স্কুল জীবন মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর একটি। মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে স্কুলের বাধাধরা নিয়ম, শিক্ষকের আদর-শাসন, সহপাঠীর সাহচর্য, এমনকি স্কুলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অবকাঠামোগুলোও ভূমিকা রাখে। তাই হয়ত মানুষ বড় হয়েও নিজের স্কুল জীবনকে ভোলে না। ভোলে না স্কুলের মাঠ, পুকুর, চেয়ার, টেবিল, ব্রেঞ্চ বা ব্লাকবোর্ডকে। স্কুল জীবন আর শৈশবে ফেলে আসা সেই সোনালি সময় মানুষকে বারবার পিছুটানে, আবেগতাড়িত করে। সুযোগ পেলেই মানুষ শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে। ফিরে যেতে চায় সোনালি অতীতে।
অন্য সবার মতো আমিও ফেলে এসেছি সেই বর্ণিল এক সময়। আমার ছেলেবেলার স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে দুটো প্রাইমারি স্কুল। ছোটবেলার প্রথম স্কুলের নাম হোসেনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটি সিরাজগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলায় অবস্থিত। যমুনা নদীর তীরবর্তী এই স্কুলে আমার পড়ায় সুযোগ হয়েছে বাবার চাকরির সুবাদে। আমার বাবা চাকরি করতেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মেরিন বিভাগে। পোস্টিং ছিল সিরাজগঞ্জ ঘাটের রেলওয়ে ফেরি বিভাগে। ১৯৯১ সালে সাড়ে পাঁচ বছর বয়সে এই স্কুলের প্রাক প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি হই। আমরা বলতাম ‘ছোট ওয়ান’। এই শ্রেণি নিয়ে আমার একটি স্মৃতিই মনে আছে। আর তাহলো একদিন আমি স্কুলে যেতে চাচ্ছিলাম না। সেদিন আব্বা জোর করে স্কুলে নিয়ে গেলেন। স্কুল ছিল বাসার কাছেই। কেঁদে কেটে যখন স্কুলে গেলাম, তখন স্কুলে একজন শিক্ষিকা ‘আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা, মাছ ধরিতে যাই’- ছড়াটি পড়াচ্ছিলেন। ক্লাসে কিছু ছেলে-মেয়ে বেঞ্চে বসা ছিল। বাকিরা মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসে ছিল। পাটি বিছানো এই দলে আমারও বসার জায়গা হল। ম্যাডামের পড়ানো ছড়ার সাথে আমি পূর্ব থেকেই পরিচিত ছিলাম, কারণ এরকম অনেক ছড়া অন্য শিশুদের মতো আমিও মায়ের কাছে শিখেছিলাম। ছড়া দিয়ে শুরু হওয়া আমার স্কুল জীবন আজও শেষ হলো না। শৈশবের সেই স্কুল ভবন হয়তো বদলে গেছে, কিন্তু সেখানে বসে শেখা প্রথম ছড়াগুলো আজও আমার লেখকজীবনের ভিত হয়ে আছে। এখন নিজেই টুকটাক ছড়া লিখতে চেষ্টা করি।
ছোট ওয়ান বা ক্লাস ওয়ানের এই স্কুলে পড়ালেখার আমার আর তেমন কোনো স্মৃতি নেই। শুধু মনে পড়ে যখন ‘বড় ওয়ান’ মানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠলাম, পাশের দোতলা বিল্ডিংয়ে আমাদের ক্লাস ছিল। প্রথম ব্রেঞ্চ বসেছিলাম। আমার সাথে আরেকটি ছেলে বসেছিল। যার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে ছিল। একদিন সে আমাকে একটি গাছের পাতা দিয়ে বলল- এটা একটা জাদুর পাতা। এই পাতা থেকে গাছ হয়। আমি অবাক হলাম। পাতা থেকে আবার গাছ জন্মে নাকি। ওর কথা মতো সেই পাতাটি বাড়িতে এনে এক জায়গায় মাটিতে পুঁতে দিলাম। সত্যি সত্যিই সেখান থেকে একদিন অনেকগুলো চারা গজাল। পাথরকুঁচি নামক এই পাতা থেকে চারা গজানোর সেই দৃশ্য আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। আজ এত বছর পর বুঝি, পাথরকুঁচির পাতাটি শুধু একটি গাছের জন্ম দেয়নি; আমার ভেতরেও জন্ম দিয়েছিল বিস্ময়ের একটি বীজ।
সিরাজগঞ্জের সেই ছোট্ট স্কুলটি আজও আমার শৈশবের প্রথম পাঠশালা হয়ে হৃদয়ের এক কোণে অমলিন হয়ে আছে। মনে পড়ে একটি বড় রাস্তার পশ্চিম পাশের ছোটখাটো স্কুল মাঠ। মাঠের উত্তর পাশে একটি টিনের ঘর আর একটি দোতলা বিল্ডিং। এই মাঠে কয়েকদিন অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়ানোর কথা মনে পড়ে। সকালের রোদে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ‘আরামে দাঁড়াও, সোজা হও’— কারো এমন কণ্ঠ আজও কানে বাজে। মাঠের দক্ষিণ পাশে কিছু লিচু গাছ। সেই গাছে ঢিল ছুড়ে আমাদের লিচু পেরে খাওয়ার চেষ্টার কথা। মাঠের পশ্চিম পাশের শেষের দিকে একটি মসজিদ। ঐ সময় মসজিদটির ছাদ ঢালাই কাজে বড়দের সাথে আমার বড় দুই ভাই অংশগ্রহণ করেছিল বলে আমার মনে পড়ে। মসজিদের সামনে উত্তরপাশের ছোট ঝুপড়ি ঘরে শুরু হয়েছিল আমাদের ‘আলিফ-বা-তা-ছা’ পড়ার মক্তব জীবন। হুজুরের বেতের বাড়ির কথাও বেশ মনে আছে।
তখন নতুন বছরে কোনো এক সন্ধ্যায় স্কুল বড় বড় কয়েকটা ট্রাকে করে বই আসত। সেই বই ট্রাক থেকে স্কুলের নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে যাওয়ার কাজ করত স্কুলের উপরের ক্লাসের ছেলেরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দুয়েকটা বইয়ের বান্ডিল চুপিচুপি নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসত। কে কোন শ্রেণির, কী বই এনেছে- পরদিন এসব পাড়ার ছেলে-মেয়েদের জানাজানি হয়ে যেত। এবং যে যার প্রয়োজন মতো বই সংগ্রহ করত। ফলে স্কুলে দেওয়া বইয়ের সাথে আমাদের অনেকের একই বই একাধিক হয়ে যেত।
মাঝে মাঝে রেললাইন ধরে বড় দুই ভাইয়ের স্কুল সিরাজগঞ্জ বি. এল স্কুলে গিয়েছি। এই স্কুলের যাওয়ার আগে লাশকাটা ঘর দেখে ভয়ে শিউরে উঠেছি কতবার! এই লাশকাটা ঘরের সামনে একটি গাছে অনেকগুলো কালো কালো পলিথিন ব্যাগ ঝুলানো ছিল। মনে হয় যেন গাছে অনেকগুলো ফল ঝুলে আছে সে গাছে। ভাইয়ারা বলেছে- সেগুলোতে নাকি মানুষের কিডনি, কলিজা ঝুলিয়ে রেখেছে। কী ভয়ংকর ব্যাপার! মনে হলে এখনও ভয়ে গা শিউরে ওঠে। যদিও বিষয়টা সত্য নাকি মিথ্যা তা জানি না। মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। হয়ত তারা আমার সাথে মজা করেছে।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে বাড়ির পাশের মাঠে ‘সাতচারা’ নাম একটি খেলা খেলতে গিয়ে বলের উপর পা পরে পিছলে গিয়ে আমার বাম পা ভেঙে যায়। তার সাথে সাথে আমার লেখাপড়ার সাময়িক ছন্দপতন ঘটে। পা ভালো হতে না হতেই আব্বার বদলি হয়ে যায় অন্য জেলার অন্য ঘাটে। ১৯৯৪ সালের কোনো এক মাসে আমরা যমুনা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের উপর আব্বার জাহাজে ভেসে ভেসে আমরা এলাম ব্রহ্মপুত্র নদে- কয়েকদিনের মধ্যে সিরাজগঞ্জ থেকে গাইবান্ধায়। সে এক মজার স্মৃতি, লিখবো অন্য কোনো সংখ্যায়। (চলবে...)
----
ছেলেবেলার সাতকাহন (পর্ব-১)
মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ
০৩ ডিসেম্বর ২৩
(এই লেখাটির পরিমার্জিত রূপ নব ভাবনা স্কুল বেলায় সংখ্যা ২০২৫-এ প্রকাশিত)



0 মন্তব্যসমূহ