌশল শেখাতেন তিনি। মজার ছলে আমাদের বয়সি শিশুদের কত কিছু শিখিয়েছেন তিনি।
৯০ দশকতো বটেই তার পূর্বে এবং পরবর্তীতে সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের আরেকটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের রূপকার তিনি। কে না জানে? ‘নতুন কুঁড়ি’ ছিল এ দেশের শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি এবং আনন্দময় শৈশব উপহার দেওয়া অন্যতম এক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই দেশের শিশুরা মানে আমরা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। এই ‘নতুন কুঁড়ি’’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরবর্তীতে পেয়েছে অনেক গুণী শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ‘নতুন কুড়ি’ সূচনা বা আবহ সংগীত ‘আমরা নূতন, আমরা কুঁড়ি, নিখিল বন-নন্দনে গানটি’ ছিল তাঁর পিতা, বাংলাদেশের আরেকজন খ্যাতিমান কবি গোলাম মোস্তফার লেখা একটি কবিতা। এই কবিতা বা গানের অংশ থেকে ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের নামকরণ করা হয়।
আমাদের ছোটবেলার এই বিস্ময়কর মানুষটি সম্পর্কে বেশি কিছু জানার সুযোগ হয়নি। অসম্ভব গুণী ও প্রতিভাধর এই শিল্পী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পেয়েছিলাম বছরখানেক আগে কবি ও গবেষক জয়দুল হোসেন-এর ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুতুল নাচ’ সম্পর্কে’ একটি লেখা পড়ার সুবাধে।
শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার-এর সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি সংযোগ ছিল- এই বিষয়টি তখনই জানতে পারি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচের বিখ্যাত কারিগর ধন নিয়া এবং তাঁর পুতুল নাচের দল ‘রয়েল বীণা পুতুল নাচ” দল রাশিয়া সফর করে এবং সেখানে পুতুল নাচ পরিদর্শন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া তথা বাংলাদেশের সুনাম অর্জন করে। এই মহৎ উদ্যোগের পেছনের কারিগর ছিলেন আজকে প্রয়াত শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার।
২৫ আগস্ট ১৯৯৫ সালে কবি প্রাবন্ধিক ও গবেষক শিহাব শাহরিয়ারকে দেওয়া- এক সাক্ষাৎকারে ধন নিয়ে বলেন, মোস্তফা মনোয়ার আমাকে টেলিভিশনে প্রোগ্রাম করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমাকে রাশিয়া মস্কো, ভারতের ব্যাঙ্গালোরে যাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় আমাকে প্রদর্শনী করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে পুতুল নাচ বিলুপ্ত হতে পারে, এর নানা কারণ উল্লেখ করে ধন মিয়া আরও বলেন, পুতুল নাচের পুরোনো ধারার ভবিষ্যৎ না থাকলেও শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার প্রবর্তিত পাপেট্রির ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল। কারণ আমি প্রায় তাঁর কাছে যাই। দেখি তাঁর নিষ্ঠা, শ্রম এবং ভবিষ্যতে এই শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবল প্রচেষ্টা। তিনি আর্ট কলেজের ছেলেদের নিয়ে এবং ওয়ার্কশপ করে সেসব ছেলে মেয়েকে নিয়ে পাপেট্রি করছেন, টেলিভিশনে নিয়মিত শো করছেন, বাইরের দেশের পাপেট্রির নানা ক্রিয়া-কৌশল নিয়ে পড়াশোনা করছেন এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী ও নিজস্ব স্টুডিওতে শো করে চলছেন, তাতে আমি পাপেট্রি নিয়ে খুবই আশাবাদী।
ধন মিয়ার সাক্ষাৎকারের কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায়, শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার এবং ধন মিয়া মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু ছিলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচকে বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এই দুই মহান ব্যক্তিই আজ প্রয়াত। ধন মিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন বহু আগে। আজ মৃত্যুবরণ করলেন শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার। আমাদের শৈশবকে রঙিন করে গড়ে তোলার এই মহান কারিগরের কর্ম ও স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
--------
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
২৯ জুন ২০২৬

0 মন্তব্যসমূহ